মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১২
শিশু নির্যাতনের ভিডিও মাঝে মাঝে ভাইরাল হয়। কোনো কোনো খবর আলোড়ন তোলে; আলোচনা-সমালোচনা হয়। এরপর আমরা বিস্মৃত হই। আবার আরেক খবর আসে সামনে। এ যেন এক চক্র। যেটুকু সামনে আসে তা থেকেই ধারণা করতে পারি, দেশে শিশু নির্যাতনের ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে। জরিপও সে তথ্যই জানায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ১৪ বছর কিংবা তার নিচের ৮৬ শতাংশ শিশুই জরিপ-পূর্ববর্তী এক মাসের মধ্যে শারীরিক শাস্তির শিকার হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজধানীর শারমিন একাডেমিতে শিশু নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়। তখন আমার প্রশ্ন ছিল: শিশুর এমন ‘শিক্ষা’ শুধু শারমিন একাডেমিতে? (সমকাল, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬)। সেই ঘটনায় সামাজিক মাধ্যম তোলপাড়। মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে ভেবেছিলাম, এ ধরনের বিভীষিকার বুঝি যবনিকাপাত ঘটেছে। এরপর মাদ্রাসায় শিশু পেটানোর একাধিক ঘটনা সামনে আসে। গৃহকর্মী নির্যাতন এবং এর বাইরেও শিশু নিপীড়ন থেমে নেই।
শিশু নির্যাতনের করুণ এই বাস্তবতার মধ্যেই আজ পালিত হচ্ছে ‘এন্ড করপোরাল পানিশমেন্ট অব চিলড্রেন’। পানিশমেন্ট তথা শাস্তির নামেই শিশুকে বেশি মারধর করা হয়। পড়াশোনার জন্য পেটানো, শৃঙ্খলার জন্য বেত্রাঘাত, কথা না শোনার জন্য চড়-থাপ্পড়সহ নানা নির্যাতনের শিকার হয় শিশু। চলতি মাসের শুরুতে নরসিংদীতে এক মাদ্রাসাছাত্রকে শিক্ষক পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়েছেন।
শিশুটির বিরুদ্ধে অভিযোগ– গোসল করতে চায়নি। গোসল করার কথা শিক্ষক বুঝিয়ে বললেই তো শিক্ষার্থী শুনতে বাধ্য। তাকে কেন এভাবে পেটাতে হবে? বাচ্চার পুরো শরীরে বেতের দাগ স্পষ্ট। কত কষ্টই না হয়েছিল তার!
শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে শিক্ষক শিশুকে পেটাচ্ছেন। যত জিদ আছে সব মেটাচ্ছেন পেটাতে পেটাতে। তারা কেমন শিক্ষক! নিজের রাগ-ক্ষোভ একটা অসহায় শিশুর ওপর আমরা ঝাড়ছি! অথচ এই শিশুই শিক্ষক হিসেবে তাদের কতটা সম্মান ও শ্রদ্ধা করে। স্কুল-মাদ্রাসা নির্বিশেষ সব প্রতিষ্ঠানেই এমন কিছু শিক্ষক দেখা যায়, যারা শিক্ষার্থীদের ‘মাইরের উপর’ রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
শ্রেণিকক্ষে অনেক সময় বেত নিতে না পারলে চড়-থাপ্পড়, স্কেল কিংবা অন্য কিছু দিয়ে মারেন। অথবা এমন ভয়ভীতি দেখান, শিশুটি কুঁকড়ে যায়। শিশুর ওপর এসবের দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে
যদিও বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শাস্তি নিষিদ্ধ করতে ২০১১ সালে একটি পরিপত্র জারি করে সরকার। এই পরিপত্রে স্পষ্টভাবে কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়েছে, যাতে শিশুরা মারধর ও অপমানের শিকার না হয়। সেখানে ১১ ধরনের শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি মানসিক শাস্তিও নিষিদ্ধ করা হয়। সেখানে এমনকি বলা আছে, শিক্ষার্থীকে চিমটি কাটা যাবে না; রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা যাবে না কিংবা মা-বাবা, ধর্ম বা বংশপরিচয় সম্পর্কেও মন্তব্য করা যাবে না।
দুঃখজনক হলেও সেই পরিপত্র জারির ১৫ বছর পর এসেও আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি বিষয়ে কথা বলছি। তা ছাড়া বাড়ি, প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র কিংবা অন্যত্র শিশুর শাস্তি বন্ধ হয়নি।
শিশুর প্রতি মারধর বন্ধ না হওয়ার একটা কারণ নিঃসন্দেহে দেশের মা-বাবা, শিক্ষকসহ অনেকের ভুল মনস্তত্ব। তারা মনে করেন, শাস্তি শিশুদের সঠিক আচরণ করতে শেখায়। বাস্তব হচ্ছে, সুযোগ পেলেই শিশুরা আগের আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটায়। ফলে শাস্তি একটি অকার্যকর পদ্ধতি। উপরন্তু এটি মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এবং শিশু অধিকারের লঙ্ঘন।
শিশুর বিকাশের জন্য শাস্তি নয়, প্রয়োজন ভালোবাসা ও বয়স অনুযায়ী দিকনির্দেশনা। আমাদের শিক্ষকদের সে জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। শিশুকে কীভাবে শেখাতে হবে, তা অনেক শিক্ষকই জানেন না। শিশুদের আনন্দচ্ছলে শেখালে তাদের শিখন ভালো হয়। অনেক সময় শিক্ষকের অজ্ঞতার কারণে শিশু ভালোভাবে শিখতে পারে না। শ্রেণিকক্ষে অমনোযোগী হয়।
অথচ দুষ্টুমির অভিযোগ দিয়ে শিশুকেই ‘শাস্তি’ দেওয়া হয়। অনেক প্রতিভাবান শিশু এভাবে অতিষ্ঠ হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তবে শিশুকে না মেরেও ভালো শিখন নিশ্চিত হয়– অনেক স্কুল ও মাদ্রাসা এমন উদাহরণ তৈরি করেছে।
ফুলের মতো শিশুকে বেত্রাঘাত করব কেন? তাদের স্নেহ দিয়ে সেভাবেই শেখাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সবসময় মনে রাখতে হবে, কাদের আমরা পড়াচ্ছি। তাদের ওপর মেজাজ হারানো যাবে না।
মা-বাবাকেও অনুধাবন করতে হবে, অভিভাবক বলে তারা যেভাবে ইচ্ছা শিশুর সঙ্গে ব্যবহার করতে পারবেন না। বড়রা নিজেদের শক্তিমত্তা কেন শিশুর ওপর প্রকাশ করবেন? ফুলগুলোকে তাদের মতো ফুটতে দিন। প্রতিটি শিশুই সম্ভাবনাময়। তাদের স্বাভাবিক বিকাশই সেই সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
mahfuz.manik@gmail.com