সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের উত্তরে বিশাল খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়। তার পদদেশে সুনামগঞ্জ জেলা শহর ছুঁয়ে বিশাল দেখার হাওর। হাওরটি সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার ও শান্তিগঞ্জ উপজেলা বেষ্টিত। দেখলে মনে হয়, এটি একটি সাগর। তীর ঘেঁষে সুদীর্ঘ সড়ক। সড়কে পানিতে ডুবে যাওয়া হাওর থেকে তুলে আনা ধান শুকানো হচ্ছে। দেখে মনেই হয় না, জেলার বিভিন্ন উপজেলার হাওরগুলোতে বোরো ধানের ওপর বিপর্যয় চলছে।
ফসলহারা কৃষি পরিবারগুলোতে চলছে আহাজারি।গোন্দিগঞ্জ এলাকায় সড়কের ওপর কিষান কিষানিরা লম্বা করে বিছিয়ে ধান শুকাচ্ছেন। আবার শুকানো শেষে ধান কেউ বস্তায় ভরছেন। কেউবা খড় শুকিয়ে বাড়ি নিচ্ছেন। কৃষকেরা জানান, মৌসুমের প্রথম থেকেই ধানের মাঠে বিপর্যয় শুরু হয়ে বহু জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক ধান পচে গেছে। অনেক ধানে অবার রোদের অভাবে অংকুর দেখা দিয়েছে।
এবার অনেক সচ্ছল কৃষককেও হয়তো না খেয়ে থাকতে হবে। তবে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ চলছে। কিন্তু হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র নিয়ে সরকারি তথ্যের সঙ্গে স্থানীয়দের বক্তব্যে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অমিল।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বিশিষ্টজনরা অভিযোগ করেছেন, বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় অনেক কম ক্ষতির তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তারা প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ে ঢাকা থেকে স্বতন্ত্র সার্ভে টিম পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন। গত মঙ্গলবার সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউজে বিভাগীয় কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আশরাফুর রহমানের সভাপতিত্বে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এ দাবি ওঠে।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এমপি। সভায় বক্তারা ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়নে তড়িঘড়ি না করে আরো সময় নিয়ে সঠিক তালিকা তৈরির আহ্বান জানান।
সভায় কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনায় জানান, জেলায় মোট আবাদকৃত জমির পরিমাণ ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর। এর মধ্যে হাওরে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর। তার দাবি, হাওরের ৮০ শতাংশ ধান ইতোমধ্যে কাটা হয়েছে এবং অনুকূল আবহাওয়া থাকলে ১০ মের মধ্যে কর্তন শেষ হবে।
তবে তার এ তথ্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান সভায় উপস্থিত রাজনীতিবিদ ও কৃষক প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, বাস্তবে এখনো ৫০ শতাংশ ধানও কাটা সম্ভব হয়নি। জলাবদ্ধতার কারণে অনেক হাওরে ধান কাটাই যাচ্ছে না। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আকবর আলী বলেন, ‘উপস্থাপিত তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই।
শ্রমিকসংকটের কারণে অনেক জায়গায় ধান পেকে থাকলেও কাটা যায়নি।’ একই সুরে এডিশনাল পিপি অ্যাডভোকেট শেরেনুর আলী অভিযোগ করেন, ‘বৃষ্টির মধ্যে ধান না কাটা সত্ত্বেও কর্তনের হার বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, যা বিভ্রান্তিকর।’
জেলা প্রশাসক (রুটিন দায়িত্বে) সমর কুমার পাল জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। প্লাবিত জমির পরিমাণ ২০ হাজার হেক্টর এবং ক্ষতিগ্রস্ত জমি ১৬ হাজার হেক্টর, যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১৯৬ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের সংখ্যা ৫০ হাজার ৯১৩টি। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি এর চেয়ে অনেক বেশি। সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘প্রত্যেক ইউনিয়নেই কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো তথ্যে তার সঠিক প্রতিফলন নেই।’
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এখন ওপেন সিক্রেট। ফলে কৃষকরা বারবার ক্ষতির মুখে পড়ছেন।’ সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম নূরুল বলেন, ‘এবার বন্যা নয়, জলাবদ্ধতার কারণেই ফসল তলিয়েছে। কিন্তু পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
সভা শেষে জেলার খরচার হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত ৪০০ কৃষকের মধ্যে সহায়তা বিতরণের মাধ্যমে তিন মাসব্যাপী সহায়তা কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।