দুই দিনের রোদে হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা যে স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়েছিলেন, তা তৃতীয় দিনে এসে আবার মিইয়ে যেতে শুরু করেছে। গতকাল শনিবার ভোর থেকে আবার শুরু হয় বৃষ্টি। দুপুরের দিকে কিছুটা থেমে গেলে কৃষক ধান কাটতেও গিয়েছিলেন। কিন্তু আবার বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে শঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে কৃষকের। জলাবদ্ধতায় ফসলহানির দীর্ঘ ক্ষত কাটিয়ে ওঠার লড়াই যেন থামছে না হাওরবাসীর।
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বোয়ালা হাওরের বাঁধ ভেঙে গতকাল পানি ঢুকতে শুরু করেছে হাওরে। এতে জেলার লক্ষাধিক কৃষক পরিবারে আবার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। গত দুই দিনে কিয়ারপ্রতি (৩০ শতকে এক কিয়ার) চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার চুক্তিতে কোমরসমান পানিতে ধান কাটিয়েছেন বোরোচাষিদের অনেকে। খলায় অঙ্কুর (গেঁরা) গজানো ধান রোদে মেলে খোরাকের যৎসামান্য ঘরে তুলতে পারলেও বৃষ্টি শুরু হওয়ায় আবার বেকায়দায় পড়তে হয়েছে কৃষকদের।
সুনামগঞ্জ কৃষি অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ১ লাখ ৩২ হাজার ৪১৮ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। এখনো কাটা বাকি আছে ৯১ হাজার ৯৩ হেক্টর জমির পাকা ধান। ১৫ হাজার ৩৫৩ হেক্টর জমি জলাবদ্ধতায় হলেও ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করতে পারেনি।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, শনিবার সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উজানে এবং হাওর অববাহিকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে ২৪ ঘণ্টায় ৩২ মিলিলিটার এবং সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় সর্বোচ্চ ১২৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
হাওরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি ধীরগতিতে (১ সেন্টিমিটার হারে) বাড়লেও জগন্নাথপুরের নলজুর নদীর পানি ৮ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে স্থিতিশীল আছে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি। আগামী তিন দিন মাঝারি থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, সকালে বৃষ্টি থাকায় কৃষক ধান কাটতে পারেনি। বৃষ্টি কমার সঙ্গে সঙ্গে কৃষক ধান কাটতে শুরু করে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদারের দাবি, বোয়ালা হাওরে বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকলেও এই হাওরের ধান কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে।
এদিকে কিশোরগঞ্জেও গতকাল দুপুর পর্যন্ত বজ্রসহ বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে নতুন করে তলিয়ে গেছে অনেক জমির ফসল।
অষ্টগ্রাম উপজেলার আব্দুল্লাহপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, ‘ধান তো গেছেই, হাওরে রাখা খড়গুলোও বৃষ্টির পানিতে ভেসে গেছে। সারা বছর আমাদের উপোস থাকতে হবে, গরুগুলোও না খেয়ে মরবে।’
নিকলীর সিংপুর ইউনিয়নের কৃষক ইদ্রিস আলীর দেড় একর জমির বেশির ভাগ পানিতে ডুবে আছে। যেটুকু জমির ফসল এখনো ডোবেনি, সেটুকুও শ্রমিকসংকটে কাটাতে পারছেন না।
জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, কয়েকটি নদীর পানি কিছুটা বেড়েছে। তবে সবকটি নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
নিকলী আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র অবজারভার আক্তার ফারুক জানান, গতকাল দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ১৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি। বৃষ্টি না হলে ধান কাটতে বলেছি।’
ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনায় হাওরে পানি বাড়ছে। এতে বোরো ফসল নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। বৃষ্টির কারণে ইতিমধ্যে কেটে রাখা ধান শুকাতে পারছেন না তাঁরা। বাড়িতে স্তূপের মধ্যেই পচে যাচ্ছে ধান।
এদিকে জেলার কংস নদের পানি বেড়ে এখন বিপৎসীমার ৯৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং উপদাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ৭২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল সন্ধ্যা ৬টার দিকে জেলা পাউবো সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, হাওরাঞ্চলে এ পর্যন্ত ৭০ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে।
খালিয়াজুরী উপজেলার লেপসিয়া এলাকার কৃষক সাদ্দাম হোসেন বলেন, বৃষ্টির কারণে যেমন হাওরে পানি বেড়ে ধান তলিয়ে যাচ্ছে, তেমনি কাটা ধান মাড়াই করে শুকানো যাচ্ছে না। এতে স্তূপেই ধান পচে যাচ্ছে।
জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাওরে এখনো সব কটি বেড়িবাঁধ ঠিক আছে। বাঁধ যাতে না ভাঙে, সে বিষয়ে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এবার বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে এমন সমস্যা হয়েছে।
টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় কমলগঞ্জে ৫০০ হেক্টর বোরো ফসল ও ৫০ হেক্টর সবজি ক্ষতিগ্রস্ত টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৫০০ হেক্টরের বোরো ফসল এবং প্রায় ৫০ হেক্টরের মতো সবজিখেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় বোরো ফসলের আরও ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় বলেন, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় শনিবার দুপুর পর্যন্ত ২৮০ হেক্টর বোরো ফসল সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত এবং ৩০৫ হেক্টর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩৫ হেক্টরের সবজিখেত সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ ছাড়া হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার হাওরাঞ্চলে টানা ভারী বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে পাকা বোরো ধান। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, নবীগঞ্জ উপজেলায় চলতি মৌসুমে ১৮ হাজার ৯৫৬ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে ভারী বৃষ্টিপাতে ৭৫০ হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও প্রায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমি।
নবীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শেখ ফজলুল হক মনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার ও নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি]