জুলাই আন্দোলন চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ৫ মাসে ৪টি রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এসব রায়ে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ১০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি অন্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। এ ছাড়া আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া একজনকে খালাস দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
জুলাই আন্দোলনে অপরাধে ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর প্রথম রায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। সেই সঙ্গে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই মামলায় আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন।
এ রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশের পাশাপাশি শহীদ পরিবার এবং আহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
জুলাই আন্দোলনে চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি দ্বিতীয় রায়ে ৩ পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া আরও পাঁচ পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এ রায়ে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানের পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিরা হলেনÑ সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম।
এ ছাড়া ওই রায়ে পলাতক আসামি সাবেক সহকারী কমিশনার (এসি) মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছরের কারাদণ্ড, শাহবাগ থানার সাবেক ওসি (অপারেশন) মো. আরশেদ হোসেনকে চার বছরের কারাদণ্ড, কনস্টেবল মো. সুজন মিয়া, মো. ইমাজ হোসেন ইমন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
জুলাই আন্দোলন চলাকালে আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ অন্য একজনকে হত্যা মামলায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত তৃতীয় রায়ে স্থানীয় সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। সেই সঙ্গে আরও সাত আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামি হলেনÑ ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল
ইসলাম, আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এএফএম সায়েদ রনি, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা, সাবেক এসআই আবদুল মালেক, সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা রনি ভূঁইয়া।
এই রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামি হলেনÑ ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান রিপন, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম, ঢাকা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেন, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) নির্মল কুমার দাস ও সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান। এ ছাড়া, এই রায়ে সাত বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেনÑ সাবেক এসআই আরাফাত উদ্দীন ও কামরুল হাসান। এই মামলায় রাজসাক্ষী হওয়া শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করে দেন ট্রাইব্যুনাল।
এদিকে, জুলাই আন্দোলনে শুরুতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় গত ৯ এপ্রিল ঘোষিত চতুর্থ রায়ে দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এ ছাড়া বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল আরও ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন।
সর্বসম্মতিক্রমে দেওয়া রায়ে এ রায়ে সাবেক এএসআই (সশস্ত্র) মো. আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল আসামি সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আর সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন, সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ (বেরোবি) এসআই (নিরস্ত্র) বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধবকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
এ ছাড়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশীদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বেরোবির সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ ও বেরোবি ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ। দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদের সেই ভিডিও দেশজুড়ে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে।
একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুবনাল গঠন করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের চালানো দমন-পীড়নকে ‘গণহত্যা’ বিবেচনা করে এ আদালতে বিচারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। হাইকোর্টের বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারকে চেয়ারম্যান করে গঠিত হয় ট্রাইব্যুনাল-১।
এরপর জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের সংখ্যা বাড়ায় এবং দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির প্রয়োজনে গত বছরের ৮ মে হাইকোর্ট বিভাগে সাবেক বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গঠন করা হয়।