মো. শরীফুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৭:১৯
বাংলাদেশের কৃষি আজ এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, আবাদি জমি হ্রাস, খাদ্য নিরাপত্তার চাপ এবং কৃষকের আয় অনিশ্চয়তার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষিবিজ্ঞানীদের ভূমিকা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দেশের অনেক মেধাবী কৃষিবিজ্ঞানী ধীরে ধীরে পেশা কিংবা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। কেউ বেছে নিচ্ছেন প্রশাসনিক বা করপোরেট চাকরি, কেউ গবেষণার পরিবেশ না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ছেন।
কৃষি গবেষণা বাংলাদেশের কৃষিতে ফসল ও শস্যের বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি উৎপাদনও বহুগুণ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের সামগ্রিক গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ০.৩০ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও অত্যন্ত কম।
উন্নত দেশগুলো জিডিপির ২-৪ শতাংশ পর্যন্ত গবেষণায় বিনিয়োগ করে।
কৃষিবিজ্ঞানীদের চাকরির নিরাপত্তাহীনতাও আজ একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এখনও পূর্ণাঙ্গ ও টেকসই পেনশন ব্যবস্থা নেই। কিছু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে সীমিত সুবিধা থাকলেও অধিকাংশ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা সরকারি ক্যাডার কর্মকর্তাদের মতো অবসর-পরবর্তী নিরাপত্তা পান না।
এই বাস্তবতা কৃষি গবেষণায় তরুণ মেধাবীদের নিরুৎসাহিত করছে। বিশেষ করে বিসিএস প্রশাসন, ব্যাংকিং, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা কিংবা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে তুলনামূলক বেশি আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা থাকায় সেদিকে তাদের ঝোঁক বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (ইফরি) বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গবেষণা অবকাঠামো, পেশাগত সুযোগ এবং আর্থিক নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতার কারণে উচ্চশিক্ষিত গবেষকদের একটি অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছেন।
নেপালের কৃষি ও ভেটেরিনারি গ্র্যাজুয়েটদের ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ বিদেশে যাওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন মূলত উন্নত গবেষণা সুযোগ ও জীবনমানের কারণে। বাংলাদেশের বাস্তবতাও অনেকটাই একই।
অনেক কৃষিবিজ্ঞানী বছরের পর বছর মাঠ পর্যায়ে কাজ করেও যথাযথ মূল্যায়ন পান না। গবেষণা প্রকাশ, প্রযুক্তি উদ্ভাবন কিংবা কৃষকের জন্য কার্যকর অবদান রাখলেও তাদের অর্জন অনেক সময় জাতীয় পর্যায়ে দৃশ্যমান হয় না। গবেষণার তুলনায় প্রশাসনিক পদ ও ক্ষমতার মূল্যায়ন বেশি এখানে।
অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে আধুনিক ল্যাব, আন্তর্জাতিক মানের যন্ত্রপাতি এবং দ্রুত প্রশাসনিক সহায়তার অভাব রয়েছে।
গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন, যন্ত্রপাতি কেনা কিংবা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। ফলে বিজ্ঞানীরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইউরোপ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে কৃষিবিজ্ঞানীরা উন্নত গবেষণাগার, উচ্চ বেতন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং অবসরকালীন নিরাপত্তা পাচ্ছেন। ফলে বাংলাদেশি গবেষকদের জন্য বিদেশে ক্যারিয়ার গড়া আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন, ব্লু ইকোনমি, মৎস্য ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে দক্ষ দক্ষিণ এশীয় গবেষকদের জন্য বর্তমানে বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ছে।
এই মেধা পাচারের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জলবায়ু সহনশীল ধান, খরাসহিষ্ণু ফসল, রোগপ্রতিরোধী মাছ, টেকসই অ্যাকুয়াকালচার কিংবা স্মার্ট কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য দক্ষ কৃষিবিজ্ঞানী প্রয়োজন। গবেষক সংকট বাড়লে কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবন ও মাঠ
পর্যায়ে সম্প্রসারণ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্য নিরাপত্তা ও জাতীয় অর্থনীতিতে।
সময় এসেছে বাস্তবভিত্তিক ও সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
কৃষি গবেষণায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে গবেষণা খাতে জিডিপির অন্তত ১ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গবেষণাগার আধুনিকায়ন ও গবেষণা অনুদান বাড়াতে হবে। দেশের সব কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে একটি সমন্বিত ও টেকসই পেনশন ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। গবেষকদের জন্য মেধাভিত্তিক পদোন্নতি, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ, গবেষণা ভাতা এবং উদ্ভাবনী পুরস্কার চালু করা প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য ‘ইয়ং এগ্রিকালচারাল সায়েন্টিস্ট ফেলোশিপ’ চালু করা যেতে পারে।
বিদেশফেরত পিএইচডিধারীদের জন্য ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেন’ কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে। এ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশও কর অবকাশ, গবেষণা অনুদান ও বিশেষ নিয়োগ সুবিধা দিতে পারে।
কৃষিবিজ্ঞানীদের সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে।
ড. মো. শরীফুল ইসলাম: সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (ফিশারিজ), সার্ক কৃষিকেন্দ্র, ঢাকা।