গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলা করে। এতে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হন। ইরান প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা করে। এভাবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সাথে ইরানের সর্বাত্বক যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ইরান হরমুজ প্রণালী অবরোধ করে, ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট শুরু হয়।
অবশেষে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৪০ দিনের যুদ্ধ শেষে ৮ এপ্রিল ১৪ দিনের যুদ্ধ বিরতি কার্যকর হয়, যা পরবর্তীতে আরো বৃদ্ধি পায়। এতে বিশ্ববাসী স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। সবাই আশা করে, যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হবে। ইসরাইল ২০২৫ সালের ১৩ জুন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ কারখানা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ব্যক্তিদের অবস্থানে হামলা করেছিল।
সেই হামলায় ইরানের সশস্ত্রবাহিনীর প্রধান মোহাম্মদ বাঘেরি, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান হোসেইন সালামি এবং একাধিক শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী মারা যায়। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরের মতই ইসরাইলকে সমর্থন করে। ইরান পরবর্তীতে ইসরাইলে পাল্টা হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্র ২১ জুন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ফোরদা, নাতাঞ্জ এবং ই¯পাহানে হামলা করে। প্রতিক্রিয়ায় কাতার এবং ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরান হামলা করে।
পরবর্তীতে ২৪ জুন থেকে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধ বিরতি হয়। কিন্তু সেই যুদ্ধের কয়েক মাস যেতে না যেতেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যৌথভাবে আবারো ইরানে হামলা করল। ইরানে হামলার সুদূর প্রসারী দুটো উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, ইরানের পরমাণু প্রযুক্তি ধ্বংস করা, দ্বিতীয়ত ইরানে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন। এসব বাস্তবায়ন করতে পারলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের বিরোধিতাকারী এবং প্রতিপক্ষ থাকবে না।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল হয়ে যাবে মধ্যপ্রাচ্যের একক নিয়ন্ত্রক। কিন্তু ইরানের নেতৃত্ব ও জনগণের দৃঢ়তা এবং পাল্টা আক্রমণে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তা সফল হয়নি। মূলতপক্ষে ইরানে আগ্রাসন বুমেরাং হয়েছে।১৯৭৯ সালে ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ চলছে। ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, দেশটি পারমাণবিক বোমা বানানোর চেষ্টা করছে।
ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র নাকি বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকি। ইরান যদিও বার বার বলছে, তার পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, তবু যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল তা মানে না। পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন করছে। ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগের আহবান জানিয়ে বলেছে, পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ না করলে সামরিক হামলা চালানো হবে।
যুক্তরাষ্ট এবং ইসরাইল জাতিসংঘের মাধ্যমে ইরানের বিরদ্ধে একাধিকার অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে। ইরান বরাবরই দৃঢ় ও দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছে, এটা তার অধিকার এবং হুমকি, অবরোধ ও চাপের মুখে পরমাণু কর্মসূচি বাতিল করবে না। এভাবে পরমাণু ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং ইসরাইলের বাকযুদ্ধ চলছে। এ রকম পরিস্থিতিতে ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করে।
অথচ, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই অনেক আগে পারমাণবিক বোমা বানিয়েছে, পারমাণবিক বোমার বিরাট মজুদ গড়ে তুলেছে এবং ১৯৪৫ সালে জাপানে পারমাণবিক বোমা হামলা চালায় দেশটি, যাতে কয়েক লক্ষ মানুষ মারা যায়।মুসলিম দেশসমূহ জ্ঞান-বিজ্ঞানে এবং সামরিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করুক, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা তা চায় না। ইরানের মত একটি ইসলামপন্থী, জাতীয়তাবাদী এবং পাশ্চাত্যবিরোধী মুসলিম দেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকুক, তা পশ্চিমা বিশ্ব কিছুতেই মানতে পারে না। কারণ, এর ফলে পশ্চিমাদের সাম্রাজ্য এবং আধিপত্য হুমকির মুখে পড়বে।
তারা চায়, মুসলিম দেশসমূহ চিরদিনই অনুন্নত ও পশ্চাৎপদ এবং জ্ঞান বিজ্ঞান, সামরিক প্রযুক্তিতে তাদের উপর নির্ভরশীল ও মুখাপেক্ষী থাকুক। পশ্চিমারা চায় জ্ঞান বিজ্ঞান এবং সামরিক প্রযুক্তির দক্ষতা কেবল তাদের হাতেই থাকুক এবং এর মাধ্যমে বিশ্বকে চিরদিন শাসন করুক। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র কোনো মুসলিম দেশকে সামরিক প্রযুক্তি এবং সামরিক শক্তিতে শক্তিশালী হতে সাহায্য করে না।
পাকিস্তান পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটালে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা এর বিরোধিতা করে এবং একে ইসলামিক বোমা নামে অভিহিত করে। অথচ, ভারত পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ করলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা চুপচাপ ছিল এবং বিরোধিতা করেনি। একইভাবে ইসরাইলের পরমাণু কর্মসূচির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের কোনো অভিযোগ নাই, বরং সহযোগিতা আছে।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিরুদ্ধে পশ্চিমারা যতটাই সরব, ইসরাইলের পরমাণু কর্মসূচির বিরুদ্ধে ততটাই নীরব। যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমারা এখানে বরাবরই দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করছে।মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরান শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানের বিরাট প্রভাব থাকলেও তা বর্তমানে কিছুটা হলেও কমেছে। ইসরাইলের লাগাতার সামরিক হামলায় ইরান সমর্থিত হামাস, হিজবুল্লাহ অনেক দুর্বল হয়েছে।
ইসরাইলি হামলায় হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়াসহ হামাসের অনেক শীর্ষ নেতা এবং হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুললাহসহ অনেক নেতা মারা যায়। হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যায় ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি। সিরিয়া ছিল ইরানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র। সিরিয়ার ক্ষমতা থেকে আসাদের পতনে সিরিয়া ইরানের অনেক দূরে চলে গেছে। হামাস, হিজবুল্লাহ এবং আসাদ সরকার ছিল ইরানপন্থী এবং ইসরাইল বিরোধী।
স্বাভাবিকভাবেই মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব কমে যায়। একেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল সুযোগ হিসাবে লুফে নেয় এবং ইরানে হামলা চালায়।ফিলিস্তিনি ভূমি দখল এবং ফিলিস্তিনিদের দমনে ইসরাইল যা ইচ্ছা তা করে চলেছে। যখন ইচ্ছা ফিলিস্তিনিদের হত্যা করছে। ২০২৩-২০২৫ সালে ইসরাইল গাজার পচাত্তর হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা, দেড় লক্ষাধিককে আহত এবং সমস্ত অবকাঠামো ধ্বংস করেছে। গাজায় হত্যার ক্ষেত্রে ইসরাইল আন্তর্জাতিক নীতিমালা মানেনি। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং ত্রাণ সংগ্রহে আসা ফিলিস্তিনিদেরকেও নির্বিচারে হত্যা করেছে।
ইসরাইল জানে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্ব সাথে আছে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে সমর্থন করবে। বাস্তবে সেটাই হচ্ছে। ইসরাইলের অপকর্মের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে উত্থাপিত সব প্রস্তাবেই যুক্তরাষ্ট্র ভেটো প্রয়োগ করেছে। ফলে ইসরাইলকে কখনো শাস্তি পেতে হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব ইসরাইলকে সবসময় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। ফলে ইসরাইল বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ইসরাইল নিজেকে অপরাজেয় এবং ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করে। সে মনে করে, কোনো মুসলিম দেশ তার ভূখ-ে আঘাত করতে পারবে না।
সুতরাং সে নিরাপদ। কিন্তু ইরান সে ধারণা ভেঙ্গে দিয়েছে। বিশ্বসেরা আয়রন ডোম এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলে আঘাত করে এবং ইসরাইল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ইসরাইলের দম্ভ চূর্ণ হয় এবং ইসরাইল সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা ভেঙ্গে যায়। অধিক ক্ষতি থেকে বাঁচতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যুদ্ধ বিরতিতে যায়। যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে বলেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যুদ্ধ বন্ধে রাজি হয়। আক্রমণকারী দেশ যখন যুদ্ধ বন্ধ করে, তখন বুঝতে হবে সে পরাজিত হয়েছে।
পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের পাশাপাশি ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সরকার পতনেরও হুমকি দেয়। তারা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকেও হত্যা করে। ১৯৭৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত রেজা শাহ পাহলভির পুত্র রেজা পাহলভি ইসরাইল সফর করে নেতানিয়াহুর সাথে বৈঠক করে। তারা ইরানী জনগণকে বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানায়। কিন্তু তাদের আহ্বানে ইরানী জনগণ সাড়া দেয়নি।
ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনকে ইরানের অধিকাংশ জনগণ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসাবে চিহ্নিত করে এবং এর মোকাবেলায় দেশটির বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানায়। ইরানী নেতারা মোজতবা খামেনিকে নতুন ধর্মীয় নেতা নির্বাচন করে। তারা রাজপথে মিছিল করে এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জেগে ওঠে। এটাই স্বাভাবিক।
কোন দেশ বিদেশি আগ্রাসনের শিকার হলে, সেই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো নেতৃত্বকে জনগণ সমর্থন জানায় এবং জনগণের মধ্যে দেশপ্রেম জেগে ওঠে। ইরানের বেলায়ও তাই হয়েছে। এভাবে আগ্রাসন ইরানের নেতৃত্বকে শক্তিশালী এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পেরেছে, ইরানে সরকার পরিবর্তন সম্ভব নয়।
ইরান যেহেতু পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে যেতে বদ্ধ পরিকর, সুতরাং আগামীতে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি আরো জোরদার করবে। শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন পরমাণু বিজ্ঞানী মারা গেলেও ইরানে অনেক পরমাণু বিজ্ঞানী রয়েছে। শীর্ষস্থানীয় অনেক রাজনৈতিক এবং সামরিক ব্যক্তি মারা গেলেও জুনিয়ররা শক্তভাবে হাল ধরেছে। তাছাড়া ইরান তেল গ্যাসসহ বিভিন্ন খনিজ স¤পদে সমৃদ্ধ। ক্ষতিগ্রস্থ পারমাণবিক স্থাপনাসমূহ চীন এবং রাশিয়ার সহযোগিতায় দ্রুত পুনরুদ্ধার করবে। ইরান দ্রুত পরমাণু বোমা বানালে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সার্বিক বিবেচনায় বলা যায়, ইরানে আগ্রাসন বুমেরাং হয়েছে।
লেখক: প্রকৌশলী এবং রাষ্ট্র চিন্তক।
omar_ctg123@yahoo.com