রাষ্ট্রের সম্পদ মানে জনগণের সম্পদ। সেই সম্পদ যদি জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে ক্ষমতাবানদের ব্যক্তিগত সুবিধায় ব্যবহৃত হয়, তবে তা শুধু অনিয়ম নয়- রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির ওপর সরাসরি আঘাত। রাজশাহীর পদ্মাপারের বড়কুঠি এলাকায় খাসজমি দখল নিয়ে যে অভিযোগ উঠে এসেছে, তা বাংলাদেশের প্রশাসনিক জবাবদিহি ও সুশাসনের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
খাসজমির মূল উদ্দেশ্য হলো ভূমিহীন ও অসহায় মানুষকে পুনর্বাসন করা। অথচ অভিযোগ অনুযায়ী, বিসিএস ক্যাডারের ৩২ জন কর্মকর্তা ‘গৃহহীন’ পরিচয়ে সমবায় গঠন করে নামমাত্র মূল্যে মূল্যবান জমি বরাদ্দ নিয়েছেন এবং সেখানে বিলাসবহুল কন্ডোমিনিয়াম নির্মাণ করছেন। এ ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- যারা রাষ্ট্রের আইন ও নীতিমালা রক্ষা করার দায়িত্বে, তারাই যদি নিয়ম ভেঙে সুবিধা নেন, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
এ ঘটনায় যে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে প্রশ্নবিদ্ধ তা হলো- ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে সমবায় নিবন্ধন, নীতিমালা লঙ্ঘন করে জমি বরাদ্দ নেওয়া, ‘ভূমিহীন’ দাবি করার অসত্যতা, অনুমোদনের সীমা অতিক্রম করে বিনিয়োগ এবং নিয়মিত অডিট না হওয়া। এসব অনিয়ম এক দিনে হয়নি, বরং দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে ঘটেছে। এর মানে হলো, এখানে শুধু ব্যক্তি পর্যায়ের অনিয়ম নয়- প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাও স্পষ্ট।
সমবায় সমিতির নিবন্ধনের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়কে অফিস হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা বাস্তবে অস্তিত্বহীন। প্রথম অডিটেই সমিতিকে অকার্যকর ঘোষণা করা হলেও পরবর্তী সময়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এটি শুধু অবহেলা নয়, বরং প্রশাসনিক দুর্বলতা কিংবা প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। প্রশ্ন হলো, অডিটে অকার্যকর ঘোষণার পরও কীভাবে একটি সমিতি সরকারি জমি লিজ পায়? কে বা কারা এই প্রক্রিয়ায় চোখ বন্ধ রেখেছিল?
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু সদস্য সরকারি আবাসন প্রকল্পে প্লট থাকার পরও নিজেদের ভূমিহীন দাবি করেছেন। এটি নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। সাধারণ নাগরিক যদি এমন তথ্য গোপন করে সরকারি সুবিধা নিত, তাহলে নিশ্চয়ই কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতো। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া আইনের সমতার নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এ ঘটনায় আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে- খাসজমি বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা কোথায়? বাজারমূল্যে কয়েকশ কোটি টাকার জমি মাত্র কয়েক কোটি টাকায় লিজ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। এ ধরনের সিদ্ধান্ত যদি যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া নেওয়া হয়, তবে তা রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ব্যর্থতা নির্দেশ করে।
ভূমিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে এবং ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এটি ইতিবাচক সংকেত। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু আশ্বাস যথেষ্ট নয়; দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন। তদন্ত, জবাবদিহি ও প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা- সবকিছু দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় এ ঘটনা জনমনে আস্থাহীনতা আরও বাড়াবে।
এ ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বৃহত্তর একটি সমস্যার প্রতিফলন- ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জবাবদিহির ঘাটতি। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যদি নিজেদের জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করেন, তাহলে সুশাসনের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সমাধান কী? মূলত খাসজমি বরাদ্দের পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল ও উন্মুক্ত করতে হবে। আবেদন, যাচাই, বরাদ্দ- সব তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকলে অনিয়মের সুযোগ কমবে। তা ছাড়া সমবায় সমিতির নিবন্ধন ও অডিট প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে অডিট বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং অকার্যকর ঘোষণার পর দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। এবং সরকারি সুবিধা গ্রহণে তথ্য গোপন করলে কঠোর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে- ব্যক্তি যিনিই হন না কেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইনের সমতা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের কর্মচারী হোক বা সাধারণ নাগরিক- আইনের চোখে সবাই সমান। এই নীতি বাস্তবে কার্যকর না হলে দুর্নীতি কখনই কমবে না।