1. shahajahanbabu@gmail.com : admin :
রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের প্রভাব কতটুকু? - Pundro TV
সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ০৮:১৩ পূর্বাহ্ন



রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের প্রভাব কতটুকু?

অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ শনিবার, ৯ মে, ২০২৬

শাহরিন হক

 প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৮:৩৭

বাংলাদেশে নারীর অগ্রগতির গল্প আমরা প্রায়ই গর্বের সঙ্গে বলি–শিক্ষা, অর্থনীতি, এমনকি রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বেও নারীর দৃশ্যমান উপস্থিতি আছে। প্রশ্ন হলো, এই উপস্থিতি কি সত্যিই ক্ষমতায় রূপ নিয়েছে, নাকি তা অনেকটাই প্রতীকী? সাম্প্রতিক আলোচনায় স্পষ্ট যে সংখ্যা দিয়ে অন্তর্ভুক্তি দেখানো সহজ, কিন্তু ক্ষমতা, কণ্ঠ ও প্রভাব নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এই প্রশ্নকে আরও স্পষ্ট করে সামনে নিয়ে এসেছে। ভোটারের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হলেও সরাসরি নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা ছিল সীমিত। রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় নারীরা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়েন, আর নির্বাচনী প্রতিযোগিতার বাস্তব পরিবেশও তাদের জন্য অনেক ক্ষেত্রে প্রতিকূল থেকে যায়। ফলে নির্বাচনের পর সংসদে নারীর উপস্থিতি থাকলেও সেই উপস্থিতির বড় অংশ ভিন্ন একটি কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতা আমাদের নিয়ে আসে সংরক্ষিত আসনের প্রশ্নে। জাতীয় সংসদে নির্দিষ্ট সংখ্যক নারী সদস্য সরাসরি ভোটে নয়; বরং দলীয় অনুপাতের ভিত্তিতে মনোনীত হন। এই ব্যবস্থা নারীর উপস্থিতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এখানেই ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। কারণ সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মতো তাদের নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা থাকে না বলে জনগণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সম্পর্ক ও ভিত্তি গড়ে তোলার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।

সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে নারীর শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করা হলেও এটি সংখ্যা বাড়াচ্ছে কিন্তু প্রভাবের জায়গায় ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
সমস্যাটি শুধু নির্বাচনী কাঠামোয় নয়, এর শিকড় আরও গভীরে। সমাজে এখনও লিঙ্গভিত্তিক ধারণা শক্তভাবে কাজ করে, নেতৃত্বকে অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে বেশি মানানসই হিসেবে দেখা হয়।

এই মানসিকতা রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলে। ফলে নারীরা প্রার্থী হওয়ার আগেই অদৃশ্য এক বাধার মুখে পড়ে যান। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকি এবং পারিবারিক-সামাজিক চাপ, যা নারীর জন্য রাজনীতির পথকে আরও কঠিন করে তোলে।

বাস্তবে দেখা যায়, সংরক্ষিত আসনের অনেক নারী সংসদ সদস্য সংসদে উপস্থিত থাকলেও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রীয় জায়গাগুলোতে তাদের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান। গুরুত্বপূর্ণ কমিটি, দলীয় সিদ্ধান্ত বা ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে তাদের প্রবেশ সীমিত থাকে। ফলে প্রতিনিধিত্ব থাকলেও তা সবসময় কার্যকর প্রভাব তৈরি করতে পারে না।

নারীর ক্ষমতায়ন কেবল কোটা বা উপস্থিতির বিষয় নয়, বরং ক্ষমতা কাঠামোয় তাদের বাস্তব অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার, নারীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ, আর্থিক ও নিরাপত্তাগত সহায়তা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ– সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন।

স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নারীর জন্য একটি ধারাবাহিক নেতৃত্বের পথ তৈরি করা গেলে তারা শুধু অংশগ্রহণই করবেন না–ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রেও জায়গা করে নিতে পারবেন। তখনই প্রতীকী উপস্থিতি থেকে বাস্তব ক্ষমতায়নের যাত্রা সত্যিকার অর্থে শুরু হবে।

এই প্রভাবের প্রশ্নটি আসলে বহুমাত্রিক। সংসদে কতজন নারী আছেন–এটি একটি দৃশ্যমান সূচক। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তারা কতটা স্বাধীনভাবে মত দিতে পারছেন, কতটা নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারছেন এবং কতটা নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পারছেন। যদি কোনো প্রতিনিধি সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে না থাকেন, যদি তার কণ্ঠ দলীয় বা কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার ভেতর আটকে থাকে, তাহলে তার উপস্থিতি গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের পূর্ণতা এনে দেয় না।

এখানেই বাস্তব ক্ষমতায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। নারীরা যেন শুধু নির্বাচিত বা মনোনীত হয়ে সংসদে না আসেন, বরং তারা যেন আইন প্রণয়ন, বাজেট আলোচনা, কমিটির নেতৃত্ব–প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সক্রিয় ও প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে পারেন। এর জন্য প্রয়োজন তাদের রাজনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, দলীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্তর্ভুক্তি এবং এমন একটি পরিবেশ যেখানে তাদের

মতামত গুরুত্ব পায়, কেবল আনুষ্ঠানিকতার অংশ হয়ে থাকে না।

একই সঙ্গে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে সমাজের সামগ্রিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে হবে। পরিবার, শিক্ষা, গণমাধ্যম–সব জায়গায় যদি নারীর নেতৃত্বকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তার প্রতিফলন দেখা যাবে।
সব মিলিয়ে এখন সময় এসেছে সংখ্যার সাফল্য থেকে প্রভাবের সাফল্যের দিকে যাত্রা করার। নারীরা রাজনীতিতে আছেন, এটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তারা কতটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, কতটা নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলছেন, সেই প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর তৈরি করতে পারলেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও পরিপূর্ণ, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠবে।

শাহরিন হক: কমিউনিকেশন প্রফেশনাল

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২
Developed By ATOZ IT HOST