1. shahajahanbabu@gmail.com : admin :
বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি: ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাসমুহ, সমস্যা , উদ্যোগ - Pundro TV
বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৮ অপরাহ্ন



বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি: ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাসমুহ, সমস্যা , উদ্যোগ

অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশে বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত হাম (Measles) আবারও জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচীর মাধ্যমে টেকসই সাফল্য সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে এ রোগের সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল “হটস্পট” হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গত তিন/চার সপ্তাহে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী প্রায় ১০০ শিশুর হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলে এর প্রভাব বেশি। দেশের ৫৬টি জেলায় ৭,৫০০-এর বেশি শিশুর দেহে হাম শনাক্ত হয়েছে, যার অধিকাংশ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে। এ পরিস্থিতিতে ১০ লক্ষাধিক শিশুকে জরুরি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে প্রায় ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভাকে অধিক সংক্রমণপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চল—বিশেষ করে বরগুনা, বরিশাল ও ঝালকাঠি— এ তিনটি জেলা ঝুঁকিতে রয়েছে। নদীবিধৌত ও দুর্গম এলাকা হওয়ার কারণে এসব অঞ্চলে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হয়, ফলে অনেক শিশু টিকাদান থেকে বঞ্চিত থাকে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কক্সবাজার ও চাঁদপুরেও সংক্রমণের হার বেশি।

কক্সবাজারে জনসংখ্যার ঘনত্ব, সারা দেশের মানুষের চলাচল এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী উপস্থিতি সংক্রমণ বৃদ্ধি এর কারণ হিসেবে কাজ করছে। উত্তরাঞ্চল—বিশেষ করে পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁ—হাম সংক্রমণের একটি বড় ক্লাস্টার হিসেবে দেখা দিয়েছে। একই জেলার একাধিক উপজেলায় টিকাদানের ঘাটতি রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকা, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর প্রভৃতি জেলাসমুহ মাঝারি ঝুঁকিতে থাকলেও; দ্রুত নগরায়ণ, বস্তি এলাকার আধিক্যের কারণে এসব এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই প্রবণতা ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনাতেও দেখা যায়, সচেতনতার অভাবও অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকে হাম রোগীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে, ফলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে-এ রোগীর সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। হাম রোগটি আক্রান্ত শিশুর দেহে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং মৃত্যুর মতো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে টিকাবঞ্চিত বা কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরও প্রকট। অধিকাংশ আক্রান্ত শিশু ১০ বছরের নিচে, এবং ৫ বছরের নিচের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। আক্রান্তদের বড় অংশই টিকা নেয়নি অথবা সম্পূর্ণ ডোজ গ্রহণ করেনি বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এই পরিস্থিতির পেছনে—নিয়মিত টিকাদানে অবহেলা, ড্রপ-আউট শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিচ্ছন্ন, ঘনবসতি এবং দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা প্রভৃতি কারণসমুহ অন্যতম।

এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকার বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইপিআই কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে ১০ লক্ষ শিশুকে নতুন করে টিকার আওতায় আনা হচ্ছে। সাম্প্রতিক ক্যাম্পেইনে ৬–৫৯ মাস বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, বিশেষ করে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কঠোরভাবে তা পালন করা হবে।

এছাড়া “হটস্পট” ভিত্তিক জরীপ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিবিড় টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সংক্রমণ নজরদারি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে, যাতে দ্রুত শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ দ্রুততার সাথে নিশ্চিত করা যায়। রোগ নির্ণয়, রিয়েল-টাইম রিপোর্টিং এবং প্রাদুর্ভাব তদন্ত কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গুরুতর রোগীদের জন্য উন্নত সেবার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্পৃক্ততা এবং WHO, UNICEF ও GAVI-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা এই প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যম ও কমিউনিটি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো শিশুদের টিকা নিশ্চিত করা, গুজব ও কুসংস্কার থেকে দূরে থাকা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অপরিহার্য। মনে রাখা দরকার যে, টিকাবঞ্চিত শিশু শুধু নিজের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে হাম নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, এই অর্জন ধরে রাখতে হলে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। টিকাদান আওতা বৃদ্ধি, কার্যকর নজরদারি এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে হামমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। এখনই সময়—সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিটি শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এ প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে মুক্ত রাখা।

জনস্বাস্থ্য ও হাইপারবারিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২
Developed By ATOZ IT HOST