মিলন কিবরিয়া
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২২ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২২
তিন যুগ আগে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র থাকা অবস্থায় একটি দৃশ্য দেখতাম, যা এখনও একই অবস্থায় রয়েছে। সরকারি হাসপাতালের বারান্দা, কোনো ওয়ার্ডে এক শয্যায় একাধিক রোগী থাকছেন। আউটডোরে উপচে পড়া ভিড়, ভর্তিচ্ছুদের লম্বা লাইন, ভর্তির পর অপারেশনের তারিখের জন্য অনিশ্চিত অপেক্ষা।
এ পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি তিন দশকের বেশি সময়ে। এ দৃশ্য সবসময় সরকারি হাসপাতালের। বিভিন্ন মাধ্যমে দেখা দালালচক্রের খবরের অধিকাংশই সরকারি হাসপাতালকেন্দ্রিক। চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল সেবা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে দালাল টিকিয়ে রাখার সব শর্তই আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিদ্যমান।
শহরের হাসপাতালে বেশির ভাগ রোগী আসেন দূরদূরান্ত থেকে। তাদের মধ্যে জরুরি রোগীদের দরকার তাৎক্ষণিক চিকিৎসা। ভর্তিযোগ্য রুটিন রোগীদের দরকার অনিশ্চিত ও দীর্ঘ লাইন থেকে মুক্তি। অনেক হাসপাতালে শয্যাসংখ্যার বেশি রোগী ভর্তি করার নিয়ম নেই; সেই রোগী জরুরি হলেও। তখন তাকে অন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়। ভর্তিযোগ্য রোগী ও হাসপাতালের খালি শয্যাসংখ্যার বিপুল অসমতার কারণে এমনটি হয়।
তখন আউটডোরে অপেক্ষমাণ রোগীকে হাসপাতালের ভেতরের কেউ অর্থের বিনিময়ে শয্যা পাইয়ে দেয়। অনিচ্ছুক এই অর্থ প্রদানে বাধ্য হয়েও শয্যা পেয়ে রোগী ও তাঁর আত্মীয়স্বজন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।এই অসহায় পরিস্থিতিকেই পুঁজি করে দালাল চক্র কাজ করে।
আমাদের সরকারি হাসপাতালের আশপাশেই থাকে অনেক প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক ও হাসপাতাল। যেখানে ভোক্তা বেশি, সেখানেই ব্যবসায় সাফল্য। আমরা চিকিৎসাকে বলি স্বাস্থ্যসেবা। এখন স্বাস্থ্যসেবা একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসা খাত। রোগী পাওয়ার জন্য অনেকে দালাল নিয়োগ করে। দালাল অনেকে এসব বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক ও হাসপাতালের বেতনভোগী কর্মচারী এবং অনেকেই আবার সরকারি হাসপাতালের কর্মচারী। অসহায় রোগীরা দালালের খপ্পরে পড়েন না বুঝে বা বাধ্য হয়ে।
ভর্তিযোগ্য দুই ধরনের রোগীই এখানে ধরা পড়েন– শয্যা না পেয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় জরুরি রোগী এবং অপেক্ষায় ক্লান্ত রুটিন রোগী। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে আসা রোগীর গন্তব্য হয় বেসরকারি হাসপাতাল।
যারা সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন তাদের প্রয়োজন হয় রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সরকারি হাসপাতালে স্বল্প মূল্যে বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। এটাও সত্য, সকল হাসপাতালে সকল পরীক্ষা হয় না। হয়তো পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয় যন্ত্রটি সেই হাসপাতালে নেই। থাকলেও অচল। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত পরীক্ষা করে ফলাফলের ভিত্তিতে চিকিৎসা শুরু করতে হয়।
নিরুপায় রোগী ও স্বজনদের তখন নিকটবর্তী হাসপাতালে ছুটতে হয়। এসব ক্লিনিক ও হাসপাতালের সেবা খাতের বাণিজ্য বিরতিহীন। পরীক্ষা করা, হাসপাতালে ভর্তি, অ্যাম্বুলেন্স সেবা– কোনোটি দালালচক্রের আওতার বাইরে নয়।
চাকরিরত দালালদের মাসিক টার্গেট পূরণের চাপ থাকে। তারা নিজেদের দালালি চাকরির কোটা পূরণে রোগীর অহেতুক পরীক্ষার সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। অভিজ্ঞ ও পুরোনো দালাল অনেকে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করে কমিশনও নেন। অর্থাৎ দালাল পেশায়ও ফ্রিল্যান্সিং।
সংকটাপন্ন রোগীদের দিতে হয় বিশেষ সেবা। তখন আইসিইউ আর নবজাতকের জন্য এনআইসিইউ প্রয়োজন। চাহিদার তুলনায় সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ ও এনআইসিইউর শয্যাসংখ্যা অনেক কম। বাধ্য হয়ে এই রোগীদের বিকল্প হাসপাতালের সন্ধান করতে হয়। দূরদূরান্ত থেকে রোগী নিয়ে আসা অসহায় স্বজনেরা তখন দালালদের শিকারে পরিণত হন। বলার অপেক্ষা থাকে না, আইসিইউকেন্দ্রিক দালালির অর্থপ্রাপ্তি বেশি।
যথাযথ তদারকি না থাকায় চাহিদা পূরণে তৈরি হচ্ছে মানহীন আইসিইউ, যাদের কোনো নিবন্ধন বা অনুমোদন নেই। নেই কোনো দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। অ্যাম্বুলেন্সের চালকরা আইসিইউকেন্দ্রিক দালালদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, বিশেষত জেলা-উপজেলা পর্যায়ে।
আমাদের গ্রামাঞ্চলে নিজের নামের সঙ্গে ডাক্তার ব্যবহার করলেও পল্লি চিকিৎসকদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। কিন্তু তারা উপসর্গ শুনে ও ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা করে ওষুধ দিয়ে দেন জটিল রোগের। গ্রামের মানুষ প্রথম ধাপে তাদের কাছেই যান। এদের সঙ্গে উপজেলা ও জেলা শহরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক ও হাসপাতালের যোগসূত্র থাকে। সেই সূত্র তৈরি হয় দালালদের মাধ্যমে। আমাদের বেসরকারি খাতের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান তাদের নেটওয়ার্ক গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে।
দালালদের দৌরাত্ম্যের শিকার হন দেশের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত। তারাই সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মূল ভোক্তা। তাদের সামর্থ্য সীমিত বা নেই বললেই চলে। জনসংখ্যার বৃহদাংশ এরাই। তাদের এমনিতেই সামর্থ্যের অনেক বাইরে গিয়ে চিকিৎসা সেবার ব্যয় বহন করতে হয়। বেশির ভাগ রোগী বা রোগীর আত্মীয়স্বজন টেরই পান না দালালের ফাঁদে কীভাবে পকেট কাটা হচ্ছে। আবার বুঝলেও উপায়হীন।
আমাদের সংবিধান চিকিৎসাপ্রাপ্তিকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিলেও তা বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা আরোপ করেনি। এই ফাঁক দিয়ে রাষ্ট্র কখনোই স্বাস্থ্যসেবাকে যথাযথ গুরুত্ব ও মনোযোগ দেয়নি। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বরাবরই অপ্রতুল।
কম-বেশি ৫ শতাংশের আশপাশে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ ১৫ শতাংশ। তেমনিভাবে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় স্বাস্থ্য খাতের সরকারি বরাদ্দ ১ শতাংশের কম এবং এ ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ কমপক্ষে ৫ শতাংশ। এর প্রভাব স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি ধাপেই দৃশ্যমান।
দেশে জনপ্রতি স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় ৫৮ ডলার। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আমাদের পেছনে আছে শুধু পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। শীর্ষে আছে মালদ্বীপ, জনপ্রতি ব্যয় এক হাজার ডলারের বেশি। স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের করুণ অবস্থা এর ভেতর দিয়েই স্পষ্ট হয়। আবার এত কম বরাদ্দ নিয়েও কখনও কখনও তা ফেরত যায়। আছে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির চূড়ান্ত উদাহরণ।
কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও তার যথাযথ বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট ও দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া এর থেকে উত্তরণের সহজ কোনো রাস্তা নেই। যতই দেরি হবে ততই পরিস্থিতি খারাপ হবে। এরই একটি উদাহরণ দালালি বা কমিশন। একটি অবৈধ কাজকে আমরা যেনিরুপায় হয়েই বৈধতা দিয়ে বসছি ক্রমশ। স্বাস্থ্যসেবা কোনো সুযোগ নয়; এটি মৌলিক অধিকার। সে অধিকার নিশ্চিত না হলে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য থামবে না। মিলন কিবরিয়া: বক্ষব্যাধি সার্জারি বিশেষজ্ঞ