পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত একটি সরকারের দুই মাস পূর্ণ হওয়া বড় ঘটনা নয়। এ সময়ে কাজের যথাযথ মূল্যায়নও অসম্ভব। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আসা অন্তর্বর্তী সরকারের মূল্যায়নে একই দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ দেখা গিয়েছিল। বিএনপি সরকার নির্বাচনের ভেতর দিয়ে এলেও দেশকে ইতিবাচক অবস্থায় পায়নি। রাজনীতি, অর্থনীতি উভয় ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি। রীতি অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা। তবে পরিস্থিতির চাপে বিচার, সংস্কারের দায়িত্বও তাকে নিতে হয়।
এসব ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ। শেষে নির্বাচন সম্পন্ন করে সরকারটি দায়মুক্ত হয়। তাদের অনিষ্পন্ন দায়িত্ব বর্তেছে নির্বাচিত সরকারের ওপর। সুশাসন নিশ্চিত করাসহ সরকারের নিত্যদিনের কাজ স্বভাবতই রয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি জয়ী হবে– এটা সম্ভবত তাদেরও জানা ছিল। এ অবস্থায় উপস্থিত চ্যালেঞ্জ সামলে দেশ পরিচালনা করতে হবে– এটা তাদের মাথায় ছিল নিশ্চয়। জনগণ মোটা দাগে কী চায়, সেটাও বিএনপির নীতিনির্ধারকদের না জানার কথা নয়। তারা এর আগে একাধিকবার দেশ চালিয়েছেন। তবে দলে নেতৃত্বের বিকাশ স্বভাবতই বাধাপ্রাপ্ত হয় শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে।
অব্যাহত দমন-পীড়ন মোকাবিলা করে টিকে থাকাই ছিল তাদের প্রধান বিবেচ্য। দীর্ঘ সময় নির্বাচনের বাইরে থাকায় সংসদীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে বিকশিত হওয়ার সুযোগও তাদের হয়নি। এ অবস্থায় নবগঠিত মন্ত্রিসভা হয়তো সুধীসমাজের প্রত্যাশা পূরণ করেনি। তাদের কাছে প্রত্যাশাও হয়তো সীমিত। সংসদ স্বাভাবিকভাবে চলবে এবং ন্যূনতম সুশাসন নিশ্চিত করা হবে, এটাই হয়তো প্রত্যাশা। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও অসাধারণ নয়।
এটা জানা আছে বলেই তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে জোর দিয়েছিল জনকল্যাণে। অর্থনীতি কী অবস্থায় আছে, সেটা তাঁর টিমের বড় বিবেচনার বিষয় বলেই মনে হয়েছে। সে জন্যই তারা সামাজিক সুরক্ষায় নতুন কিছু ধারণার প্রয়োগ ঘটাতে উদ্যোগী ছিলেন। তার বাস্তবায়নও শুরু করেছেন দ্রুত। সরকারের দুই মাস পেরুনো উপলক্ষে তাদের তরফ থেকে এর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। খাল খনন কর্মসূচিতেও জোর দিয়েছে সরকার।
পিতৃভূমি বগুড়ায় গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব উদ্যোগের কথা জোর দিয়ে বলেছেন। কোত্থেকে অর্থের ব্যবস্থা হবে, এর সদুত্তরও দিতে চেয়েছেন। নতুন যে কোনো খরচের খাত ঘিরে অর্থায়নের প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একটা অবনতিশীল রাজস্ব পরিস্থিতিতে কাজ শুরু করতে হয়েছে সরকারকে। এ কারণে উন্নয়ন সহযোগী, বিশেষত আইএমএফের দিক থেকে চাপের মুখে আছে সরকার।
সরকার বড় সংকটে পড়েছে ইরান যুদ্ধ ঘিরে জ্বালানি তেলের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায়। ডিজেলসহ জ্বালানির সহজপ্রাপ্যতার পরিবেশও বিপন্ন। প্রধানমন্ত্রীকে এ পরিস্থিতিও বুঝিয়ে বলতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল আনতে পারলেও তার বিতরণে সংকট কেন কাটছে না– এর সদুত্তর অবশ্য নেই। এ জন্য অর্থায়ন নয়; সময়োচিত পদক্ষেপ ও এর বাস্তবায়নে ব্যর্থতাই দায়ী। সরকার সম্ভবত চেয়েছিল বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দাম না বাড়িয়ে জ্বালানির অভ্যন্তরীণ বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা দূর করতে।
কিন্তু এতে ‘প্যানিক বায়িং’ ও এর কালোবাজারি রোধ করা যায়নি। অনেকে বলছেন, অন্যান্য দেশের মতো দ্রুত দাম বাড়িয়ে দেওয়াই ছিল সঠিক পদক্ষেপ। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা অনস্বীকার্য। জ্বালানির বাজারে কৌশলগতভাবে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া অবশ্য জরুরি, যেহেতু গোটা অর্থনীতিতেই এর অপ্রতিরোধ্য প্রভাব রয়েছে।
সরকারকে এখন পরিবহন ভাড়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ‘অস্বাভাবিক প্রভাব’ রোধ করতে হবে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে তেমন পড়বে না বলে মন্তব্য করা সিনিয়র মন্ত্রীদের সাজে না। প্রভাব যেন অস্বাভাবিকভাবে না পড়ে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে তাদের। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও জোরদার করতে হবে, যাতে ইতোমধ্যে বিপন্ন জনগোষ্ঠীতে মূল্যস্ফীতির চাপ না বাড়ে।
জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকির বিরোধিতা করলেও আইএমএফ সামাজিক সুরক্ষা জোরদার বিষয়ে আপত্তি করে না। করলেও আমরা শুনব কেন? বিএনপি সরকার তো প্রথম দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়াতেও ইচ্ছুক ছিল না। তবে জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টিও সরকারকে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। সদিচ্ছা থাকলেও এমনকি বহিঃস্থ পরিস্থিতির চাপে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা যে কোনো সরকারের পক্ষেই কঠিন।
জনগণকে সেটা বুঝিয়ে শান্ত রাখা ততোধিক কঠিন।ইরান যুদ্ধ বন্ধ হলেও জ্বালানির বাজার পূর্বাবস্থায় আসতে দুই বছর লাগতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান। বাস্তবে এর অর্ধেক সময় লাগলেও প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানির ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে পরিস্থিতিটা মোকাবিলা করতে হবে তারেক রহমানের সরকারকে। জ্বালানি সংকটে বিনিয়োগ পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে শ্রমের বাজারে যে অভিঘাত পড়বে, সেটা নতুন সংকটের জন্ম দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বৈধতার সংকটে থাকা সরকার বেশি চাপের মুখে থাকে ভেবে নির্বাচিত সরকার নির্ভার থাকতে পারবে না।
রাজস্ব দ্রুত বাড়ানোর সুযোগ নেই বলে ঋণের ওপরেই নির্ভর করতে হবে সরকারকে। সহজ শর্তে বিদেশি ঋণ পাওয়াই এ ক্ষেত্রে সুবিধাজনক। সরকার চাইছে তিন বিলিয়ন ডলারের মতো বাজেট সহায়তা, যেটা প্রয়োজনমতো কাজে লাগানো যাবে। খাদ্যশস্যের সংকট হলে জরুরি ভিত্তিতে সেটা আমদানির জন্যও সরকারকে প্রস্তুতি রাখতে হচ্ছে। ডিজেল ও সার সংকটে চলতি বোরো উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কাও করছেন অনেকে।
এখনও অস্পষ্ট– কেমন বাজেট দিতে যাচ্ছে নতুন সরকার। আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই। জ্বালানি পরিস্থিতির চাপে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো না হলেও মূল্যস্ফীতি বাড়বে। মজুরি বৃদ্ধির চাপও মোকাবিলা করতে হবে সরকারকে। সরকারি খাতে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব ঝুলে থাকাটা অবশ্য স্বাভাবিক। এ অবস্থায় গতানুগতিক প্রশাসনকে আবার সক্রিয় করতে হবে সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে।
মব সহিংসতা কমে এলেও আইনশৃঙ্খলার দ্রুত উন্নতি ঘটানো কঠিন। পথেঘাটে চাঁদাবাজি এবং প্রশাসনে দুর্নীতি কমানো গেলেও মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যেত। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা প্রায়ই বলতেন, নির্বাচিত সরকার এলে এসব ক্ষেত্রে গতি আসবে। আইনশৃঙ্খলা ও সুশাসনের ক্ষেত্রে আবার অর্থায়নের চেয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে মানুষ বিচার করবে সরকারের সদিচ্ছা।
তারা দেখতে চাইবে, ক্ষমতাসীন দলের লোকজন কী করছে। দেখতে চাইবে, নতুন এক দল ব্যবসায়ী আগেকার মতো দুর্বৃত্ত হয়ে উঠছে কিনা। ব্যবসার ক্ষেত্রেও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ দেখতে চাইবে মানুষ।
রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপি সরকারের অবস্থান অবশ্য আগে-পরে অভিন্ন। বিরোধী দল যা-ই বলুক, তারা নিজস্ব অঙ্গীকারের বাইরে যেতে অনিচ্ছুক। গণঅভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না থাকতে পারলে অবশ্য সরকারের নিন্দামন্দ বাড়বে। বিরোধী দলের বিষয়ে গতানুগতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগও বেশি দিন ধোপে টিকবে না।
সংস্কারে সদিচ্ছা দেখাতে কিন্তু অধিকতর সময় কিংবা অর্থকড়ি জরুরি নয়। এ ক্ষেত্রে এরই মধ্যে সরকার কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ। পাশাপাশি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাসহ দক্ষভাবে সরকার চালানো না গেলে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হতে সময় লাগবে না।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক