সেলিম জাহান
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৬:৫১ | আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৬:৫৩
অভিধানে স্বৈরাচারের মানে করা হয়েছে– ‘নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করা’। বাস্তবে এটি দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিবিহীন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অন্যের চাওয়া-পাওয়া এবং গণতান্ত্রিক অধিকারকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে খেয়াল খুশিমতো অন্যের জীবন ও জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং দ্বিতীয় পক্ষকে এ অবস্থা মেনে নিতে বাধ্য করে। একটি বৃহত্তর প্রেক্ষিত থেকে দেখলে স্বৈরাচার আসলে একটি অপসংস্কৃতি এবং মানবতাবিরোধী প্রক্রিয়া।
প্রথাগতভাবে আমরা স্বৈরাচার ব্যাপারটিকে সর্বসম্মতভাবেই একটি রাজনৈতিক বিষয় বলে ভেবে এসেছি। রাজনৈতিক শাসন ক্ষমতা হাতে থাকলেই সাধারণত নিজের খেয়াল-খুশি অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সহজতর হয়। সুতরাং স্বৈরাচার বলতে স্বৈরাচারী শাসকদের মুখই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। অথচ এর বিস্তৃতি রয়েছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও। অন্য একটি মাত্রা থেকে বিচার করলে স্বৈরাচার শুধু রাষ্ট্রীয় জীবনে থাকতে পারে, এমন নয়।
এর সদৃশ উপস্থিতি সম্ভব ব্যক্তি বা সমাজজীবনে। স্বৈরাচার কখনও কখনও স্থূলভাবে আত্মপ্রকাশ করে, আবার ক্ষেত্রবিশেষে তা নিভৃত সূক্ষ্ম। সবকিছু মিলিয়ে বলা যেতে পারে, স্বৈরাচার ব্যাপারটি বহুমাত্রিক একটি ব্যাপার, যাকে একরৈখিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে খণ্ডিত একটি ছবিই পাওয়া যাবে, পূর্ণাঙ্গ নয়।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো ব্যক্তি বা শক্তি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে এসে বা জনগণকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা নিরঙ্কুশভাবে কুক্ষিগত করলে জনগণের প্রতি তার দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহি অপাঙ্ক্তেয় হয়ে পড়ে। সে ব্যক্তি হয়ে ওঠে চূড়ান্ত ক্ষমতাধর এক শক্তি এবং তার চূড়ান্ত রূপের কারণে সে হয়ে ওঠে সকল রকম দুর্নীতির ধারক-বাহক। ইংরেজিতে একটি কথা আছে– ‘পাওয়ার করাপ্টস, অ্যাবসলিউট পাওয়ার করাপ্টস অ্যাবসলিউটলি’।
এ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার চূড়ান্ত কেন্দ্রীকরণ ঘটে, যেখানে তুচ্ছতম বিষয়গুলোও নিষ্পত্তির হয় সর্বক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তির সম্মতি নিয়ে। ফলে প্রশাসনে জন্মলাভ করে চূড়ান্ত অদক্ষতা; স্থায়ী আসন পায় উচ্চ দুর্নীতি।
রাষ্ট্রীয় স্বৈরাচারের সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা অঙ্গাঙ্গী জড়িত। স্বেচ্ছাচারী ব্যবস্থা একজন শাসককে রাষ্ট্রীয় অর্থ-সম্পদের ওপর তার পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রদান করে। সেই শাসক অর্থ-সম্পদ খেয়াল খুশিমতো ব্যয়ের পাশাপাশি আত্মসাৎও করতে পারে। একজন স্বৈরাচারী শাসক নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় অনুদান, পুরস্কার বা উপহার বিলান ইচ্ছামতো। ফলে বিপন্ন হয় অর্থনৈতিক সুশাসন। এর ফলে একদিকে সম্পদের সংকট দেখা দেয়; রাষ্ট্রীয় ঋণভার বেড়ে যায়; অন্যদিকে প্রকৃত মানব উন্নয়ন ব্যাহত হয়।
রাষ্ট্রীয় অঙ্গনে স্বৈরাচারী শক্তির আত্মপ্রকাশ ও তার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ একজন ব্যক্তির দ্বারা হয় না। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিকে এ জন্য গড়ে তুলতে হয় এক সহযোগী শ্রেণির, একটি সহযোগী মোর্চার। সে মোর্চার গোষ্ঠীগুলোকে তুষ্ট রাখতে প্রয়োজন হয় সম্পদ বিতরণের, যা আবার জনগণের। আর কুক্ষিগত ওই সম্পদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য তা পাচার করা হয় দেশের বাইরে।
স্বৈরাচারী শাসককে খুশি রাখার জন্য তার সহযোগীরা চালু করে তোষামোদ প্রক্রিয়া। মিথ্যা স্তব-গানে তোষিত নেতাকে এ ধারণাই দেওয়া হয়– তিনিই চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। নেতাকে স্বেচ্ছাচারী করার মাধ্যমে অনুগামীরাও স্বেচ্ছাচারিতার ছাড়পত্র পেয়ে যায়।
এ প্রক্রিয়া ক্রমান্বয়ে নেতাকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। বাস্তব সত্যকে তোষিত নেতার কাছে কখনোই তুলে ধরা হয় না। এর ফলে তোষিত নেতা শুধু তা-ই দেখতে পান, যা তোষামোদকারীরা তাকে দেখাতে চায়।
রাষ্ট্রীয় স্বৈরাচারের প্রলম্বিত বলয়ই হচ্ছে রাজনৈতিক স্বৈরাচার। রাজনৈতিক চিন্তা বা ব্যবস্থায় যদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাব থাকে; অনুপস্থিত থাকে পারস্পরিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ; আলাপ-আলোচনা-বিতর্ক নিরসনে শক্তি ব্যবহার করা হয়; দৃঢ়চেষ্টা থাকে ভিন্নমতের টুঁটি চেপে ধরার, তাহলে রাজনৈতিক চিন্তা বা ব্যবস্থা স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে।
এই স্বৈরাচারের আর এক মাত্রা হচ্ছে এক অহংবোধ–‘আমি যা বলছি, তা-ই ঠিক’; ‘আমি সব জানি’। ব্যাপারটি তখন অন্যদের জন্য হয়ে ওঠে বাধ্যতামূলক। সেখানে মারা পড়ে সেই আপ্তবাক্য– ‘আমি আপনার সঙ্গে সর্ববিষয়ে দ্বিমত পোষণ করতে পারি; কিন্তু আপনার মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ন রাখার জন্য আমি জীবন দিতে প্রস্তুত।’
রাজনৈতিক স্বৈরাচারের অন্যতম আধার রাজনৈতিক দলগুলো। রাজনৈতিক দলগুলো যদি গণতন্ত্রমনা হয়, তাহলে তারা দলের অভ্যন্তরে সর্বপর্যায়ে গণতন্ত্রের চর্চা করবে। সেখানে আলোচনা হবে সর্বঅর্থে মুক্ত– মুক্তমন, মুক্তচিন্তা এবং মুক্ত পরিবেশে, যেখানে বিতর্কে অংশ নেওয়ার সমঅধিকার থাকবে সবার– সাধারণ কর্মী থেকে নেতার। সেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে সবার মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখে।
অথচ কখনও কখনও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বৈরাচারী মূল্যবোধ প্রকট হয়ে ওঠে, যেখানে সাধারণ সদস্যদের ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন না। সিদ্ধান্তের সর্বময় ক্ষমতা দেওয়া হয় দলের সর্বোচ্চ নেতাকে, যিনি একক সিদ্ধান্তে সব কিছু নির্ধারণ করেন। অধীশ্বরের মতো এক চূড়ান্ত ক্ষমতা দেওয়া হয় দলনেতাকে।
স্বৈরাচার– তা ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্র, যে পর্যায়েই হোক না কেন অথবা তা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক; যেখান থেকেই হোক না কেন, এর ভবিষ্যৎ বিকাশ বা বিলুপ্তি চূড়ান্ত বিচারে নির্ভর করে ব্যক্তি মানুষের ওপর। একজন ব্যক্তি যদি নির্ভরতামুক্ত মন নিয়ে সকল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সম্মান করে, তার জীবনের সর্বক্ষেত্রে চর্চা করে যায় গণতন্ত্র, তাহলে একটি স্বৈরাচারমুক্ত, গণতন্ত্রমনস্ক মানুষ আমরা পাব।
এই গণতন্ত্রমনস্ক মানুষেরাই একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবে সামাজিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। একটি অর্থনৈতিক অবরোধ গড়ে তুলবে অর্থনৈতিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এবং একটি রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলবে রাজনৈতিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে।
সুতরাং স্বৈরাচারকে ভবিষ্যতে নির্মূল করতে হলে আগে আমাদের প্রত্যেককে আপন স্বৈরাচারের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এ রকম দশটা মানুষও যদি তৈরি হয়, তাহলে তারাই গণতন্ত্রের অভীষ্টকে সামনে নিয়ে যেতে পারে গুটি গুটি পায়ে। তাদের সে যাত্রাপথে দিন দিন সহযোগীর সংখ্যা বাড়বে এবং একদিন তা পরিণত হবে জনসমুদ্রে। সেই সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গে স্বৈরাচার গুঁড়িয়ে যাবে
চিরদিনের মতো।
দেশে দেশে, যুগে যুগে বারবার রাষ্ট্রীয় স্বৈরাচারের মৃত্যুঘণ্টা বাজে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। এ প্রক্রিয়ায় ঝরে যায় বহু তরুণ-তাজা প্রাণ। আত্মাহুতি দেয় অন্যরাও। তবে গণতন্ত্রমনস্কদের উত্থান না ঘটলে সেই আত্মত্যাগ প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনে না।
ড. সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র