1. shahajahanbabu@gmail.com : admin :
রেকর্ড গড়ে পৃথিবীর পথে নভোচারীরা - Pundro TV
বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:২৪ অপরাহ্ন



রেকর্ড গড়ে পৃথিবীর পথে নভোচারীরা

অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬

চাঁদের না দেখা প্রান্ত ছুঁয়ে, মানব অভিযানের ইতিহাসে নতুন উচ্চতা স্পর্শ করে নাসার আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, জেরিমি হ্যানসেন ও ক্রিস্টিনা কোচ এখন পৃথিবীর পথে ফিরছেন। এই অভিযানে তারা এমন এক দূরত্বে পৌঁছেছেন, যেখানে এর আগে কোনো মানুষ কখনও যায়নি। প্রায় ৪ লাখ কিলোমিটার দূরে গিয়ে তারা ভেঙে দিয়েছেন ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো-১৩ মিশনের দীর্ঘদিনের রেকর্ড। মহাকাশযান ওরিয়েন-জিতে চড়ে এই যাত্রা কেবল প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রদর্শন নয়, বরং মানুষের অদম্য কৌতূহল, সাহস এবং অজানাকে জানার চিরন্তন আকাক্সক্ষার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

চাঁদের পেছনের সেই অদৃশ্য অংশ দিয়ে অতিক্রমের মুহূর্তটি ছিল পুরো অভিযানের সবচেয়ে স্নায়ুচাপের সময়। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ৪০ মিনিটের জন্য পৃথিবীর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই সময়টুকু মহাকাশযানটি ছিল সম্পূর্ণ একাÑ চাঁদের বিশাল অন্ধকার প্রাচীরের আড়ালে, যেখানে পৃথিবীর কোনো সংকেত পৌঁছায় না। পৃথিবীতে তখন মিশন কন্ট্রোল, নভোচারীদের পরিবার এবং কোটি কোটি দর্শক উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছেনÑ ঘড়ির কাঁটা যেন থেমে গেছে।

অবশেষে সেই নীরবতা ভেঙে ফিরে আসে সংকেত, আর শোনা যায় নভোচারী ক্রিস্টিনা কোচের স্বস্তির কণ্ঠÑ ‘আবার পৃথিবীর শব্দ শুনতে পেরে দারুণ লাগছে।’ এই সংক্ষিপ্ত বাক্যেই যেন ধরা পড়ে মানবজাতির সঙ্গে তার নিজ গ্রহের গভীর বন্ধন।

এই নাটকীয় মুহূর্তের ঠিক আগে পাইলট ভিক্টর প্লোভার পৃথিবীর উদ্দেশে যে বার্তা পাঠান, তা যেন এক আবেগঘন বিদায়Ñ ‘আমরা যখন যোগাযোগের বাইরে চলে যাব, তবুও আপনাদের ভালোবাসা অনুভব করব। পৃথিবীর সবাইকে আমরা চাঁদ থেকে ভালোবাসা পাঠাচ্ছি। আবার দেখা হবে।’ চাঁদের নীরবতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগে এই কথাগুলো শুধু প্রযুক্তির সীমা নয়, মানুষের অনুভূতির বিস্তারও স্পষ্ট করে দেয়।

চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে জানালার বাইরে দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে। দূরের উজ্জ্বল গোলকটি ধীরে ধীরে রূপ নেয় খাঁজকাটা, গহ্বরভরা এক বৈচিত্র্যময় জগতে। চাঁদের সেই না দেখা অংশ, যা পৃথিবী থেকে কখনও দেখা যায় নাÑ প্রথমবারের মতো মানুষের চোখে ধরা দেয়। বিশাল গর্ত, লাভার সমতল আর রুক্ষ পাহাড়ি গঠন যেন এক প্রাচীন, নিঃশব্দ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।

যদিও আগে স্যাটেলাইট এই অংশের ছবি তুলেছে, তবুও সরাসরি মানুষের চোখে এই দৃশ্য দেখা এক সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা। নভোচারীরা শুধু ক্যামেরায় ছবি তোলেননি; তারা স্কেচ করেছেন, শব্দে বর্ণনা দিয়েছেন, নিজেদের অনুভূতিও ধারণ করেছেন। কারণ নাসার বিজ্ঞানীদের মতে, প্রশিক্ষিত মানবচোখ অনেক সময় এমন সূক্ষ্ম রঙ, টেক্সচার ও গঠনের পার্থক্য ধরতে পারে, যা যন্ত্রে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে না।

মিশনটির লক্ষ্য চাঁদে অবতরণ করা নয়; বরং চাঁদের সেই অদৃশ্য পেছন দিক ঘুরে আসাÑ যে অংশটি পৃথিবী থেকে কখনই দেখা যায় না।

এই ঐতিহাসিক ফ্লাই-বাই শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওরিয়ন দলের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, আজ তোমরা ইতিহাস গড়েছ, আর পুরো আমেরিকাকে সত্যিই গর্বিত করেছÑ অসাধারণভাবে গর্বিত। এরপর তিনি চার নভোচারীর কাছে জানতে চান, তাদের দিনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত কোনটি ছিল।

কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান উত্তরে বলেন, আমরা এমন কিছু দৃশ্য দেখেছি, যা কোনো মানুষ কখনও দেখেনি। অ্যাপোলো মিশনেও না। আমাদের জন্য এটি ছিল অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা।

এই অভিজ্ঞতার মধ্যেই ঘটে আরেকটি বিরল ঘটনাÑ পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। চাঁদ যখন সূর্যের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন চারপাশে তৈরি হয় এক অপার্থিব আলোছায়া। সূর্যের উজ্জ্বল ডিস্কটি অদৃশ্য হয়ে যায়, কেবল তার কিনারা থেকে ঝলমলে অবস্থা দৃশ্যমা

ন হয়, যা সাধারণত সূর্যের তীব্র আলোয় ঢাকা পড়ে থাকে। সেই মুহূর্তে মহাকাশযানের ভেতরের আলোও কমিয়ে দেওয়া হয়, যেন জানালার বাইরে দৃশ্য আরও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ভিক্টর গ্লোভার সেই দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে বলেন, ‘অবিশ্বাস্য সূর্যাস্তের মতো উজ্জ্বলতা এখনও আছে, আর পৃথিবীর প্রতিফলিত আলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।’ অন্ধকার মহাশূন্যে এই আলো-ছায়ার খেলা যেন এক অলৌকিক দৃশ্যপট সৃষ্টি করে।

চাঁদের এই যাত্রা কেবল বৈজ্ঞানিক নয়, গভীর মানবিক আবেগেও ভরা। নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন চাঁদের দুটি গহ্বরের নামকরণের প্রস্তাব দেন। একটির নাম দেওয়া হয় ‘ইন্টিগ্রিটি’; তাদের মহাকাশযানের নাম অনুসারে। অন্যটি উৎসর্গ করা হয় কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যানের প্রয়াত স্ত্রী ক্যারলকে, যিনি ২০২০ সালে ক্যানসারে মারা যান। আবেগাপ্লুুত কণ্ঠে তিনি স্মরণ করেন, এই দীর্ঘ যাত্রার শুরুতেই তারা এক প্রিয় মানুষকে হারিয়েছিলেন, আর চাঁদের সেই নিঃশব্দ ভূখণ্ডে তার স্মৃতিকে স্থায়ী করে রাখতে চান। লাইভ সম্প্রচারে তখন দেখা যায়, চার নভোচারী পরস্পরকে আলিঙ্গন করছেন; মহাকাশের নির্জনতায়ও মানবিক সম্পর্কের উষ্ণতা যেন অটুট।

এই অভিযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মহাকাশযান ওরিয়নের সক্ষমতা পরীক্ষা করা। চাঁদের ছায়ায় প্রবেশের সময় প্রায় এক ঘণ্টা সরাসরি সূর্যালোক ছাড়া থাকতে হয়েছে, একই সঙ্গে তাপমাত্রার দ্রুত পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এই সময়ে মহাকাশযানের শক্তি ও তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কেমন কাজ করে, তা সূক্ষ্মভাবে রেকর্ড করেছে বিভিন্ন সেন্সর। নাসার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভবিষ্যতে আরও জটিল মিশন; বিশেষ করে চাঁদে মানুষ নামানো এবং দীর্ঘমেয়াদে মঙ্গল গ্রহে

যাত্রা; এসবের ভিত্তি তৈরি হচ্ছে এই তথ্যের ওপর।

চঁাঁদের মাধ্যাকর্ষণ ব্যবহার করে এখন ওরিয়ন ধীরে ধীরে পৃথিবীর দিকে ফিরে আসছে। সামনে অপেক্ষা করছে কয়েকদিনের তুলনামূলক শান্ত সময়, যেখানে নভোচারীরা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাবেন। তবে যাত্রার শেষ ধাপটি হবে সবচেয়ে কঠিনÑ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২৫ হাজার মাইল বেগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ, যেখানে তীব্র তাপ ও ঘর্ষণের মুখে পড়বে মহাকাশযানটি। এরপর প্যারাশুটের সাহায্যে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে ওরিয়ন, যা পরীক্ষা করবে এর হিটশিল্ড এবং উদ্ধার ব্যবস্থার কার্যকারিতা।

এই পুরো অভিযানের মধ্য দিয়ে আবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছেÑ মানুষের অনুসন্ধিৎসা থেমে নেই। চাঁদের না দেখা প্রান্ত ছুঁয়ে তারা ফিরছে ঠিকই, কিন্তু এই যাত্রা কোনো সমাপ্তি নয়; বরং এটি আরও বড় অভিযানের সূচনা। নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৯৭২ সালের পর প্রথমবার মানুষের চাঁদে অবতরণ এবং একদিন মঙ্গল গ্রহে মানবযাত্রার স্বপ্নÑ সবকিছুরই ভিত্তি তৈরি করছে এই আর্টেমিস-২ মিশন। মহাশূন্যের অসীম নীরবতার মধ্যেও তাই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এক অদম্য আহ্বানÑ মানুষ আবার যাবে, আরও দূরে যাবে, আর সেই যাত্রায় বারবার ফিরে তাকাবে তার নিজ গ্রহ, পৃথিবীর দিকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২
Developed By ATOZ IT HOST