পুরনো প্রতিহিংসার সংস্কৃতি বাদ দিয়ে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণে রাজনীতিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্প্রীতির নতুন ধারা সূচিত হলো। এই ধারার সূচনা করলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি ভোট পেয়ে সরকার গঠনের দুদিন আগে রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির
আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাড়িতে গেলেন তিনি। ভোটে পরাজিত দলের নেতার বাড়িতে বিজয়ী দলের নেতা–এমন ঘটনা বিরল। এর আগে বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো দলের প্রধানকে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাড়িতে যেতে দেখা যায়নি। এর মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সম্প্রীতি এবং বদান্যতার
উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো। সমকালীন রাজনীতির আকাশে দীর্ঘ দিন ধরে যে শূন্যতা, হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছিল, তার যবনিকাপাত ঘটল; প্রত্যাশার আলোকবর্তিকা উদিত হলো।
বিএনপির একটি সূত্র জানায়, বিএনপি ইতিবাচক রাজনীতির সূচনা করতে চায়। এর অংশ হিসেবেই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি দলের প্রধানদের বাগিতে সৌজন্য সাক্ষাতে গেছেন তারেক রহমান।
এই আগমন জাতীয় রাজনীতির জন্য ঐতিহাসিক: শফিকুর রহমান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তার বাড়িতে গেলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাতটার দিকে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে রাজধানীর বসুন্ধরায় জামায়াত আমিরের বাড়িতে যান তিনি। এ সময় জামায়াত আমির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অগ্রিম অভিনন্দন জানান এবং ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এই সাক্ষাৎকে জাতীয় রাজনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলেও মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান।
তারেক রহমান বসুন্ধরায় পৌঁছালে তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন শফিকুর রহমানসহ জামায়াতের অন্য নেতারা। এরপর সেখানে সৌজন্য বৈঠকটি করেন তারা। সাক্ষাৎ শেষে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তারেক রহমানের সঙ্গে তোলা ছবি প্রকাশ করেন জামায়াত আমির। ছবির ক্যাপশনে তিনি তারেক রহমানকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করে অগ্রিম অভিনন্দন জানান।
জামায়াত আমির লেখেন, ‘তিনি আজ আমার আবাসিক কার্যালয়ে এসেছিলেন। তার এই আগমন আমাদের জাতীয় রাজনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমি তার এই আগমনকে স্বাগত জানাই এবং প্রত্যাশা রাখি, সংলাপ ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এটি রাজনৈতিক পরিপক্কতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।’
শফিকুর রহমান আরও লেখেন, ‘আমাদের আলোচনায় তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং বিরোধী দলের কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যেকোনো হামলা রোধে তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। আমি এই আশ্বাসকে সাধুবাদ জানাই। আমাদের প্রত্যাশা, কোনো নাগরিকই যেন ভয়ভীতি বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হয়।’
জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন জানিয়ে শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘তবে একটি আদর্শিক বিরোধী দল হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আমরা আপসহীন থাকব। সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজে আমাদের সমর্থন থাকবে, কিন্তু যেখানেই জবাবদিহিতার প্রয়োজন হবে, সেখানে আমরা সোচ্চার থাকবে।’
শফিকুর রহমান যোগ করেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য সংঘাত নয় বরং সংশোধন; বাধা দেওয়া নয় বরং পর্যবেক্ষণ। দেশের মানুষ এমন একটি সংসদ প্রত্যাশা করে, যা ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করবে এবং স্থিতিশীলতার সাথে রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’
এ সময় সেখানে আরও ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। জামায়াত নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
মতভিন্নতা সংলাপে সমাধানের তাগিদ এনসিপির
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে দেখা করতে তার বাড়িতে গেলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ৮টায় রাজধানীর বাড্ডায় নাহিদের বাড়িতে পৌঁছান তিনি। এসময় নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে আলোচনা করেন তারা। এছাড়া ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা থাকলেও তা সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের ব্যাপারে তারা একমত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন।
তিনি বলেন, নির্বাচনের ফল নিয়ে যেগুলো প্রশ্ন ছিল ও সহিংসতা হচ্ছে সেগুলো নিয়ে কথা হয়েছে। রাজনৈতিক সৌজন্যতা দেখিয়ে তিনি এসেছেন এজন্য তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা। সামনে যাতে একসঙ্গে কাজ করতে পারি সে বিষয়ের পাশাপাশি সংস্কার ও বিচারের ব্যাপারে কথা হয়েছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা থাকলেও তা সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের ব্যাপারে একমত হয়েছেন তারেক রহমান ও নাহিদ ইসলাম।
তিনি জানান, সাক্ষাৎকালে তারেক রহমানকে ফুলেল শুভেচ্ছা ছাড়াও ‘শাপলা কলি’র প্রতিকৃতি এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের একজন শহীদের লেখা চিঠি উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
আখতার হোসেন বলেন, রাজনৈতিক সৌজন্যতা দেখিয়ে তারেক রহমান এসেছেন, এজন্য তাকে শুভেচ্ছা জানাই। এই শুভেচ্ছা বিনিময় দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের আভাস দেয়।
বৈঠকের আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে তিনি জানান, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে যেসব প্রশ্ন ছিলো এবং বর্তমান সহিংসতা নিয়ে দুই নেতার মধ্যে কথা হয়েছে। এছাড়া সামনে যাতে সব দল একসঙ্গে কাজ করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিচারের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
এনসিপির সদস্যসচিব আরও যোগ করেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলোর মধ্যে ভিন্ন মত থাকতে পারে, তবে যেকোনো স
সঙ্কটে সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের ব্যাপারে তারা কথা বলেছেন।
এনসিপির সদস্যসচিব বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে ইতিবাচক রাজনীতির সূচনার অংশ হিসেবে তারেক রহমান এনসিপির আহ্বায়কের বাড়িতে গিয়ে এ সাক্ষাৎ করেছেন বলে বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের পোস্টে দাবি করা হয়েছে।’
তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানসহ অন্য নেতারা। অন্যদিকে নাহিদ ইসলামের সঙ্গে ছিলেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।