1. shahajahanbabu@gmail.com : admin :
অনুসন্ধানহীন নীতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে - Pundro TV
মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ০৩:০৪ অপরাহ্ন



অনুসন্ধানহীন নীতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে

অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬

মো. আনিসুর রহমান রানা

 প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ০৭:০৬ | আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ | ০৭

একসময় বাংলাদেশে গ্যাসকে প্রায় অফুরন্ত সম্পদ ধরা হতো। বর্তমান বাস্তবতা হলো, দেশের ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রে মোট উত্তোলনযোগ্য মজুত প্রায় ২৯ টিসিএফ। ইতোমধ্যে প্রায় ২০ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে; ৯ টিসিএফের মতো মজুত রয়েছে। গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে; নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হচ্ছে না। অথচ পরিকল্পনা এখনও এমনভাবে করা হচ্ছে, যেন এই ঘাটতি সাময়িক। এই আত্মতুষ্টিই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

ওদিকে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রথমবার এলএনজি আমদানি শুরু করেছিল। ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ১৫০০ বিলিয়ন কিউবিক ফুট এলএনজি আমদানি হয়েছে। শুরুর প্রাক্কালের ‘স্বল্পমেয়াদি সমাধান’ এখন স্থায়ী নির্ভরতায় রূপ নিচ্ছে। দেশীয় গ্যাস যেখানে প্রতি ঘনমিটার প্রায় ৩ টাকা, সেখানে এলএনজির দাম প্রায় ৫৫ টাকা। এই মূল্য পার্থক্যই বলে দেয় স্থানীয় অনুসন্ধানে বিনিয়োগ কতটা জরুরি।

দেশের গ্যাস খাতে পাইপলাইনের লিকেজ, অবৈধ সংযোগ, পুরোনো অবকাঠামো এবং ত্রুটিপূর্ণ মিটারিংয়ের কারণে বিতরণ লাইনে গড়ে ১০-১২ শতাংশ ‘সিস্টেম লস’ হয়। এই অপচয় কমিয়ে আনা গেলে প্রতিদিন ১২০-১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় সম্ভব। ২০১৩ সালে ভারত গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নে স্মার্ট মিটারিং বাধ্যতামূলক এবং শহরভিত্তিক বিতরণ কোম্পানির লাইসেন্স চালু করে সিস্টেম লস কমিয়ে এনেছে। কিন্তু বাংলাদেশে অপচয় রোধে ‘প্রিপেইড মিটার’ স্থাপনের গতি অত্যন্ত ধীর।

বাংলাদেশের জ্বালানি নীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির অভাব। ডেনিশ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রাম্বলের তৈরি ‘গ্যাস সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান ২০১৭’ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা পাঁচ হাজার মিলিয়ন কিউবিক ফুট ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী সরবরাহ এখন দুই হাজার ৬২৯ মিলিয়ন ঘনফুট।

পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে চাহিদা আট হাজার মিলিয়ন ঘনফুট অতিক্রম করবে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে এই বিপুল চাহিদা পূরণে দেশকে ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়তে হবে, যা জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।
দেশের জ্বালানি নীতিতে কিছু মৌলিক দুর্বলতা স্পষ্ট। প্রথমত, অনুসন্ধানের চেয়ে আমদানি প্রাধান্য পেয়েছে।

২০১৮ সালের পর থেকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানোর বদলে আমদানিকৃত এলএনজি নির্ভরতা ক্রমেই বেড়েছে। ‘গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড’ থাকলেও সঠিক ব্যবহার করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে আকর্ষণে নীতিগত উদ্যোগের অভাব ছিল। পিএসসির (প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট) শর্তাবলি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আকর্ষণীয় না হওয়ায় প্রত্যাশিত বিনিয়োগ আসেনি। তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক বিনিয়োগ হলেও সেখানে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি।

নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর জ্বালানি খাতে দ্রুত ও বাস্তবধর্মী কিছু পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি। অফশোর ব্লকের চুক্তি দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে। অনশোর ও ট্রানজিশন জোনে বাপেক্সের মাধ্যমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সাইসমিক জরিপ জোরদার করা প্রয়োজন।

জরিপে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য লিডগুলো দ্রুত যাচাইয়ে অনুসন্ধান কূপ খনন করতে হবে। এতে ভবিষ্যৎ জ্বালানি খাতের বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি সম্ভব হবে। সুরমা বেসিন বিশেষত সিলেট অঞ্চলে বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের সম্ভাবনা এখন সীমিত। তবে দেশের দক্ষিণে হাতিয়া বেসিন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। সেখানে ভোলা ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্যাসক্ষেত্র। তাই ভবিষ্যৎ

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হাতিয়া বেসিনে সাইসমিক সার্ভের মাধ্যমে কূপের লোকেশন নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি পেট্রোবাংলার অধীন বাপেক্স, বিজিএফসিএল ও এসজিএফএলের গ্যাসক্ষেত্রগুলোয় সরকার ঘোষিত ১০০ কূপ খনন কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ফেনী ও ছাতক গ্যাসক্ষেত্রের আইনি জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে উৎপাদন শুরুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

এ খাতে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে দেশীয় বিশেষজ্ঞ তৈরি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নিজস্ব সক্ষমতা উন্নয়নে জোর দেওয়া জরুরি। এতে একদিকে যেমন বিদেশি কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে কমে আসবে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কমবে। একই সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই ও স্বনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। অন্যদিকে, কয়লা সম্পদের যথাযথ ব্যবহার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে হবে। এতে একক উৎসে নির্ভরতা কমে আসবে। ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তা এখন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। আমদানি-নির্ভরতা যত বাড়বে, ঝুঁকিও তত বাড়বে। বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা সরাসরি দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ, শিল্পোৎপাদন ও দৈনন্দিন জীবনে এসে পড়ে। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধিতে রান্নার খরচ বেড়ে জীবনযাত্রায় চাপ সৃষ্টি হবে। শিল্প খাতে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন কমে কর্মসংস্থানও হুমকির মুখে পড়বে। বিদ্যুৎ ঘাটতি জনজীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও ব্যাহত করবে। জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান ও উন্নয়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

তেল-গ্যাস খাতের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমরা মূলত অতীতের আবিষ্কারের ওপর নির্ভর করেই টিকে আছি; ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা যথাযথভাবে করা হয়নি। ২০১২ ও ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন সত্ত্বেও সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। সবকিছু বিবেচনায়, বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট কেবল সরবরাহ ঘাটতি নয়; বিগত দিনগুলোর পরিকল্পনার ঘাটতিরও প্রতিফলন।

মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস, ভারতের ওএনজিসি ও পাকিস্তানের ওজিডিসিএল দেশের সক্ষমতা অর্জন করে বিদেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের বাপেক্স সেভাবে সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার সমুদ্রাঞ্চলে জ্বালানি অনুসন্ধান চালিয়ে ইতোমধ্যে গ্যাস উত্তোলন করছে; সেখানে আমরা অনেকটাই দর্শকের ভূমিকায়।

আশার কথা, এখনও সময় শেষ হয়ে যায়নি। নতুন সরকারের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। দ্রুত অফশোর ব্লকগুলো আন্তর্জাতিক কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করার পাশাপাশি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিমতো রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বাপেক্সকে শক্তিশালী করা জরুরি। পাশাপাশি সিস্টেম লস কমানো এবং শিল্প খাতে গ্যাসের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপ বড় বিনিয়োগ ছাড়াই সম্ভব। অন্যদিকে ভোলার গ্যাসও জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত কিংবা স্থানীয় শিল্পায়নে ব্যবহার নিশ্চিত করা যেতে পারে।

শুধু গ্যাসের ওপর নির্ভর না করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সমন্বয়ে ২০-৩০ বছরের লক্ষ্য সামনে রেখে সুপরিকল্পিত, দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। অন্যথায় এর মূল্য দিতে হবে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে। মনে রাখতে হবে, গ্যাস শুধু জ্বালানি নয়; শিল্পোন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, এমনকি জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আজকের সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে– আমরা দেশের ভবিষ্যৎকে কোন পথে এগিয়ে নিতে চাই।

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান রানা: ভূতত্ত্ববিদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ জিওলজিক‍্যাল সোসাইটি

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২
Developed By ATOZ IT HOST