গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে দেশে ফিরে আসার আগে ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন তারেক রহমান। দেশে ফেরার মাত্র সাত সপ্তাহের মধ্যে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বেসরকারি ফলাফলের ভিত্তিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয় পায়। ছাত্র–জনতার নেতৃত্বে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সংঘটিত অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।গত জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী টাইম তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সাক্ষাৎকারে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে পুনর্গঠন এবং সমাজে সৃষ্টি হওয়া বিভাজন দূর করার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তারেককে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন কোন বিষয় তার জন্য অগ্রাধিকার হবে। তিনি প্রথমে বলেন, ‘আইনের শাসন নিশ্চিত করা’, এরপর ‘আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা’ এবং তৃতীয়ত ‘দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করা’। তারেকের মতে, রাজনৈতিক কর্মসূচি যতই গ্রহণ করা হোক না কেন, দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।
জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তারেক রহমান উল্লেখ করেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের সময় ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয় এবং ১৫ বছরে প্রায় ৩ হাজার মানুষকে গুম করা হয়। সেই ক্ষত এখনও তাজা। আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনীতিকীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা পুনঃস্থাপন করতে তারেককে কাজ করতে হবে। দেশে ফিরে তিনি প্রতিশোধ না নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন এবং শান্তি বজায় রাখতে নিরলসভাবে কাজ করতে চান। তারেক বলেন, “প্রতিশোধ কিছুই ফিরিয়ে আনতে পারবে না; যদি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারি, দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারি, তবেই ভালো কিছু অর্জন সম্ভব।”
অর্থনৈতিক সংস্কারে তারেক জানান, হাসিনার শেষ সময়ে বাংলাদেশ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। জিডিপি ২০০৬ সালে ৭ হাজার ১০০ কোটি ডলার থেকে ২০২২ সালে ৪৬ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। তবে জীবনযাত্রার ব্যয়, বেকারত্ব এবং সামাজিক অসমতার কারণে সাধারণ মানুষ অসন্তুষ্ট ছিল। এখনও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও টাকার মান দুর্বল হওয়ায় পরিবারের বাস্তব আয় কমে গেছে। তারেকের পরিকল্পনা তরুণ উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল অর্থনীতিতে সম্পূর্ণভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া এবং প্রবাসী ১০ লাখ কর্মীর দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উচ্চ বেতনের চাকরির সুযোগ নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশে ৪ কোটির বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীদের ও বেকারদের মাসিক নগদ সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি ছিল। তারেক ব্যাংকিং খাত উদারীকরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ করতে চান এবং বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ মোকাবিলা করতে উদ্যোগ নিচ্ছেন।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তারেক গুরুত্বারোপ করেছেন। হাসিনার পতনের পর নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ ছিল, কিন্তু নির্বাচনের পর ভারত সরকার বিএনপির সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে। নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশের মার্কিন বাজারের জন্য তুলা ভিত্তিক পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশ করতে পারবে।
ইসলামপন্থী দলের উত্থান নিয়ন্ত্রণেও তারেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চান। নির্বাচনে বিএনপির পর সবচেয়ে বেশি আসন পায় জামায়াতে ইসলামী। তারেক বলেন, “সব দলের একসঙ্গে কাজ করা দেশের স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু বিএনপির দায়িত্ব নয়; দেশের সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব।” তিনি আরও বলেছেন, ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে যাতে জনগণের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত হয়।
শিক্ষার্থীদের নিয়ে তারেক বলেছেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনে প্রাণ হারানো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষদের সম্মান জানানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে।” শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের অগ্রভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল এবং এখন তাদের সুযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
টাইমের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, তারেক রহমান শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, দক্ষিণ এশিয়া ও আন্তর্জাতিক মঞ্চেও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারেন। তার লক্ষ্য দেশকে ঐক্যবদ্ধ করা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।