সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ০৮:৩৫
উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টিতে পুনর্ভবা নদীর পানি বেড়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে শত শত বিঘা বোরো ধান তলিয়েছে। একই কারণে পাবনার ঈশ্বরদীতেও ডুবে যাওয়ায় কৃষকরা ক্ষতি এড়াতে বাধ্য হয়ে আধাপাকা ধান কাটছেন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে সীমান্ত নদী পুনর্ভবার পানি হঠাৎ বেড়ে গেছে। এতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চলের উঠতি বোরো ধান প্রচণ্ড হুমকির মুখে পড়েছে। তিন দিন ধরে নদীর পানি বাড়া অব্যাহত থাকায় রাধানগর ইউনিয়নের কুজইনসহ বিভিন্ন বিলে রোপণ করা প্রায় ৫০০ বিঘা জমির ধান তলিয়ে গেছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আরও শত শত বিঘা জমির ফসল নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
দিনাজপুর থেকে নেমে আসা পুনর্ভবা নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকায় নওগাঁর সাপাহার ও পোরশা উপজেলার পাশাপাশি গোমস্তাপুরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ধান কাটার সময় ঘনিয়ে এলেও শ্রমিক সংকটের মধ্যে এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষকদের জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে। মঙ্গলবার দুপুরে বিল কুজইন এলাকায় তৈরি অস্থায়ী বাঁধ কেটে দেওয়ায় চন্দের বিলে নতুন করে পানি প্রবেশ শুরু হয়েছে। এতে ওই বিলে থাকা আরও বিপুল পরিমাণ বোরো ধান নিমজ্জিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, যেদিকে চোখ যায় শুধুই পানি। ডুবে থাকা ধানের শীষগুলো যেন শেষ চেষ্টা করেও মাথা তুলতে পারছে না। যে মাঠে পাকা ধান ঘরে তোলার উৎসব থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন নিস্তব্ধতা। উঠতি বোরো ধান নিয়ে যেখানে কৃষকের ঘরে হাসি থাকার কথা, সেখানে এখন হতাশা আর অনিশ্চয়তা। এই দুর্যোগের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা যুক্ত হয়ে কৃষকদের জীবিকাকে প্রচণ্ড ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
স্থায়ী সমাধান ছাড়া এ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে না– এটিই এলাকার মানুষের মনে গেঁথে গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ওসমান আলী বলেন, ‘সারা বছরের পরিশ্রম করা ধান এভাবে পানির নিচে চলে যাবে, ভাবিনি। আর কয়েকদিন সময় পেলেই ঘরে তুলতে পারতাম।’ আরেক কৃষক সবুর আলী জানান, ‘ধারদেনা করে চাষ করি। ফসলই যদি না পাই, তাহলে সংসার চালাব কীভাবে?’
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুনর্ভবা নদীর পানি বাড়লেই প্রতি বছর এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নদীর দুই পারে স্থায়ী বাঁধ ও স্লুইসগেট না থাকায় পানি সহজে নামতে পারে না এবং দ্রুত বিলাঞ্চল প্লাবিত হয়। স্থানীয় বাসিন্দা মোমিন বলেন, ‘এখানে একটি স্থায়ী ব্রিজ ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই ফসল নষ্ট হয়। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই ক্ষতি বন্ধ হবে না।’
পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন। কৃষি কর্মকর্তা সাকলাইন হোসেন জানান, ‘পানি দ্রুত নেমে গেলে কিছু ফসল রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির মুন্সি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত সেতু নির্মাণ ও নদী খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
যে সময়ে মনের আনন্দে বোরো ধান কেটে ঘরে তোলার কথা, সেই সময়েই কষ্ট বুকে চেপে আধাপাকা ধান কাটতে মাঠে নেমেছেন পাবনার ঈশ্বরদীর কৃষকরা। অসময়ের টানা বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসে মাঠের পর মাঠ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ফসল রক্ষায় বাধ্য হয়ে আগাম ধান কাটছেন তারা।
গতকাল বুধবারও ঈশ্বরদীতে মুষলধারে বৃষ্টি ও ঝড়ো আবহাওয়া বিরাজ করে। সাঁড়াগোপালপুর এলাকার কৃষক আব্দুস সাত্তার, মো. নুরুজ্জামানসহ কয়েকজন কৃষক কোমর পানিতে ডুবে থাকা ধান কেটে জমির আইলে তুলে রাখছিলেন। পরে সেই ধান পাশের পাকা সড়কে রেখে পানি ঝরিয়ে মাড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তারা।
কৃষকরা জানান, বৈশাখ শুরুর পর থেকেই দফায় দফায় বৃষ্টিতে ধানের জমিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
ধান পুরোপুরি পাকার আগেই পানি উঠে যাওয়ায় ফসল নষ্ট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। ফলে বাধ্য হয়েই আধাপাকা ধান কেটে ঘরে তুলছেন। অথচ দুই সপ্তাহ সময় পেলে ধান পুরোপুরি পেকে যেত। কিন্তু পানিতে ডুবে যাওয়ায় এখনই কাটতে হচ্ছে। এতে ফলন ও মান দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই গ্রামের কৃষক মো. নুরুজ্জামান বলেন, কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কেটে প্রথমে জমির আইলে শুকানো হচ্ছে, এরপর সড়কে রেখে পানি ঝরিয়ে মাড়াই করা হচ্ছে।
এতে শ্রম ও সময় দুটোই বেশি লাগছে।
সাহাপুর গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম জানান, নিচু জমিগুলোতে জলাবদ্ধতা এতটাই বেড়েছে যে এখন ধান না কাটলে পুরো ফসলই নষ্ট হয়ে যাবে। তাই বাধ্য হয়েই কাঁচা-পাকা ধান কাটতে হচ্ছে।
কৃষকরা জানিয়েছেন , পাকশী, সাঁড়া ও সাহাপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ঝড়-বৃষ্টির কারণে অনেক জমির আধাপাকা ধান পানির সঙ্গে মিশে গেছে, দ্রুত কেটে না নিলে ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি বিজ্ঞানী ড. সুলতান আলম বলেন, এই অবস্থায় মাড়াই করা ধানে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ পুষ্টি উপাদান কম থাকতে পারে। একই সঙ্গে চালের গুণগত মানও কমে যেতে পারে।কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মোমিন জানান, এ উপজেলায় ২ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। তবে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে কিছু কৃষক বাধ্য হয়ে আগাম ধান কাটছেন।
এতে উৎপাদনে কিছুটা প্রভাব পড়লেও বড় ধরনের ক্ষতি হবে না বলে আশা করা হচ্ছে।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ, গোমস্তাপুর ও পাবনার ঈশ্বরদী প্রতিনিধি)