1. shahajahanbabu@gmail.com : admin :
ইউনূস সরকারের ব্যর্থতায় শত মায়ের কোল: হামে ১৭ মৃত্যু - Pundro TV
মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ০৩:০৭ অপরাহ্ন



ইউনূস সরকারের ব্যর্থতায় শত মায়ের কোল: হামে ১৭ মৃত্যু

অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬

সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের চরম অদক্ষতা ও উদাসীনতায় হামে ঝরছে কোমলমতি শিশুদের প্রাণ; খালি হচ্ছে শত মায়ের কোল। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় (একদিনে) মৃত্যু হয়েছে ১৭ শিশুর; যা ৫০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এ নিয়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৩১১–এ। এদের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৫৯ শিশু আর হামে ৫২ শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে সোমবার (৪ মে) নিশ্চিত হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

স্বাস্থ্ অধিদপ্তরের সবশেষ প্রতিবেদন মতে, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে যে ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে ১২ শিশুই ঢাকা বিভাগের আর ৫টি শিশু চট্টগ্রাম বিভাগের। এছাড়া নতুন করে হামের উপসর্গ দেখা গেছে ১ হাজার ৩০২টি শিশুর মধ্যে।

তাদের মধ্যে ৬১৮ শিশুই ঢাকা বিভাগের। এরপর আছে চট্টগ্রাম (১৯২), রাজশাহী (১৬৮) ও বরিশাল (১৩৩) বিভাগ। দেশের ৮ বিভাগে এই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৬ জন

। হামের উপসর্গ নিয়ে ৮ বিভাগে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ৬১ জন হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়েছে।বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, হাম ও উপসর্গে ঢাকার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে রাজশাহী বিভাগে—৭৩ জনের। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে তিনজন ও উপসর্গে ৭০ জন মারা গেছে। চট্টগ্রাম বিভাগে ৩০ জন (উপসর্গে ২৫), সিলেট বিভাগে ১৭ জন (উপসর্গে ১৪) ও বরিশাল বিভাগে ১৫ জনের (উপসর্গে ১০) মৃত্যু হয়েছে।

খুলনায় নিশ্চিত হামে কোনো মৃত্যু না থাকলেও উপসর্গে ১৩ জন মারা গেছে। ময়মনসিংহ বিভাগে নিশ্চিত হামে দুজনের মৃত্যু হয়েছে, তবে উপসর্গে কোনো মৃত্যু নেই। রংপুর বিভাগে এখন পর্যন্ত হাম বা উপসর্গে কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত ও অব্যবস্থাপনার কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দরিদ্র দেশগুলোর জন্য একসময় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি সদ্য সাবেক এই সরকারের ১৮ মাসের আমলে কার্যত ভেঙে পড়ে। ফলে শুরু হয় হামের প্রাদুর্ভাব।

বিশেষজ্ঞরা টিকাদান কর্মসূচির আওতা কমে যাওয়ার বিষয়ে বারবার সতর্ক করলেও অন্তর্বর্তী সরকার তাদের পুরো মেয়াদে কোনো বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেনি। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি বা শেষ দিকে একটি বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচি চালানোর কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে হাম ও রুবেলা (এমআর-১ ও এমআর-২) টিকার মজুত ফুরিয়ে যাওয়া, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতিকে সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

নথিপত্রে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির ৬০টি বৈঠক হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, এটাই হবে এই কর্মসূচির শেষ ধাপ। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে একটি ‘এক্সিট প্ল্যান’ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তার বদলে ২০২৫ সালের মার্চে পুরো এইচপিএনএসপি বাতিল করে দেয় মন্ত্রণালয়।

সিদ্ধান্ত হয়, টিকাদানসহ সব ‘ওপি’র অধীন থাকা সেবাকে সরাসরি সরকারের নিয়মিত কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সমন্বয় বাড়ানো ও অবকাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে চতুর্থ ধাপের অসমাপ্ত কাজ শেষ করা এবং ওষুধ, টিকা ও অন্য জরুরি সরঞ্জাম সরবরাহ অব্যাহত রাখতে কয়েকটি ‘ব্রিজিং প্রকল্প’ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

তবে এসব প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অনুমোদনই মেলেনি। পরে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতেও কেটে যায় আরও কয়েক মাস। ফলে ক্রয়প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় সেবা স্থবির হয়ে পড়ে।

শুধু টিকাই নয়, ওপি বাতিলের প্রভাবে দেশের ১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ কমে যায়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো মানুষ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রোগীদের বিনা মূল্যে ওষুধ দেওয়ার জন্য চালু ৪৫০টি এনসিডি কর্নারেও সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়।

তহবিল সংকটে অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যাম্বুলেন্স কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে। কারণ, জ্বালানি ও চালকদের বেতন ওই কর্মসূচির অর্থ থেকেই দেওয়া হতো। জাতীয় পর্যায়ের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি—কৃমিনাশক ট্যাবলেট বিতরণ ও ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন—এক বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি হাম পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে নিয়ে যায়।

বিশেষ করে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম হামের টিকার চাহিদার বিষয়ে ইউনিসেফের সতর্কতা উপেক্ষা করে টিকা কেনায় স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নেন। এতে টিকা সংকট সৃষ্টি হয় এবং হামে শিশু মৃত্যুর হার বেড়ে যায়। যার জন্য তাকে দায়ী করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।

ইউনিসেফের সতর্কবার্তা উপেক্ষা: অভিযোগ রয়েছে, টিকা কেনার প্রক্রিয়া পরিবর্তনের সময় ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রাণা ফ্লাওয়ার্সের সতর্কবার্তা গ্রাহ্য করা হয়নি।

টিকা সংকট: সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা থেকে সরে এসে উন্মুক্ত টেন্ডার পদ্ধতি চালু করে, তখন টিকা সরবরাহ বিঘ্নিত হয় এবং রুটিন টিকাদান কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।

শিশুমৃত্যু ও দায়: দেশজুড়ে হামে শিশুদের মৃত্যুর জন্য সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম ও ড. ইউনূসকে দায়ী করে তাদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন হয়েছে।

জনরোষ: হামে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জোর দাবি উঠেছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক রোগনিয়ন্ত্রণ পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, বহু পরীক্ষিত এই কর্মসূচি খামখেয়ালিভাবে বন্ধ করা উচিত হয়নি। দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও সরকার চাইলে সেগুলো সমাধান করতে পারত। কিন্তু পুরো কর্মসূচি হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এমআর নির্মূলবিষয়ক জাতীয় যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও এপিডেমিওলজিস্ট অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, অপারেশন প্ল্যান স্থগিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইন ডিরেক্টর ও প্রকল্প ব্যবস্থাপকদের কার্যক্রমও থেমে যায়। এতে জনবলের বড় শূন্যতা তৈরি হয়। একপর্যায়ে সদর দপ্তরে মাত্র তিনজন কর্মকর্তা ছিলেন। এটাই ছিল সমস্যার বড় কারণগুলোর একটি।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পুরো খাতটি অপারেশন প্ল্যাননির্ভর থাকায় নতুন ব্যবস্থায় যেতে আন্তবিভাগীয় ব্যাপক সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কিন্তু তাতে যে এত সময় লাগবে, তা অন্তর্বর্তী সরকার আগে বুঝতে পারেনি। কর্মকর্তারা নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত না হওয়া এবং নতুন উদ্যোগ নিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেই মূলত বিলম্ব হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অপর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশের শর্তে বলেন, আগের ব্যবস্থায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক অনুমোদনেই লাইন ডিরেক্টর ইউনিসেফকে টিকার অর্ডার দিতে পারতেন। কিন্তু রাজস্ব বাজেটের অর্থে টিকা কিনতে গেলে অন্য জটিলতার পাশাপাশি দুটি মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন লাগে, যা পেতে দুই থেকে তিন মাস সময় লেগে যায়। অন্যদিকে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার অভিজ্ঞতাও বর্তমান কর্মকর্তাদের কম। প্রতিটি টিকার জন্য আলাদা দরপত্র করতে হয়, ফলে সময় আরও বেড়ে যায়।

তার ভাষ্য, সংকটের খবর আসতে শুরু করলে ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইউনিসেফের কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকার টিকা বাকিতে কেনে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। মার্চের মধ্যে সদর দপ্তরে হামসহ ছয় ধরনের টিকার মজুত শেষ হয়ে যায়। অথচ আগের কর্মসূচিতে অন্তত তিন মাসের অতিরিক্ত মজুত থাকত।

অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, বাস্তবতা হলো—টিকা সংগ্রহে বিলম্বের কারণে টিকাদানের আওতা ঠিকভাবে বজায় রাখা যায়নি, যার ফলেই এই প্রাদুর্ভাব। দায় যদি কাউকে নিতে হয়, তাহলে তা অন্তর্বর্তী সরকারের। তারা যথাযথ টিকাদান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে হার্ড ইমিউনিটি বা সমষ্টিগত সুরক্ষা তৈরি হয়নি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২
Developed By ATOZ IT HOST