1. shahajahanbabu@gmail.com : admin :
অর্থনীতি যখন জড়িয়ে যাচ্ছে জ্বালানি সংকটে - Pundro TV
বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:২৪ অপরাহ্ন



অর্থনীতি যখন জড়িয়ে যাচ্ছে জ্বালানি সংকটে

অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬

হাসান মামুন

 প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৭ | আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৮

ইরান যুদ্ধে অনেক দেশের মতো আমরাও বড় জ্বালানি সংকটে পড়েছি। কোনো কোনো জ্বালানি পণ্য আনতে হচ্ছে এমনকি দ্বিগুণ দামে। আর সমস্যার দিক হলো, প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানিই করতে হচ্ছে আমদানি। এপ্রিলের জন্য অবশ্য জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি সরকার। এ অবস্থায় আরও ভর্তুকি জোগাতে হবে। সরকারের হয়তো প্রত্যাশা রয়েছে– যুদ্ধ বন্ধ হবে অচিরেই। সেটি ঘটলেও জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার শান্ত হতে সময় লাগবে। ইরান যুদ্ধের আগ পর্যন্ত এটা কিন্তু সহনীয় পর্যায়েই ছিল।

এতটা খারাপ পরিস্থিতি আসলে কেউই অনুমান করতে পারেনি। যারা ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, তারাও ভেবেছিলে– এটা দ্রুত শেষ হবে। তারা কার্যত ভুল হিসাব-নিকাশের চক্করে পড়েছে। আক্রমণকারী জোটও জ্বালানি সংকটে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানেও বাড়ছে জ্বালানির দাম; কমছে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানির সুযোগ আবার কমছে আমাদের মতো দেশগুলোর। তার চেয়ে বড় কথা, জ্বালানি সংকটে আমাদের সব ধরনের শিল্পে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। লোডশেডিং বাড়ছে এপ্রিলের শুরু থেকে। গরম বাড়বে মে পর্যন্ত। বাসাবাড়িতেও বাড়বে বিদ্যুতের চাহিদা। সঙ্গে লোডশেডিং। এর চাপ গিয়ে পড়বে শিল্পের ওপর। এতে দেশেও শিল্পজাত পণ্যের জোগান কমে যেতে পারে।

চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে অর্জিত প্রবৃদ্ধি হ্রাসের খবর রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, শিল্পের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে কম। আশা ছিল, নির্বাচিত সরকার এলে এ খাতে উৎসাহ বাড়বে। এখন বিদ্যুৎ সংকটে উদ্যোক্তাদের বেশি করে গ্যাস কিংবা ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করতে হলে তো মুশকিল। আর গ্যাস ও ডিজেল উভয় খাতই আছে কমবেশি সরবরাহ সংকটে। গ্যাসের ঘাটতি তো ছিলই; এখন যুদ্ধের প্রভাবে এটা তীব্র হতে পারে।

অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এর সরবরাহ ক্রমেই কমছে। বাড়ছে এলএনজির ওপর নির্ভরতা। সরকারকে এখন যে দামেই হোক আর যেখান থেকে সম্ভব, এটা এনে পরিস্থিতি সামলাতে হচ্ছে। গ্যাসের অভাবে সার কারখানা চালু রাখা যাচ্ছে না– এটা পুরোনো খবর। নতুন খবর, চাহিদামতো সার আমদানিতে একই অনিশ্চয়তা। চলমান বোরো মৌসুমে সার সংকটের কথা অবশ্য শোনা যাচ্ছে না। তবে অনেক কৃষকেরই ডিজেল সংগ্রহে হিমশিম খাওয়ার খবর রয়েছে। এ অবস্থায় সময়মতো সেচ দেওয়া না গেলে বিপদ।

সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। উদ্দেশ্য সরকারি ব্যয়ের চাপ কমানো এবং অগ্রাধিকার অনুযায়ী জ্বালানি সররবরাহ নিশ্চিত করা। বেসরকারি খাতে থাকা এলপিজির দাম অবশ্য বাড়াতে হয়েছে। গ্রাম পর্যন্ত এর চাহিদা বেড়েছে রান্নাঘরে। কিন্তু প্রশ্ন– নির্ধারিত দামেও এলপিজি মিলবে কিনা। এ ক্ষেত্রেও আমরা কিন্তু আমদানিনির্ভর। আমদানির ওপর নির্ভরতা কোনো জ্বালানি পণ্যেই ঝুঁকিমুক্ত থাকতে দিচ্ছে না।

ইরান যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি যে আমাদের কতটা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, সেটাও দেখা হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা যে নেই, তা নয়। জ্বালানির ‘আপৎকালীন মজুত’ও আমাদের নেই যে, আমদানিতে সংকট দেখা দিলে কিছুদিন সামাল দিয়ে চলতে পারব। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় কোনো কোনো দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে সাফল্য পেয়েছে। আমরা থেকে গেছি একই মাত্রায় আমদানিনির্ভর।

যুদ্ধ দ্রুত না থামলে এটা আমাদের অসহনীয় ভোগান্তির কারণ হতে পারে।জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ালেও ভোক্তা পর্যন্ত এর বিতরণ নিয়ে যে সংকট চলছে, সেটা অস্বীকারের সুযোগ নেই। তেল সংগ্রহে দীর্ঘ সময় লাগায় এর চাপ গিয়ে পড়ছে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে। বাস ভাড়া বৃদ্ধির খবর এখনও না থাকলেও পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এরই মধ্যে। এর প্রভাব পড়ছে বাজারে। মার্চে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসার খবর ছিল। এপ্রিলে এটা বাড়বে বলেই ধরে নেওয়া যায়।

স্থল ও নৌবন্দর থেকে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়লে এর প্রভাব শুধু বাজারে নয়; রপ্তানিমুখী শিল্পেও পড়বে। এমনিতেই বেশ কয়েক মাস আমাদের রপ্তানি আয় নিম্নমুখী। প্রবাসী আয়ের ধারা কেবল বেগবান। মার্চে ইতিহাসের সর্বোচ্চ আয় এসেছে। এটা উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত বাংলাদেশিদের ওপর যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবের ফলও হতে পারে। বিপদ অনুমান করেই অনেকে হয়তো সঞ্চিত অর্থ পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এতে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হলেও শঙ্কা জাগছে জনশক্তি রপ্তানি খাত নিয়ে। কী হবে ওখান থেকে বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী ফিরে এলে? দেশে তো এমনিতেই কর্মসংস্থানের সংকট তীব্র। বিনিয়োগ বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামলানোর সুযোগও আপাতত সীমিত।

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ভর্তুকির চাপ সামলাতে সামনে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে হতে পারে। রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি ক্রমে খারাপ বলে সরকারের হাতে অর্থকড়ি কম, এটা ঠিক। সরকার চেষ্টা করছে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাড়তি সহায়তা পেতে। নতুন একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারের এ ক্ষেত্রে তাদের বর্ধিত মনোযোগ পাওয়ার কথা। তাতে জনগণও স্বস্তি পাবে।

অপ্রত্যাশিত এ সংকটকালে সরকারকে অগত্যা উন্নয়ন ব্যয় আরও কমিয়ে পরিস্থিতি সামলাতে হতে পারে। তাতে আবার সংশ্লিষ্ট খাতগুলোয় কমে যাবে ব্যবসা ও কর্মসংস্থান। এ অবস্থায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার রাখতে হবে। শহরাঞ্চল ও মহাসড়কের ধারে সরকারি সংস্থাগুলোকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান চালাতে দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি সংকটে মানুষের খাবি খাওয়ার সময়ে এটা সংগত হচ্ছে কিনা– ভেবে দেখা প্রয়োজন। সব রকম সংস্কারেরই সময়-অসময় রয়েছে।

ট্রাম্প আর নেতানিয়াহু আসলে গোটা বিশ্বের ওপরেই দুর্যোগ চাপিয়ে দিয়েছেন। এর চাপ বেশি অনুভব করছে বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো। আমাদের অর্থনীতিও দ্রুত জ্বালানিনির্ভর হয়েছে। জ্বালানি সংকটে এক পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণেই অর্থনীতির প্রায় সব খাত পড়ে যায় সংকটে। এ অবস্থায় সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিতে হবে খাদ্যশস্য উৎপাদনে।

উৎপাদন ভালো বলেই বাজারে এখন পর্যন্ত আলু, পেঁয়াজ ও ডিমের দাম কম। চাহিদামতো ডিজেল ও বিদ্যুৎ জুগিয়ে চালসহ খাদ্য উৎপাদন এবং এর পরিবহন স্বাভাবিক রাখতে হবে। আমরা তো চাইলেও আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্যের দাম সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। এগুলোর সরবরাহও দেখা যাচ্ছে জ্বালানির মতো কমবেশি অনিশ্চিত। এরই মধ্যে খাতুনগঞ্জ থেকে ভোজ্যতেলের দামে অস্থিরতা সৃষ্টির খবর মিলছে। যুদ্ধের প্রভাবে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির বাস্তবতাও তো অনস্বীকার্য। এতে জ্বালানি তেলের মতো ভোজ্যতেলের দামও বেড়ে যেতে পারে।

দুর্ভাগ্যবশত ভোজ্যতেলেও আমরা বিপুলভাবে আমদানিনির্ভর।

এ সংকটকালে সরকারকে সুচিন্তিত নীতি-কৌশল নিতে হবে এবং এর বাস্তবায়নে হতে হবে দৃঢ়চেতা। প্রশাসনকে জনকল্যাণে নিয়োজিত করতে তাকে হতে হবে যথেষ্ট উদ্যোগী। সরকারের অপচয়মূলক ব্যয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তবেই অন্যান্য খাতকে বলতে হবে কৃচ্ছ্র সাধন করতে। জ্বালানি তেলের সংকট সামলানোর প্রক্রিয়াতেই বিদ্যুৎ সংকট এসে হাজির। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ আমদানিও যেন বিঘ্নিত না হয়। ভারত থেকে বাড়তি ডিজেল আনছি আমরা। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরেও যেন জ্বালানি সহায়তা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। সংকটকালে সামান্য সাশ্রয় আর সহায়তাও কিন্তু বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২
Developed By ATOZ IT HOST