যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকধারীদের গুলিতে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা, বিশেষ করে কিশোরদের আক্রমণে স্কুলে বহু শিশু হতাহতের দুটি ঘটনার পর অবশেষে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে সম্ভাব্য একটি আইন প্রণয়নে একমত হয়েছে সেনেটে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের নিয়ে গঠিত একটি আন্তদলীয় গ্রুপ।
এতে ২১ বছর বয়সের নিচে কেউ আগ্নেয়াস্ত্র ক্রয় করতে গেলে তার অতীত জীবন খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা চালু করা এবং অবৈধভাবে আগ্নেয়াস্ত্র বেচাকেনার ব্যাপারে কঠোর হওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
আন্তদলীয় গ্রুপটি ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের কথা বলে এলেও তাতে সবসময় রিপাবলিকানদের বিরোধিতা করতে দেখা গেছে। কিন্তু এবার দশজন রিপাবলিকানের সমর্থন খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রস্তাবগুলো রিপাবলিকান দ্বারা সমর্থিত হওয়ার অর্থ হলো সেটিকে আইনে রূপান্তরিত করার মতো যথেষ্ট ভোট রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, এটি সঠিক দিকে অগ্রসর হওয়া কিন্তু অস্ত্র সহিংসতা কমাতে যা দরকার তার চাইতে অনেক কম।
এর আগে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন পাশের চেষ্টা কংগ্রেসে পর্যাপ্ত ভোট পেতে ব্যর্থ হয়েছে।
বন্দুকধারীদের গুলিতে নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের পরপর দুটো ঘটনার পর আমেরিকায় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন আরো কঠোর করার দাবিতে শনিবার হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর বহু মানুষ ব্যক্তিগত অস্ত্রের গুলিতে প্রাণ হারান। তাদের একটি বড় অংশ শিশু যারা নিজের স্কুলেই প্রাণ হারান। বেশিরভাগ সময় স্কুলে হামলায় জড়িতরা কিশোর বয়সী।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ২৪ মে টেক্সাসের ইউভ্যালডে এলেমেন্টারি স্কুলে এক বন্দুকধারীর নির্বিচার গুলিতে ১৯টি শিশু ও দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
এরই মাত্র ১০ দিন আগে নিউইয়র্কের বাফালো শহরের একটি সুপারমার্কেটে আরেক ঘটনায় নিহত হন দশ জন। ২০১৮ সালে পার্কল্যান্ডের একটি স্কুল শুটিংয়ে ১৪ জন শিক্ষার্থী ও তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নিহত হয়েছিলেন।
২০১২ সালে কানেকটিকাটের স্যান্ডি হুক এলেমেন্টারি স্কুলে হামলায় ছয়-সাত বছর বয়সী ১২টি শিশুসহ ২৬ জন নিহত হয়েছিল।
এ রকম বহু ঘটনার নজির যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির একটি বড় অংশ। অস্ত্র রাখার অধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন তারা অত্যন্ত ক্ষমতাধর। বহু বছর চেষ্টা করেও দেশটিতে কোনো প্রশাসন এ ব্যাপারে একটি কঠোর আইন প্রণয়নে সমর্থ হয়নি।
মে মাসের দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেখানে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রণয়নে আবারো নতুন করে দাবি উঠেছে।
সেনেটে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের নিয়ে গঠিত আন্তদলীয় গ্রুপ এক বিবৃতিতে বলেছে, আমেরিকান শিশুদের নিরাপত্তা দিতে, স্কুলগুলো নিরাপদ করতে, দেশব্যাপী সহিংসতা কমাতে আজ আমরা একটি কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন দ্বিপক্ষীয় প্রস্তাব ঘোষণা করছি।
আমাদের পরিবারগুলো আতঙ্কিত এবং সমাজে নিরাপত্তাবোধের অনুভূতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য কিছু একটা করতে একত্রিত হওয়া আমাদের দায়িত্ব।
মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, স্কুলে নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, সেই সাথে পারিবারিক সহিংসতার দায়ে সাজা ভোগকারী এবং কারো কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য আদালতের আদেশ বা রেস্ট্রেইনিং অর্ডার যেসব ব্যক্তিদের উপর রয়েছে অস্ত্র ক্রয়ের সময় তাদের অতীত ইতিহাস তদন্ত করার পর তা ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
যত দ্রুত সম্ভব এসব প্রস্তাব পাশ করার জন্য সেনেটের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তবে তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, তিনি যত কঠোর চেয়েছিলেন এসব প্রস্তাব ততটা কঠোর হয়নি।
প্রেসিডেন্ট বাইডেন অ্যাসল্ট অস্ত্র নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে চাপ দিয়েছিলেন।
টেক্সাস ও বাফালোর স্কুল ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলো স্কুলে হামলার ঘটনায় বেশি ক্ষমতা সম্পন্ন অ্যাসল্ট অস্ত্র ব্যাবহার করা হয়েছে।
জো বাইডেন বলেছেন, যা করা দরকার এতে সেরকম সবকিছু না থাকলেও সঠিক পথের দিকে যাওয়ার উদ্যোগ এতে প্রতিফলিত হচ্ছে।
আন্দোলনকারীরা একটি জাতীয় লাইসেন্স ব্যবস্থা চালু করার দাবিও জানাচ্ছেন যাতে বন্দুকের মালিকের নাম নিবন্ধিত থাকবে।
সেনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা চাক শুমার, যিনি একজন ডেমোক্র্যাট, তিনি বলেছিলেন যে এই পরিকল্পনাগুলি ‘একটি ভালো প্রথম পদক্ষেপ’ এবং আইনটির খুঁটিনাটি বিস্তারিত প্রস্তুত হয়ে গেলে তিনি দ্রুত বিলটি সেনেটের ভোটে নিয়ে যেতে চান।
সেনেটের সংখ্যালঘু নেতা রিপাবলিকান সদস্য মিচ ম্যাককনেল বলেছেন যে এই পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে ‘সংলাপ এবং সহযোগিতা কত মূল্যবান’।
বিশ্বের ধনী দেশগুলোর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্রে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। দেশটির অনেকেই মনে করেন বন্দুক রাখা একজন ব্যক্তির অধিকার। ‘অস্ত্র রাখা এবং বহন করা’ দেশটির সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী দ্বারা সুরক্ষিত একটি অধিকার।