কর্মীদের কম্পিউটার কার্যক্রম নজরদারিতে রাখতে নতুন মাউস ট্র্যাকিং সফটওয়্যার চালু করায় তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট Meta-এর ভেতরে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অফিসে লিফলেট বিতরণ, অনলাইন পিটিশন এবং অভ্যন্তরীণ আলোচনার মাধ্যমে কর্মীরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে শুরু করেছেন। প্রযুক্তি খাতে চলমান ছাঁটাই ও এআই-নির্ভর পুনর্গঠনের মধ্যেই বিষয়টি নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, অফিসের মিটিং রুম, ভেন্ডিং মেশিন, এমনকি টয়লেট পেপার ডিসপেনসারের কাছেও প্রতিবাদী লিফলেট রাখা হয়েছে। এসব লিফলেটে কর্মীদের একটি অনলাইন পিটিশনে সই করার আহ্বান জানানো হয়। সেখানে লেখা ছিল—“আপনি কি Employee Data Extraction Factory-তে কাজ করতে চান?”
কর্মীদের অভিযোগ, নতুন সফটওয়্যারটি তাদের প্রতিদিনের কম্পিউটার ব্যবহারের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছে। এর মধ্যে রয়েছে মাউসের নড়াচড়া, ক্লিক করার ধরন, বিভিন্ন মেনু ব্যবহারের প্যাটার্ন এবং স্ক্রিনে কাজের আচরণ বিশ্লেষণ। অনেকের আশঙ্কা, এসব তথ্য ব্যবহার করে এমন AI automation system তৈরি করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে মানুষের কাজ কমিয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো “behavioral data” সংগ্রহের মাধ্যমে আরও উন্নত Artificial Intelligence model প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। ব্যবহারকারীরা কীভাবে সফটওয়্যার ব্যবহার করেন, কোন বাটনে ক্লিক করেন কিংবা কীভাবে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করেন—এসব তথ্য এআইকে মানুষের মতো সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। তবে একই সঙ্গে এতে গোপনীয়তা ও কর্মক্ষেত্রের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে Meta তাদের মোট কর্মীর প্রায় ১০ শতাংশ ছাঁটাই করতে পারে বলে আলোচনা চলছে। এর আগেও প্রতিষ্ঠানটি একাধিক দফায় হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। ফলে নতুন নজরদারি প্রযুক্তি চালুর ঘটনাকে অনেক কর্মী চাকরির অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, কর্মীদের কাজ পর্যবেক্ষণের জন্য monitoring software ব্যবহার নতুন কিছু নয়। করোনা মহামারির পর Remote Work culture বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানি productivity tracking tools ব্যবহার শুরু করে। তবে মাউস মুভমেন্ট, কিবোর্ড অ্যাক্টিভিটি কিংবা স্ক্রিন টাইম বিশ্লেষণের মতো কৌশল কর্মীদের মধ্যে “digital surveillance” নিয়ে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
অন্যদিকে Meta বলছে, ভবিষ্যতের AI assistant এবং autonomous agent তৈরির জন্য বাস্তব ব্যবহার তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র Andy Stone এক বিবৃতিতে জানান, মানুষ কীভাবে কম্পিউটার ব্যবহার করে তা বোঝা গেলে AI system আরও কার্যকর ও বাস্তবমুখী হবে। তার ভাষ্য, ভবিষ্যতে এসব AI agent ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন কম্পিউটারভিত্তিক কাজ সহজ করতে সাহায্য করবে।
তবে কর্মীদের একটি অংশের দাবি, প্রযুক্তি উন্নয়নের নামে তাদের উপর অতিরিক্ত নজরদারি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, কর্মীদের কাজের ধরন বিশ্লেষণ করে এমন AI model তৈরি করা হচ্ছে, যা একসময় মানুষের বিকল্প হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম আইন অনুযায়ী, কর্মীরা নিজেদের কর্মপরিবেশ, গোপনীয়তা ও চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে সংগঠিত হওয়ার অধিকার রাখেন। সেই বিষয়টিও লিফলেট ও অনলাইন প্রচারণায় উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, যুক্তরাজ্যেও Meta-এর কিছু কর্মী ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। তারা ‘United Tech and Allied Workers’ নামের সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছেন এবং নতুন সদস্য সংগ্রহে আলাদা ওয়েবসাইটও চালু করেছেন।
সংগঠনটির প্রতিনিধি Eleanor Payne বলেন, কর্মীদের একদিকে চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হচ্ছে, অন্যদিকে এমন প্রযুক্তিকে প্রশিক্ষণ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে যা ভবিষ্যতে তাদের জায়গা দখল করতে পারে। তার মতে, AI-driven restructuring এখন প্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে বড় সামাজিক ও পেশাগত চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও workplace surveillance নিয়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ভেতরে আরও বড় বিতর্ক তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কর্মীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মানসিক চাপ এবং automation-এর কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কা আগামী দিনে বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।