1. shahajahanbabu@gmail.com : admin :
দানবীয় সময়ে নতুন এশীয় বিশ্বব্যবস্থার হাতছানি - Pundro TV
বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:২৫ অপরাহ্ন



দানবীয় সময়ে নতুন এশীয় বিশ্বব্যবস্থার হাতছানি

অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬

প্রথম মহাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শত শত বছরের পুরনো বিশ্বব্যবস্থার অবসান এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থায় উত্তরণের সন্ধিক্ষণ ছিল বিংশ শতকের ত্রিশের দশক। একদিকে মহাযুদ্ধের তাণ্ডব, অন্যদিকে রুশ বলশেভিক বিপ্লবের নতুন সম্ভাবনাকে মনে রেখে ইতালীয় মার্ক্সবাদী বিপ্লবী দার্শনিক এন্তোনিও গ্রামসি মুসোলিনীর কারাগারে বসে লেখা প্রিজন নোটবুকে নতুন এক রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো তুলে ধরেছিলেন।

প্রিজন নোটবুকের বিখ্যাত উক্তি ‘দ্য ওল্ড ওয়ার্ল্ড ইজ ডায়িং, অ্যান্ড দি নিউ ওয়ার্ল্ড ইজ স্ট্রাগলিং টু বি বর্ন; নাউ ইজ দ্য টাইম অব মনস্টার’। প্রায় একশ’ বছর আগে লেখা গ্রামসির হেজিমনি তত্ত্ব যেন এখনকার বিশ্ব পরিস্থিতির সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে। গ্রামসির সময় সদ্য সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের যে আকাক্সক্ষা জেগে উঠেছিল তা শত বছরেও একটি নতুন বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জামার্নীর উপর চাপিয়ে দেয়া ভার্সাই চুক্তির দাসখত এবং অটোমান সা¤্রাজ্য ভেঙ্গে ভাগণ্ডবাটোয়ারা করে নেয়ার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলা হয়েছিল। যুদ্ধের অনুকুল ফলাফলকে কাজে লাগিয়ে নতুন বিশ্ববাস্তবতায় জায়নিস্ট ব্যাংকার ও পুঁজিতান্ত্রিক কর্পোরেট বিশ্বব্যবস্থার একচ্ছত্র আধিপত্য মাত্র সাত দশকের মধ্যেই সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের যবনিকাপাত ঘটিয়েছে। বিগত শতকের নব্বই দশক শুরুর আগেই বার্লিন প্রাচীরের ভাঙ্গনের মধ্য দিয়ে একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার সূচনা হয়।

কিন্তু প্রায় পৌনে এক শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা যুদ্ধবাদী শিল্পায়ন বা মিলিটারি ইন্ডাসট্রিয়াল কমপ্লেক্সের বিশাল বিনিয়োগ ও অস্ত্র বাণিজ্যের মুনাফাবাজরা কখনো শান্তিবাদী বিশ্বের প্রত্যাশা করেনা। তারা নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে সর্বদা বিশ্বকে একটা অস্থিরতা, নিরাপত্তাহীনতা, সামরিক প্রতিযোগিতা ও যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মাতিয়ে রাখতে চায়।

এ ধরণের খেলায় যে করেই হোক একটা বাস্তব কিংবা কল্পিত বা চাপিয়ে দেয়া শত্রুর প্রয়োজন হয়। অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ইসরাইলের গ্রেটার ইজরাইল প্রজেক্ট কাজে লাগিয়ে জায়নিষ্ট থিঙ্কট্যাঙ্ক ও ইম্পেরিয়াল ডিপস্টেট পুরনো ইতিহাস ও ক্রুসেডের ধারণাকে পুঁজি করে সভ্যতার সংঘাত বা ক্লাশ অব সিভিলাইজেশনের ধারণা নতুনভাবে হাজির করেছে।

নব্বই দশকের শুরুতে স্যামুয়েল হান্টিংটনের সিরিজ বক্তৃতা এবং ‘ক্লাশ অব সিভিলাইজেশন’র ধারণায় ইসলাম ও মুসলমানদেরকে পশ্চিমা সভ্যতার সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হিসেবে হাজির করার মধ্যে সেই অভিসন্ধিই কাজ করেছে বলে ধরে নেয়া যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে কোরিয়া এবং ভিয়েতনামে হোঁচট খাওয়ার পর মার্কিনীরা আর কোনো যুদ্ধে না জড়ালেও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে নব্বই দশক থেকে এখন পর্যন্ত একপাক্ষিক যুদ্ধের দামামা ক্রমেই গগন বিদারি হয়ে উঠেছে।

প্রথম গাল্ফ ওয়ার, ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন থেকে চলমান ইরানে রিজিম চেঞ্জের যুদ্ধ পর্যন্ত সেই থিওরি ও ধারাবাহিকতার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।সত্যিই সময় এখন দানবীয় হয়ে উঠেছে। নিরপরাধ মানুষের রক্ত ও বোমারু বিমান ও মিসাইলের আগুনের লেলিহান শিখায় নতুন বিশ্বব্যবস্থা যেন জন্মবেদনায় কাতরাচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের কোথাও পুঁজিবাদী বিশ্বের বিকল্প রাজনৈতিক প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা ছিলনা। পশ্চিমা বিশ্বের ইসলাম বিদ্বেষ ও পরিকল্পিত ইসলামোফোবিক এজেন্ডায় মুসলমানরা ভিকটিমাইজ্ড হলেও পশ্চিমা বশংবদ আরবদের মধ্যে কোনো প্রতিবাদ-প্রতিরোধ বা সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রভাব দেখা যায়নি। শুধুমাত্র পারস্য বা ইরানের বিরুদ্ধে সংঘটিত ষড়যন্ত্র ও সম্পদ লুন্ঠনের বিরুদ্ধে সেখানকার মানুষ অনিবার্যভাবেই বিকল্প সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। এটি ছিল ইঙ্গ-মার্কিন ষড়যন্ত্রমূলক ছকে ইরানে পশ্চিমা গণতন্ত্রের ব্যর্থতার ফল।

মুসলিম বিশ্বের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে শাহ পন্থীদের রাজপথে আন্দোলন এবং সামরিক বাহিনীর ক্যু’এর মধ্য দিয়ে মোসাদ্দেককে সরিয়ে আবারো রেজা শাহ পাহলবিকে ক্ষমতার সর্বেসর্বা বানিয়ে মূলত পশ্চিমারাই ইরানে ইসলামি বিপ্লবকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য ও অনিবার্য বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। মোসাদ্দেকের পতনের ২৫ বছরের মাথায় ১৯৭৯ সালে ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি বশংবদ শাহের পতন ঘটিয়ে ইরানের জনগনের ইসলামি বিপ্লব যেন সেই সম্ভাব্য নতুন বিশ্বব্যবস্থার বীজ বপন করেছিল।

সেই প্রথম মহাযুদ্ধের অটোমানদের বিরুদ্ধে সংঘটিত কৃত্রিম আরব জাতীয়তাবাদী আরব রিভোল্ট ইসলামি দুনিয়ায় ইঙ্গ-মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রথম সুযোগ এনে দিয়েছিল। যুদ্ধে বিতাড়িত ইহুদিদের পুনর্বাসিত করার অজুহাত কাজে লাগিয়ে ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে তা একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বি আঞ্চলিক পরাশক্তিতে পরিনত করার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি ও বিরল খনিজ সম্পদের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করাই ছিল পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদের মূল লক্ষ্য। ইসলামি বিপ্লবের ইরানকে সে ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখেছে পশ্চিমারা।

কোটি জনতার আন্দোলন দমাতে সরকারি বাহিনীর নৃশংস নিপীড়ন এবং উন্মাতাল জনরোষের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া নতুন ইরানের সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই শেষ করে দিতে আঞ্চলিক সব পক্ষের যোগসাজশে ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইল সমর্থনপুষ্ট আট বছরের ইরান-ইরাক যুদ্ধে নতুন ইরানের শক্তিমত্তা ও সম্ভাবনা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। সাদ্দাম হোসেনের পেছনে সম্মিলিত আরব ও পশ্চিমা শক্তির আঞ্জাম দিয়ে আট বছরেও ইরানের প্রতিরোধকে ধসিয়ে দেয়া যায়নি।

তবে সাদ্দাম হোসেনের পেছনে খরচ করা সামরিক বাজেটকে বৈদেশিক ঋণের চাপে পরিনত করে সাদ্দাম হোসেনকে কুয়েত দখলের গ্রীন সিগনাল দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সাদ্দাম হোসেন যখন কুয়েত সীমান্তে সেনা সমাবেশ ও সমরসজ্জা করছিলেন, বাগদাদের তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত এপরিল গিলেস্পি সাদ্দাম হোসেনের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি বলেছিলেন, এটা আপনাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার, এ ব্যাপারে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। সাদ্দামের কুয়েত দখলের পর কোনো রকম কুটনৈতিক চাপ, মধ্যস্থতার

সুযোগ না দিয়েই চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে বিমান হামলা শুরু করে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী। এরপর দেয়া হয় কঠোর থেকে কঠোরতর বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। এর ফলে ইরাকের লাখ লাখ শিশু অপুষ্টির শিকার হয়ে মৃত্যু বরণ করতে বাধ্য হয়। এ প্রসঙ্গে সাবেক মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট মেডেলিন অলব্রাইটকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘দে ওর্থ দ্য প্রাইস’। অর্থাৎ এটা নাকি তাদের কর্মের ফল। সাদ্দাম হোসেনকে কুয়েত দখল করতে উসকে দিয়ে ইরাকের উপর স্যাংশান দিয়ে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি ও লাখ লাখ শিশু হত্যা নাকি তার প্রায়াশ্চিত্ত।

ইরানের সাথে যুদ্ধের প্ররোচনা ও আগ্রাসনের বিপরীত ফল দেয়ার পর কুয়েত দখলের ফাঁদ কাজে লাগিয়ে সাদ্দাম ও ইরাককে দুর্বল করে দেয়ার ঘটনা ছিল জায়নিষ্টদের আঞ্চলিক এজেন্ডার অংশ। এর জন্য নাইন-ইলেভেন বা আমেরিকায় সন্ত্রাসি বিমান হামলার মত ফল্স ফ্লাগ অপারেশনের নাটক সাজিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে অন্তহীন যুদ্ধ চালানো হয়েছে দুই দশক ধরে।

তেলসম্পদের উপর ভর করে ইরাক যখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই ওয়েপন্স অব মাস ডেস্ট্রাকশন বা গণবিদ্ধংসী অস্ত্রের স্টকপাইল গড়ে তোলার মিথ্যা তথ্য প্রচার করে ইরাক দখল, আফগানিস্তান দখল, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেনে রিজিম চেঞ্জ করে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি ও তেলসম্পদ লুন্ঠন এবং নিরাপত্তা চুক্তির নামে সঞ্চিত হাজার হাজার কোটি ডলার লুটে নেয়াই ছিল এসব প্রক্সি যুদ্ধের মূল লক্ষ্য। আল কায়েদা এবং আইএস’ ও কুর্দি সশস্ত্র প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলো যে সিআইএ-মোসাদের সৃষ্টি তা এখন দিবালোকের মত পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।

আরব শাসকদের জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাদের বিরুদ্ধে জনগণের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে এবং ইরানের রাজনৈতিক উত্থানের জুজু দেখিয়ে নিরাপত্তার নামে জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাটি প্রতিষ্ঠা এবং হাজার হাজার কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তির লক্ষ্য মূলত ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ইরান যুদ্ধে আরব দেশ থেকে থাডসহ মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইসরাইলে সরিয়ে নেয়ার বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করার পর কিছু আরব দেশের শাসকের ভীমরতি কাটতে শুরু করেছে।

ইরানের মিসাইল হামলার ভয়ে নিজেদের আকাশ ব্যবহারে আপত্তি জানালেও মার্কিন আগ্রাসন ও আধিপত্য বিরোধী ঐক্যের পক্ষে তাদের তেমন গরজ দেখা যাচ্ছে না। আরবদের বিভক্তি, পশ্চিমা নির্ভরশীলতা ও বশংবদ লেজুড়বৃত্তির কারণে ১৯৪৮, ১৯৬৭ এবং ১৯৭৩ সালের আরব ইসরাইল যুদ্ধে ইসরাইলের কাছে সম্মিলিত আরব বাহিনীর পরাজয় ঘটেছে এবং আল কুদস বা জেরুজালেমের উপর ইসরাইলী দখলদারিত্ব কায়েম হয়েছে। ইরানে ইসলামি বিপ্লবের আগে মুসলমানদের জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের কোনো দৃশ্যমান পরিকল্পনা বা সংকল্প ছিল না।

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর ইমাম আয়াতুল্লাহ খোমেইনি প্রথম আল কুদস মুক্তির ডাক দেন। আইএরজিসির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী সেনা ইউনিটের নাম আল-কুদস ব্রিগেড। মূলত আল কুদস ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল কাসেম সুলাইমানিকে হত্যার মধ্য দিয়েই ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন ও ডিক্যাপিচুলেশন ও রিজিম চেঞ্জ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছিল ইসরাইল-আমেরিকা।

২০২৫ সালের জুনমাসে ১২দিনের যুদ্ধে ইসরাইল-আমেরিকান বাহিনী পরাস্ত হওয়ার পর ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি খামেনিকে হত্যাসহ চুড়ান্ত আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে ইরানের রিজিম বদল, ইরানে বশংবদ শাসক বসিয়ে এখানকার তেলসম্পদ লুটে নেয়া এবং গাজাকে প্রমোদ নগরীতে পরিনত করে তা একটি আমেরিকান মালিকানাধীন সেটেলাইট সিটি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সাথে সাথে লেবানের প্রায় অর্ধেকটা দখল করে নিয়ে গ্রেটার ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করাই ছিল এবারের ইরান যুদ্ধের বহুমুখী লক্ষ্য।

নেতানিয়াহু-ট্রাম্প-জায়নিস্ট ন্যারেটিভ পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন বাগিয়ে নিতে এই যুদ্ধকে একটি ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করতে চেয়েছে

। মার্কিন-ইসরাইলী সম্ভাব্য চুড়ান্ত সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে ইরানের ধারণা ও হিসাব-নিকাশে কোনো ঘাটতি ছিলনা। সাড়ে চার দশকের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আকাশ প্রতিরক্ষায় ইসরাইল-আমেরিকার সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টা বাদ দিয়ে ভিন্ন কৌশলে একটি এসিমেট্টিক বা অসম যুদ্ধ কৌশলের মূল কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছিল ক্ষেপনাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবস্থাকে। কয়েক হাজার ডলারের ড্রোন এবং কয়েক দশক পুরনো মিসাইল ইন্টারসেপ্ট করতে চার স্তরে মিলিয়ন ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা ইনসেপ্টরের স্টকপাইল প্রায় নি:শেষিত হওয়ার পর ইরান শাহাব, ইমাদ, গাদর, ফাত্তাহ ও সেজ্জিলের মত বিভিন্ন ভার্সনের হাইপারসনিক মিসাইল ব্যবহার করে ইসরাইল-আমেরিকার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিলিয়ন ডলারের রাডার সিস্টেম, আব্রাহাম লিঙ্কন ও জেরাল্ড ফোর্ডের মতো দানবীয় রণতরীগুলোকে অকেজো করে দিয়ে মার্কিনীদের সামরিক আধিপত্যের কালোহাত অনেকটাই গুড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।

২৮ ফেব্রুয়ারির পর প্রথম চারসপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধের সব সমীকরণ ও হিসেব-নিকেশ ইরানের অনুকুলে চলে যাওয়ার এক বিস্ময়কর বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করছে বিশ্ব। সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ইরানের কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন ধরাশায়ী অবস্থা কিছুদিন আগ পর্যন্ত কারো ধারণার বাইরে ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ নাগরিকের কাছেই শুধু নয়, তিনশতাধিক মার্কিন সেনা কর্মকর্তার কাছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন মানসিক রোগী, পেডোফাইল এবং দেশের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে একদিনে ৮০ লাখের বেশি মার্কিনী ট্রাম্পের অপসারণ চেয়ে ‘নো কিং’ বিক্ষোভ মিছিল করেছে।

অন্যদিকে যুদ্ধের আগে সিআইএ-মোসাদের এজেন্টদের উস্কানি ও ফল্স ফ্ল্যাগ অপারেশনে সরকারি বিরোধী বিক্ষোভে রাস্তায় নেমে আসা ইরানিরাও এখন সরকারের আহ্বানে ঐক্যবদ্ধ এবং দেশের জন্য জীবন দিতেও কুণ্ঠিত নয়। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হত্যার হুমকি দেয়ার পর তিনি বলেছেন, তোমাদের এসব হুমকি আমাদের পায়ের তলায় থাকে। আমরা দেশের জন্য মৃত্যুকে গৌরবের মৃত্যু মনে করি এবং সদা প্রস্তুত থাকি। যুদ্ধের প্রথম দিনের বিমান হামলায় স্কুলের দুইশতাধিক শিশু, সর্বোচ্চ নেতা ইমাম খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার মৃত্যু ইরানের রণকৌশলে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।

বরং আলোচনা চলাকালে ইরানে প্রথম হামলা চালানো, বেসামরিক স্থাপনায় হামলার মত ঘটনার প্রত্যাঘাতে ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবগুলো বিমানঘাটি ধ্বংস করে দেয়ার পর কোনো ন্যারেটিভ বা লেবেলিং প্রতিষ্ঠার কোনো চেষ্টাই সফল হয়নি। হরমুজ প্রনালি বন্ধের পর মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় মিত্ররা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘদিনের মৈত্রি বা গাঁটছড়া ভেঙ্গে সত্তুর বছরের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বন্ধুহীন একাকীত্বে ঠেলে দেয়ার বাস্তবতা বড়ই বিষ্ময়কর।

দুই দশক ধরে অবরুদ্ধ গাজার উপর দুই বছর ধরে অনবরত বিমান হামলা করে পুরো গাজাকে ধ্বংসস্তুপে পরিনত করা, শিশু-নারীসহ লক্ষাধিক বেসামরিক ফিলিস্তিনিকে হত্যা এবং ২৫ লক্ষাধিক ফিলিস্তিনিকে বাস্তুচ্যুত করে খাদ্য, পানীয়, বিদ্যুত, চিকিৎসা ও আশ্রয়হীন মানবিক বিপর্যয়ের মাধ্যমে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার কুশীলব নেতানিয়াহু-ট্রাম্প বা ইসরাইলীদের প্রতি বিশ্বের কোনো অনুকম্পা নেই।

তেল আবিব, জেরুজালেম, হাইফা, বিরশেবা, আশদদ, এশকেলনের আকাশচুম্বি ভবনগুলো ধ্বংসস্তুপে পরিনত হতে দেখে পুরো বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের মনে স্বস্তির বাতাবরণ হয়ে দেখা দিয়েছে। ইরানের পাশে চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া দৃঢ়ভাবে দাঁড়ালে এবার মনস্টারের সময় পেরিয়ে এশীয় পরাশক্তিগুলোর নেতৃত্বে নতুন বহুমাত্রিক বিশ্বব্যবস্থার জন্ম হবেই।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২
Developed By ATOZ IT HOST