1. shahajahanbabu@gmail.com : admin :
নিয়ন্ত্রিত বলছে সরকার, ২৪ ঘণ্টায় ১১ জনের প্রাণহানি - Pundro TV
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ০৫:০২ পূর্বাহ্ন



নিয়ন্ত্রিত বলছে সরকার, ২৪ ঘণ্টায় ১১ জনের প্রাণহানি

পুন্ড্র.টিভি ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ২০ মে, ২০২৬

দেশে হাম পরিস্থিতিকে ‘নিয়ন্ত্রণে’ দাবি করছে সরকার ও স্বাস্থ্য প্রশাসন। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। রাজধানী থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এখনো প্রতিদিন নতুন আক্রান্ত শিশু শনাক্ত হচ্ছে। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার একদিনেই হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ঝরেছে ১১ শিশুর প্রাণ। এদের মধ্যে হাম উপসর্গে নয় ও নিশ্চিত হামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৩৩৭ জন। গতকাল মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

এ নিয়ে হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে গত দুই মাসে সারা দেশে ৪৭৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ৭৭ শিশুর। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩৯৮ শিশু। স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের টিকাদান ঘাটতি, সচেতনতার অভাব এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থার কারণেই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক করা যাচ্ছে না।
এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রনলয় ও অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের অধিকাংশ এলাকায় বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে এবং সংক্রমণের হার আগের তুলনায় কমেছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে’ রয়েছে। তবে চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, মৃত্যুর সংখ্যা এবং নতুন আক্রান্তের ধারা প্রমাণ করে এখনো ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম সাধারণ জ্বর নয়। এটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। অপুষ্ট শিশু, টিকা না পাওয়া শিশু এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। হাম থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণসহ বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। দেশে বহু পরিবার এখনো শিশুদের পূর্ণ টিকা নিশ্চিত করছে না। গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে টিকা কার্যক্রম নিয়ে অনীহা, ভুল তথ্য এবং সচেতনতার অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার শহরাঞ্চলেও অনেক অভিভাবক নির্ধারিত সময় মেনে টিকা দিচ্ছেন না। ফলে একটি শিশুর মাধ্যমে দ্রুত পুরো এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে।এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, প্রত্যেক বছর দুবার ভিটামিন ‘এ’ এর ক্যাম্পেইন করার কথা। গত বছরের প্রথমার্ধে একটা ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন হয়েছিল।

তারপরে কোনও ক্যাম্পেইন হয়নি এবং ভিটামিন এ নাই। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় হামের টিকার কোনও মজুত ছিল না। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি না হওয়া এবং টিকার তীব্র ঘাটতি বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ বলেও জানান তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনা নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা। সেক্টর কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তে অচলাবস্থা তৈরি হয় টিকা কেনায়।

কারণ এসব টিকা অতীতে কেনা হতো সেক্টর কর্মসূচির আওতায় অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে। কিন্তু তখনকার সরকারের অর্ধেক টিকা উন্মুক্ত টেন্ডারে এবং বাকি অর্ধেক ইউনিসেফের মাধ্যমে কেনার সিদ্ধান্তে জটিলতা তৈরি হয়। যদিও পরবর্তীকালে পুরো টিকাই ইউনিসেফের কাছ থেকে কেনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনার পদ্ধতি নিয়ে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল বলেও দাবি করেছে ইউনিসেফ। এখন হাম প্রায় নিয়ন্ত্রনে।
সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রিত বললেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ের দুর্বলতা রয়ে গেছে।

অনেক হাসপাতালে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত বেড, আলাদা আইসোলেশন ব্যবস্থা কিংবা প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞের সংকটও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর সফলতার কারণে হামের প্রকোপ অনেকটাই কমে এসেছিল। ২০১৪ সালের পর থেকে কয়েক দফায় দেশ হাম নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতির স্বীকৃতিও পায়। কিন্তু করোনা মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হয়।

বহু শিশু নির্ধারিত টিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। সেই ঘাটতির প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ডা. চিরঞ্জিত দাস বলেন, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা দেখাতে সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত ৩০ উপজেলায় ৫ এপ্রিল থেকে টিকাদান কার্যক্রম চালুর পর বর্তমানে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কম। বিশেষ করে ১৭ এপ্রিলের পর থেকে ওইসব এলাকায় রোগীর সংখ্যা দৃশ্যমানভাবে কমতে শুরু করেছে।

এই ফলাফল টিকাদানের কার্যকারিতার স্পষ্ট প্রমাণ। একই প্রবণতা পাঁচটি সিটি করপোরেশন এলাকায়ও দেখা যাচ্ছে। সারাদেশে শিশুদেরকে পর্যাপ্ত পরিমাণ হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। সেজন্য আগামী কিছুদিনের মধ্যে হামের প্রকোপ কমে যাওয়ার আশা করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. জিয়াউল হক বলেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একসময় সফল টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে এর সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। কিন্তু গত দুই বছরে টিকাদান কার্যক্রমে বিঘœ ঘটে। ফলে আজ এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শুধু টিকাদান কর্মসূচি চালালেই হবে না, প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি ও দ্রুত শনাক্তকরণ ব্যবস্থা। কোনো এলাকায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে আশপাশের শিশুদের টিকার আওতায় আনা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

একইসঙ্গে স্কুল, মাদরাসা ও স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
এদিকে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ বাড়ছে। জনমনে প্রশ্ন যদি পরিস্থিতি সত্যিই নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে কেন প্রতিদিন নতুন প্রাণহানি ঘটছে? অভিভাবকদের অভিযোগ, সরকারি বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলো সময়মতো চিকিৎসা ও পরীক্ষা করাতে গিয়ে নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।
শিশুরোগ স্পেশালিস্টরা বলছেন, হামকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দ্রুত ছড়ায় এবং অপুষ্ট শিশুদের জন্য ভয়াবহ হতে পারে। শুধু সরকারি ঘোষণায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে না বাস্তবে শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সরকারের আন্তরিক ও সমন্বিত উদ্যোগ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

পাশাপাশি টিকা নিয়ে গুজব বা ভুল ধারণা ঠেকাতে কার্যকর প্রচারণা প্রয়োজন। প্রতিটি শিশুর জীবন রক্ষায় এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। কারণ কাগজে-কলমে নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি দিয়ে হয়তো প্রশাসনিক স্বস্তি পাওয়া যায়, কিন্তু প্রতিদিন ঝরে পড়া শিশুদের প্রাণ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২
Developed By ATOZ IT HOST