মো. আবু নাসের
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৭:২০
রাজধানীর পল্লবীতে ছোট্ট শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতিকে আবারও গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। মাত্র আট বছরের একটি শিশু। তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হওয়ার কথা ছিল পরিবার, প্রতিবেশ, সমাজ। কিন্তু কেউই তাকে রক্ষা করতে পারেনি। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে পাশের ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়।
অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, তদন্ত চলছে। শিশুটির ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড শুধু একটি নৃশংস অপরাধ নয়, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার আরেকটি নির্মম উদাহরণ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যসহ শিশুটির পরিবারের বাসায় গিয়েছেন। তিনি শোকাহত বাবা-মাকে সান্ত্বনা ও দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু আমরা আজ এমন এক বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে শুধু সহানুভূতি বা বিচারের আশ্বাস যথেষ্ট নয়।
এই দৃশ্য আমরা বহুবার দেখেছি–একটি ভয়াবহ ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যম উত্তাল হয়। সংবাদমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র আলোচনা। তারপর আসে আমাদের বহুল পরিচিত রাজনৈতিক রুটিন। শোকবার্তা, ক্যামেরা, প্রতিশ্রুতি, সফর এবং ‘দৃষ্টান্তমূলক বিচার’-এর ঘোষণা। তারপর কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে যায়। নতুন কোনো ঘটনা আসে। পুরোনো ক্ষোভ স্তিমিত হয়ে যায়। বিচার আর হয় না।
বাংলাদেশে ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন ও নারী হত্যার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়।
এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংকট। আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বছরের পর বছর ধরে সতর্ক করে আসছে যে দেশে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। অনেক ঘটনা সংবাদমাধ্যমেও আসে না। সামাজিক লজ্জা, বিচারহীনতার ভয় এবং প্রশাসনিক হয়রানির আশঙ্কায় বহু পরিবার নীরব থাকে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, মানুষ ধীরে ধীরে বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে।
‘আমি আপনাদের কাছে আমার নিষ্পাপ মেয়ে হত্যার কোনো বিচার চাই না’–শিশুটির বাবার এ হতাশা বাস্তবতার প্রতিফলন। এই দেশে বহু পরিবার বছরের পর বছর আদালতের সিঁড়ি ভেঙেও ন্যায়বিচার পায়নি। অনেক ধর্ষণ মামলা তদন্তের দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা বা দীর্ঘসূত্রতার কারণে তামাদি হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিটি নতুন ঘটনার পর মানুষ আর শুধু অপরাধীর দৌরাত্ম্য দেখে না, রাষ্ট্রের অক্ষমতাও দেখে।
একটি ধর্ষণ বা হত্যাকাণ্ডের পরে ভুক্তভোগীর বাসায় একজন প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার ঘটনা এই প্রথম নয়। কিন্তু অব্যাহত বিচারহীনতার পরিপ্রেক্ষিতে এ-সংক্রান্ত অতীতের ঘটনাগুলো সুখকর নয়। একটি কার্যকর রাষ্ট্রের পরিচয় তার শোক প্রকাশে নয়, অপরাধ প্রতিরোধের সক্ষমতায়। এবার কি সে পরিচয় মিলবে?
২০২০ সালে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সারাদেশে ক্ষোভের প্রবাহ বয়ে যায়।
সরকার দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেয়, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার আইন আনা হয়। সেই নারী কি বিচার পেয়েছেন? সর্বোপরি, নারী কি নিরাপদ হয়েছে? শিশু নির্যাতন কি থেমেছে? মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, মৃত্যুদণ্ডের আইন করেও রাষ্ট্র তদন্ত ও বিচার ব্যবস্থার মৌলিক দুর্বলতাগুলো ঠিক করতে পারেনি। দ্রুত বিচার এখনও ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়। বহু মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। অনেক ভুক্তভোগী পরিবার মামলা তুলতে বাধ্য হয়। অনেক অভিযুক্ত রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে রক্ষা পায়।
একটি কার্যকর রাষ্ট্রে ধর্ষণ বা গুরুতর কোনো অপরাধের শিকার কারও বাড়িতে সরকারপ্রধানকে যেতে হয় না। কারণ সেই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে। পুলিশ পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত করে। ফরেনসিক ব্যবস্থা কার্যকর থাকে। বিচার দ্রুত হয়। রাজনৈতিক প্রভাব অপরাধীকে রক্ষা করতে পারে না। শিশুরা নিরাপদ থাকে। বাংলাদেশে সমস্যা হলো, প্রতিষ্ঠান দুর্বল কিন্তু প্রচারণা শক্তিশালী।
আমরা এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাস করছি, যেখানে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই ব্যর্থতার ‘মিডিয়া
ম্যানেজমেন্ট’। একটি হত্যাকাণ্ডের পরে কে কাঁদলেন, কে পরিবারকে জড়িয়ে ধরলেন, কে ক্ষতিপূরণ দিলেন–এসব খবর প্রধান হয়ে ওঠে। অথচ কেন একটি শিশু নিরাপদ ছিল না, কেন অপরাধী এমন সাহস পেল, কেন পূর্ববর্তী ঘটনাগুলো থেকেও রাষ্ট্র শিক্ষা নেয়নি–এসব প্রশ্ন দ্রুত হারিয়ে যায়। অথচ প্রকৃত নেতৃত্বের পরীক্ষা এখানেই।
এখন প্রয়োজন জরুরি ভিত্তিতে কাঠামোগত সংস্কার, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার জন্য বিশেষায়িত তদন্ত ইউনিট গঠন। প্রতিটি জেলায় আধুনিক ফরেনসিক সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে। সাক্ষী সুরক্ষা আইন কার্যকর করা প্রয়োজন। নিশ্চিত করতে হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচার ব্যবস্থা। যৌন অপরাধীদের জাতীয় ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে। স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে শিশু নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। সবচেয়ে বড় কথা, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর ভন্ডামি বন্ধ করতে হবে। অপরাধী ‘আমাদের লোক’ হলে নীরব থাকা, আর প্রতিপক্ষের কেউ হলে উত্তেজিত হওয়া–এই সংস্কৃতি বাংলাদেশের নারীদের আরও অনিরাপদ করেছে।
পল্লবীর শিশুটির ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর এখন রাষ্ট্রের সামনে দুটি পথ খোলা। একটি পথ হলো আগের মতোই সমবেদনা, ছবি, প্রতিশ্রুতি, মিডিয়া প্রচারণা, তারপর বিস্মৃতি। আরেকটি পথ হলো সত্যিকারের রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা। বাংলাদেশের মানুষের এখন দ্বিতীয় পথটি দরকার। একজন কন্যাহারা মায়ের কান্না কোনো সরকারের মানবিক প্রচারণার দৃশ্য হওয়া উচিত নয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা তাঁর সহকর্মীদের কাজ ক্যামেরার সামনে সহানুভূতি প্রদর্শন নয়। তাদের কাজ এমন একটি দেশ গড়ে তোলা, যেখানে নারীরা বাঁচবেনিরাপদে, শিশুরা বড় হবে ভয়ের বাইরে। কোনো সরকারের প্রকৃত সাফল্য তিনি কতজন শোকাহত পরিবারকে আলিঙ্গন করেছেন তার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না। বরং এটি নির্ধারিত হয় তিনি কতজন শিশুকে নিরাপদ রাখতে পেরেছেন তার মাধ্যমে।
ড. মো. আবু নাসের: ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, বেকার্সফিল্ডের কমিউনিকেশনস বিভাগের চেয়ারপারসন