ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানির সীমাবদ্ধতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে শক্তির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুৎ। ধোঁয়াশাহীন এই বিশাল শক্তি উৎপাদনের পেছনে কাজ করে রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সব সমীকরণ। অনেক মানুষের মনেই প্রশ্ন জাগে, একটি ক্ষুদ্র পরমাণু কীভাবে একটি আস্ত শহর বা দেশকে আলোকিত করার মতো বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে? মূলত এটি কোনো জাদুকরী প্রক্রিয়া নয়, বরং পরমাণুর অভ্যন্তরে থাকা বিপুল শক্তিকে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে তাপশক্তিতে রূপান্তরিত করার এক আধুনিক প্রযুক্তি। ইন্টারনেট থেকে তথ্য নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন- আজহারুল ইসলাম অভি
নিউক্লিয়ার ফিশন : পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল চাবিকাঠি হলো নিউক্লিয়ার ফিশন নামক একটি চেইন রি-অ্যাকশন বা শৃঙ্খল বিক্রিয়া। বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল কাঠামো বা রি-অ্যাক্টরের ভেতরে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় ইউরেনিয়াম-২৩৫ অথবা প্লুটোনিয়াম-২৩৯। প্রক্রিয়াটি শুরু হয় যখন একটি মুক্ত নিউট্রন কণা দিয়ে একটি ইউরেনিয়াম পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে আঘাত করা হয়। এই আঘাতের ফলে ইউরেনিয়াম পরমাণুটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং ভেঙে দুই বা ততোধিক হালকা পরমাণুতে বিভক্ত হয়। এই বিভাজনের সময় পরমাণুর ভেতরে জমা থাকা বন্ধন শক্তি প্রচণ্ড তাপ ও তেজস্ক্রিয়তা হিসেবে নির্গত হয়। এই একটি ফিশন বিক্রিয়া থেকে আরও নিউট্রন বের হয়, যা পাশের অন্য ইউরেনিয়াম পরমাণুগুলোকে আঘাত করে। এভাবে একটি সুনিয়ন্ত্রিত চেইন রি-অ্যাকশন তৈরি হয়, যা নিরবচ্ছিন্নভাবে তাপ উৎপাদন করতে থাকে।
তাপশক্তি থেকে বাষ্পায়ন : রি-অ্যাক্টরের ভেতরে উৎপন্ন এই প্রচণ্ড তাপ সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয় না। এই তাপকে ব্যবহার করা হয় পানি গরম করার কাজে। রি-অ্যাক্টরের চারপাশে থাকা বিশেষ ব্যবস্থায় উচ্চচাপের পানি প্রবাহিত করা হয়। ফিশন বিক্রিয়ার তাপে এই পানি অত্যন্ত দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উচ্চচাপের বাষ্পে পরিণত হয়। আধুনিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে এই বাষ্পের তাপমাত্রা ও চাপ এতটাই বেশি থাকে যে, তা দিয়ে বিশাল যান্ত্রিক কাঠামো চালানো সম্ভব হয়।
টারবাইন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া : উৎপন্ন উচ্চচাপের বাষ্পকে পাইপের মাধ্যমে বড় বড় টারবাইনের দিকে পরিচালিত করা হয়। বাষ্পের প্রচণ্ড গতির ধাক্কায় টারবাইনের ব্লেডগুলো দ্রুত ঘুরতে শুরু করে। এই টারবাইনটি একটি শক্তিশালী শ্যাফটের মাধ্যমে একটি ইলেকট্রিক জেনারেটরের সাথে যুক্ত থাকে।
ফ্যারাডের তড়িৎচৌম্বকীয় আবেশ নীতি অনুযায়ী, যখন জেনারেটরের ভেতরে বিশাল চুম্বকীয় ক্ষেত্রের মাঝে কপার কয়েল বা তড়িৎ পরিবাহী ঘোরে, তখন সেখানে ইলেকট্রন প্রবাহিত হতে শুরু করে। এভাবেই যান্ত্রিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ শক্তি উৎপন্ন হয়। এই বিদ্যুৎকে তখন ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে উচ্চ ভোল্টেজে রূপান্তর করে গ্রিড লাইনের মাধ্যমে শহর ও শিল্প-কারখানায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
শীতলীকরণ ও চক্রের পুনরাবৃত্তি : টারবাইন ঘোরানোর পর বাষ্পের শক্তি কমে যায়। এই ব্যবহৃত বাষ্পকে তখন একটি কনডেন্সার বা ঘনীভবন যন্ত্রের ভেতর দিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে নদী বা সমুদ্রের ঠাণ্ডা পানির সাহায্যে বাষ্পকে আবার তরল পানিতে রূপান্তর করা হয়। এই পানি পুনরায় পাম্পের মাধ্যমে রি-অ্যাক্টরে ফেরত পাঠানো হয় যাতে তা আবার গরম হয়ে বাষ্প হতে পারে। পারমাণবিক কেন্দ্রের বাইরে যে বড় টাওয়ার থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়, তা আসলে কোনো বিষাক্ত গ্যাস নয়, বরং এই শীতলীকরণ প্রক্রিয়ার অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প।
নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা : পারমাণবিক কেন্দ্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। রি-অ্যাক্টরের ভেতর কন্ট্রোল রড (সাধারণত বোরন বা ক্যাডমিয়াম দিয়ে তৈরি) ব্যবহার করা হয়। এই রডগুলো অতিরিক্ত নিউট্রন শোষণ করে নিতে পারে। যদি বিক্রিয়া খুব বেশি দ্রুত হয়ে যায়, তবে কন্ট্রোল রডগুলো ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে তাপ কমিয়ে আনা হয়। এ ছাড়া পুরো ব্যবস্থাকে কয়েক স্তরের পুরু কংক্রিট ও ইস্পাতের রক্ষাকবচ বা ‘কন্টেইনমেন্ট বিল্ডিং’-এর ভেতরে রাখা হয়, যাতে তেজস্ক্রিয়তা বাইরে ছড়িয়ে না পড়ে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মূলত পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে ভেঙে তাপ তৈরি করে এবং সেই তাপ দিয়ে পানি ফুটিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। এটি যেমন শক্তিশালী, তেমনি যথাযথভাবে পরিচালিত হলে এটি পৃথিবীর অন্যতম পরিচ্ছন্ন ও দীর্ঘস্থায়ী শক্তির উৎস।