মনজুর আহমদ
প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০৯ | আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১১
শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। নানা অজুহাতে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গসংগঠন যথাক্রমে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের অনুসারীরা বাগ্যুদ্ধ থেকে সহিংস সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। গত কয়েক দিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, পাবনা প্রভৃতি স্থানে দুই দলের অনুসারীদের সংঘাতে অস্ত্রের ব্যবহারও দেখা গেছে।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের শিবিরদলীয় পদধারীদের ছাত্রদল অনুসারীরা আহত করে হাসপাতালে পাঠিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নেতা অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, যারাই স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
তাদের নিজ দলের অনুসারীদের সংযত হওয়ার কথা তিনি বলেননি। প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখনও এমন বার্তা দেননি– শিক্ষাঙ্গনে কোনো শিক্ষার্থীর সহিংস ও অছাত্রসুলভ আচরণ মেনে নেওয়া হবে না এবং এ জন্য তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।২.
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বহু বছর পর অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনে দেশের পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থীরা প্রায় নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। তাদের এই বিজয়ের কারণ বিশ্লেষণে গণমাধ্যম ও নাগরিক সংলাপে ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত হয়।অতীতের ছাত্র রাজনীতির চরিত্র সম্বন্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রবল অসন্তোষ ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থীদের প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যাপক সমর্থনের কারণ বলে মনে করা
ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের লেজুড় ছাত্র সংগঠনের শুধু রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাই নয়, একই সঙ্গে সাধারণ ছাত্রদের ওপর ছাত্রনেতাদের দুর্ব্যবহার, যথেচ্ছ বলপ্রয়োগ, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন দুর্নীতি, আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ এবং যে কোনো ভিন্নমতের সহিংস দমন থেকে রেহাই পাওয়ার পথ খুঁজেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা দেখেছিল, এই আধিপত্য ও ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতিতে শিক্ষকদেরও একাংশ এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক ও নেতৃত্বও জড়িত ছিলেন। এই দুর্বিষহ পরিস্থিতির অবসান চেয়েছিল সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে রাজনৈতিকভাবে ও আইনি চাপে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির তাদের প্রকাশ্য কার্যকলাপ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল। তবে সুসংগঠিত ও কৌশলী জামায়াত সুপরিকল্পিতভাবে শিবিরকর্মীদের সাধারণ শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা ও ভাবমূর্তি তৈরি করতে উৎসাহিত করেছে। গ্রাম থেকে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন শিক্ষার্থীদের শিবিরকর্মীরা নানা প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপি ও তাদের অনুসারী ছাত্রদলের গতানুগতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা ছাড়া অন্য কোনো সাংগঠনিক পরিকল্পনা বা কৌশল ছিল, বলা যায় না। ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬ সালে বিএনপি শাসনামলে আওয়ামী লীগ শাসনামলের ছাত্রলীগের আচার-আচরণ থেকে ছাত্রদলের আচরণ গুণগত বিচারে ভিন্ন ছিল– বলা যায় না। তবে আওয়ামী লীগের সর্বশেষ দেড় দশক শাসনের সময় অপকর্মের খতিয়ানে ছাত্রদল ছাত্রলীগকে অতিক্রম করতে পেরেছিল কি না– প্রশ্নসাপেক্ষ।
৩.
এ বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ‘অভিভাবক’ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দুই-তৃতীয়াংশের অধিক সংসদীয় আসন লাভ করে বিজয়ী হয়েছে। জাতীয় রাজনীতির বৃহত্তর পরিসরে জনসাধারণের একটি বড় অংশ বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছে। এবার শিক্ষাঙ্গনে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও বজায় রাখার রাজনীতি কি আবার নতুন উদ্যমে শুরু হয়েছে?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই পাকিস্তানের স্বৈরশাসনের আমলে শুরু হয়েছিল। স্বাধীনতার পর সেই ধারা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক সরকারের সময় চলে এসেছে। জাতীয় ইতিহাসের বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে দেশের ছাত্র-তরুণরা সংঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করেছে, প্রাণ দিয়েছে; গৌরবময় ভূমিকা রেখেছে। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব ও চরম ত্যাগ এর সর্বশেষ দৃষ্টান্ত।
একই সঙ্গে স্বীকার করতে হবে, ছাত্র সংগঠন ও শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতি সামগ্রিকভাবে শিক্ষা, শিক্ষার্থী ও জাতীয় স্বার্থের বিবেচনায় চলেনি। ছাত্র রাজনীতি রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়ে পরিণত হয়েছিল এবং রাজনৈতিক দলগুলোর যাবতীয় অপ-আচরণ ও অপকর্মের বাহন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপরাজনীতির প্রভাব শিক্ষাব্যবস্থাকে নানাভাবে পর্যুদস্ত ও শিক্ষাঙ্গনকে কলুষিত করেছে। বিশেষত উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে রাজনীতি বড় বাধা সৃষ্টি করেছে। এ জন্য দায়ী রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি– তা নিয়ে বিতর্কের বিশেষ অবকাশ নেই। শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা আমলাদের দায় নিশ্চয় আছে। কিন্তু তাদের অপকর্ম রাজনৈতিক মদত ছাড়া তারা চালিয়ে যেতে পারে না।
৪.
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কি আমরা পুরোনো পথে হাঁটতে শুরু করেছি? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নিয়োগে দলীয় বিবেচনার প্রাধান্য ভালো বার্তা দেয়নি। এ সম্বন্ধে শিক্ষামন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হলে তাঁর জবাব ছিল; এদের রাজনীতিতে যুক্ত থাকা কি অপরাধ? না, তা নয়। কিন্তু অভিজ্ঞতার পর রাজনৈতিক যুক্ততাকে গুরুত্ব দেওয়া কি প্রয়োজন ছিল?
ছাত্র রাজনীতি ব্যাপারটিই আসল সমস্যা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনুসারী ছাত্র সংগঠনও সমস্যা নয়। এই প্রচলন অনেক দেশেই আছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ, মতবাদ ও অবস্থান নিয়ে বিতর্ক, পর্যালোচনা ও কার্যসূচি বা নিজের পক্ষে অনুসারী সংগ্রহের চেষ্টাও সমস্যা নয়। বরং এ ধরনের কাজ বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
যতক্ষণ এসব কার্যকলাপ শিক্ষার্থী হিসেবে কারও আচরণ, দায়িত্ব ও কর্তব্যের সীমা লঙ্ঘন না করে এবং ভিন্নমত প্রকাশে বল প্রয়োগ করে বাধা না দেওয়া হয়। এ জন্য সুনির্দিষ্ট শিক্ষার্থী আচরণবিধি (কোড অব কন্ডাক্ট) তৈরি করতে হবে। হয়তো শিক্ষকদের জন্যও এ রকম আচরণবিধি তৈরি করা প্রয়োজন। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের যৌথ উদ্যোগে কাজ করতে হবে।
মতভেদের কারণে সহিংসতা, আধিপত্য বিস্তারে বলপ্রয়োগ, ভিন্নমতের বিরোধিতার অসৎ উপায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে অশিষ্ট বা অন্যায় আচরণ শিক্ষার্থীর মর্যাদা হারানোর কারণ বলে গণ্য হবে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের শাস্তি হবে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে শিক্ষার্থীর অধিকার হারানো। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই বিধি তৈরি ও প্রয়োগের দায়িত্ব থাকলেও এর সুফল ও কার্যকর প্রয়োগ সম্ভব হবে সরকার ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সুস্পষ্ট অঙ্গীকারের ভিত্তিতে।ড. মনজুর আহমদ: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক