সরকারি তথ্যমতে, আসন্ন ঈদুল আজহায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি কোরবানিযোগ্য পশু উদ্বৃত্ত থাকবে; সরকারের এ তথ্য সঠিক হলে স্বাভাবিকভাবেই কোরবানিদাতাদের জন্য স্বস্তির খবর; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। গ্রাম থেকে শহরÑসব জায়গায় খামারিরা বলছেন, সরকারি তথ্য সঠিক নয়। উল্টো এবার কোরবানির পশুর সংকট হতে পারে, বাড়তে পারে দাম।
গত বছরের তুলনায় এবার খামারি পর্যায়ে পশু অনেক কমে গেছে; পশু কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ গবাদিপশুর খাবার সংকট এবং আগের বছর ভালো দাম না পাওয়ায় অনেকে খামার ছেড়ে দিয়েছেন। প্রতিবছর সরকার থেকে এরকম তথ্য দেওয়া হয়; কিন্তু বাস্তবে শেষ মুহূর্তে গরু পাওয়া যায় না। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, তারা মাঠপর্যায়ে খামারিদের কাছ থেকে তথ্য নিয়েই প্রকাশ করেছে। তাদের পরিসংখ্যান শতভাগ সঠিক।
তবে সরকারের একটা সিদ্ধান্তে খামারিরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, শেষ পর্যন্ত যদি ভারতীয় গরু প্রবেশ বন্ধ থাকে, তাহলে খামারিরা এবার ভালো দাম পাবে। আর যদি ভারতের গরু ঢুকে যায়, তাহলে এবারও বড় ধরনের ধস নেমে আসতে পারে। এজন্য তারা চান, এখন থেকেই ভারতীয় সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হোক।
পাশের দেশ থেকে যাতে কোনো গরু আসতে না পারে, সে ব্যাপারে সরকারের সর্বোচ্চ কঠোরতা চান খামারিরা। এটি ঠেকাতে না পারলে, খামারিদের ব্যবসা পথে বসে যাবে। পশু খাদ্যের বাড়তি দাম, খামারিদের উচ্চ হারে বিদ্যুৎ বিলÑ এসব সংকটে অনেকেই খামারের ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ঢাকার পাশে সাভারের আশুলিয়ায় আরমা এগ্রিকালচার লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক আমাদের সময়কে বলেন, কোরবানিযোগ্য পশু উদ্বৃত্ত থাকার যে তথ্য সরকার দিয়েছে, সেটি সঠিক নয়। গত বছরের তুলনায় এবার গরু অনেক কম। আমার খামারে প্রতিদিন গরু বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে যে গরু রয়েছে, আশা রাখি, ঈদুল আজহার দুই সপ্তাহ আগে বিক্রি শেষ হয়ে যাবে। এটি শুধু আমার খামারের চিত্র না।
আশপাশে যত খামার আছে, সবগুলোর একই চিত্র। এবার উদ্বৃত্ত থাকবে না, বরং সংকট হতে পারে। সরকারের এ তথ্যের কারণে বেশি করে কেনার প্রবণতা তৈরি হয়, তাতে একদফা দাম বেড়ে যায় এবং শেষ মুহূর্তে সংকট তৈরি হয়।
অতীতের পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, প্রতিবছর ঈদুল আজহায় যে গরু বাজারে ওঠে, তার সিংহভাগই খামারিদের মাধ্যমে আসে। হাটে ওঠা গরুর মধ্যে কৃষকের ঘরের গরুর কম থাকে। তাছাড়া বর্তমানে অনেক কৃষক ঈদের তিন-চার মাস আগে নিজের বাড়ির গরুগুলো কোরবানিযোগ্য করে বিক্রির জন্য মোটাতাজাকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করে। তাদের মধ্যে অনেকে প্রান্তিক খামারি রয়েছেন।
আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, এ বছর কোরবানির জন্য দেশে পশুর সম্ভাব্য চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। এর বিপরীতে দেশে প্রাপ্যতা রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু। সে হিসাবে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। এবার কোরবানিযোগ্য ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু-মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল-ভেড়া ও ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণীর প্রাপ্যতা রয়েছে।
গত বছর কোরবানির হাটের জন্য গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয় ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি। এর মধ্যে ৫৬ লাখ ২ হাজার ৯০৫টি গরু-মহিষ, ৬৮ লাখ ৩৮ হাজার ৯২০টি ছাগল-ভেড়া এবং ৫ হাজার ৫১২টি অন্য প্রজাতির। গত বছর ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৬০৩টি কোরবানির পশু অবিক্রীত ছিল।
২০২৪ সালে কোরবানির পশু প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৩৬৭টি। ২০২৩ সালে প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৩৩টি। ২০২২ সালে ১ কোটি ২১ লাখ ২৪ হাজার ৩৮৯টি পশু প্রস্তুত করা হয়। ২০২১ সালে করোনাকালে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার ৭৬৫টি।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালের পর থেকে কোরবানিযোগ্য পশু কমতে শুরু করেছে। তাই এবারও পশু সংকট হতে পারে বলে মনে করেন খামারিরা।
এ বিষয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকার আল মদিনা ক্যাটেল ফার্মের স্বত্বাধিকারী মো. রমজান আলী (দানী) আমাদের সময়কে বলেন, সরকার ঘোষণা করল চাহিদার চেয়ে বেশি কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে, এ তথ্য তারা কোথা থেকে, কীভাবে সংগ্রহ করল? এটি ভুল তথ্য। বরং গরু অনেক কম আছে। আমার খামারে ৪২৫টি গরু রাখার সক্ষমতা আছে, এখন গরু আছে মাত্র ১৮০টি; যার ৫০টির সক্ষমতা ছিল, তার আছে মাত্র ১০টি। এভাবে প্রতিটি খামারেই এবার গরু কম।
গরু কম হওয়ার কারণ জানতে চাইলে এ খামারি বলেন, পশু খাবারের দাম অনেক বেশি। তাছাড়া খামারিদের বিদ্যুৎ বিল দিতে হয় বাণিজ্যিক হারে। সব দিক থেকে খামারিরা চরম দুরবস্থার মধ্যে আছে।
তবে খামারিদের এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খামার) মো. শরিফুল হক। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, আমরা যে তথ্য দিয়েছি, সেটা সঠিক। মাঠপর্যায়ে খামারিদের তথ্য নিয়েই জাতীয়ভাবে প্রকাশ করেছি। আমরা প্রতি বছর যে তথ্য দেই, সেটা কোনো বছর মিথ্যা প্রমাণ হয়েছে? আমাদের জেলা, উপজেলা পর্যায়ে খামারিদের তথ্য সংগ্রহ করে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা হয়। এবার যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, তাই হবে।
সিরাজগঞ্জের মাহির অ্যাগ্রো ফার্মের মালিক মো. রাসেল হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, আমার খামারে ৬০টির মতো গরু রয়েছে, আমরা প্রান্তিক খামারি। আমার এলাকার পরিসংখ্যান যদি বলি, তাহলে এবার বাজারের যে চাহিদা এবং খামারে যে গরু, তাতে সংকট পড়বে। এখন থেকেই দাম চড়া। আলহামদুলিল্লাহ এবার অনেক ভালো দাম পাব। এবার ঈদে গরুর সংকট হওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানান এ খামারি।
তিনি বলেন, সরকার ভারতের গরু আমদানি বন্ধে কঠোর থাকলে, খামারিরা ভালো থাকবে। এজন্য এখন থেকে বর্ডারে নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রতি বছর দেখা যায়, ঈদের আগ মুহূর্তে নজরদারি বাড়ায়; এজন্য এখন থেকে টহল বাড়ালে গরু অনুপ্রবেশ রোধ করা সম্ভব। দেশের খামারিদের বাঁচিয়ে রাখতে চাইলে, সরকারকে কঠোর হতে হবে।