মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৬
শিহাব উদ্দিন আহমদ বাংলাদেশ-মিয়ানমার চেম্বার অব কমার্স-বিএমসিসির ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি ফ্রেন্ড ইন নিড মিয়ানমার নামে একটি অলাভজনক সংগঠনের চেয়ারম্যান। এর আগে একশনএইড মিয়ানমারের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কাজ করেছেন। তার আগে ওয়াটারএইড মিয়ানমারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারও আগে কাজ করেছেন একশনএইড বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্টের প্রধান হিসেবে।
কাজের সূত্রে দুই দশক ধরে মিয়ানমারে বসবাস করছেন। শিহাব উদ্দিন আহমদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমকালের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক মাহফুজুর রহমান মানিক।
সমকাল: বর্তমানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সামগ্রিক চিত্র কেমন এবং গত এক দশকে এ সম্পর্কে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে?
শিহাব উদ্দিন আহমদ: বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুটি প্রতিবেশী দেশ। তবে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক কখনোই গভীর বা স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়নি। ব্যবসার ক্ষেত্রেও একই কথা। সম্ভাবনার তুলনায় খুব কমই বাণিজ্য হয়। রাখাইন অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য টেকনাফে যে স্থলবন্দরটি রয়েছে, সেটি ১৯৯৫ সালে একটি কাস্টম স্টেশন হিসেবে শুরু হয়ে ২০০৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে স্থলবন্দরে উন্নীত হয়।
এ বন্দরকে কেন্দ্র করে কিছু সীমিত বাণিজ্য কার্যক্রম চললেও ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকট এবং বিশেষ করে ২০২১ সালের পর মিয়ানমারের সংঘাত পরিস্থিতির কারণে বাণিজ্য ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে বন্দরটি কার্যত বন্ধ রয়েছে এবং এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি, যদিও পুনরায় চালুর আলোচনা চলছে। ইয়াঙ্গুন পোর্টের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানিও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
সমকাল: মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কি এখন আর নেই?
শিহাব উদ্দিন: হ্যাঁ, সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। মিয়ানমার একটি কৃষিভিত্তিক দেশ। তাদের চাল, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মাছ, মসলা ও কফি– এসব পণ্য নিয়মিত রপ্তানি হয়। পাশাপাশি গরু ও ছাগলের মতো প্রাণিসম্পদও গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত। এসব পণ্য মূলত চীন, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ ও ভারতে যায়, আর কিছু পণ্য পশ্চিমা দেশেও যায়। বিশেষ করে রাখাইন অঞ্চল বাংলাদেশের খুব কাছাকাছি হওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষি, মাছ ও প্রাণিসম্পদ বাংলাদেশের বাজারে রপ্তানির বাস্তব সুযোগ অনেক বেশি।
সমকাল: তার মানে প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য মিয়ানমার থেকে সহজেই আমরা আমদানি করতে পারি?
শিহাব উদ্দিন: দেশে আমাদের যে প্রয়োজন আছে, চাল-ডাল, ফল এবং গরু-ছাগল–এগুলো রাখাইন থেকে আমরা পেতে পারি। এপার-ওপার, মাত্র তিন কিলোমিটার। যদি মংডু বন্দর হয়েও আসে, তবু তিন কিলিমিটার। আরও বড় সমুদ্রবন্দর সিত্তে দিয়ে এলেও ১০০ কিলোমিটার হবে। এমন কাছে থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সহজেই আমরা পেতে পারি। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আমরা এখন ভারতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অথচ তাদের উৎপাদন কমে গেলে কিংবা রাজনৈতিক টানাপোড়েন হলে আমরা সমস্যায় পড়ে যাই। সেই জন্য খাদ্য নিরাপত্তায় মিয়ানমার বড় সহযোগী হতে পারে।
সমকাল: মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যে বাধাগুলো কী?
শিহাব উদ্দিন: আমাদের বাণিজ্যের বাধা শুধু কাঠামোগত নয়; এর সঙ্গে আছে রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বাণিজ্য কখনোই খুব শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়নি। আমরা যেমন মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে ধারাবাহিক উদ্যোগ নিইনি, তেমনি মিয়ানমারের দিক থেকেও তেমন আগ্রহ বা প্রচেষ্টা চোখে পড়ে না।
এর পেছনে একটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক দূরত্ব কাজ করছে। ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি হলেও এ দুই দেশ যেন দুই ভিন্ন বাস্তবতায় অবস্থান করছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে যেখানে বাঙালি সমাজ ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসে উপমহাদেশীয় ধারার অংশ, সেখানে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চল ভিন্ন সামাজিক কাঠামো, জাতিগত বিন্যাস এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে গড়ে উঠেছে।
ফলে এই সীমান্ত শুধু দুই দেশকে আলাদা করেনি, বরং দুই ভিন্ন মানসিক জগৎ তৈরি করেছে। এই মানসিক দূরত্বের কারণে মিয়ানমার বরং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো, যেমন– জাপান, কোরিয়া বা চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ সীমিত এবং পারস্পরিক বোঝাপড়াও দুর্বল। তাই বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই হবে না; মানুষের মধ্যে আস্থা, যোগাযোগ ও সম্পর্ক গড়ে তোলাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সমকাল: দুই দেশের এ মানসিক দূরত্বের মধ্যে রোহিঙ্গা সংকট কি সমস্যা আরও গভীর করেছে?
শিহাব উদ্দিন: রোহিঙ্গা সমস্যা বড় সংকট তৈরি করেছে বটে, কিন্তু এর মধ্যেই বাণিজ্যিক বাধা কাটানো সম্ভব। আমি তো মনে করি, বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি হলে মিয়ানমারের সঙ্গে যেমন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তৈরি হবে, তেমনি রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানও হতে পারে। বাণিজ্যিক সম্পর্ক বরং বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশল হতে পারে।
সমকাল: এ কৌশলটা কেমন হতে পারে?
শিহাব উদ্দিন: মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের অবিশ্বাসের একটি বড় কারণ হলো পরস্পর সম্পর্কে অজ্ঞতা। আমরা মিয়ানমার সম্পর্কে খুব কম জানি, আর মিয়ানমারের সাধারণ মানুষও বাংলাদেশ সম্পর্কে খুব সীমিত ধারণা রাখে। এই তথ্যের শূন্যতা পূরণ হয়েছে ভুল তথ্য এবং ভুল ধারণা দিয়ে। আমরা একে অপরকে বাস্তব তথ্য দিয়ে নয়, বরং একটি সংকীর্ণ ন্যারেটিভ দিয়ে দেখি।
বাংলাদেশে মিয়ানমারকে দেখা হয় রোহিঙ্গা সমস্যার দৃষ্টিকোণ থেকে, আর মিয়ানমারে বাংলাদেশকে দেখা হয় রোহিঙ্গাদের উৎস হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি দুই দেশের মানুষের মধ্যে একটি মানসিক দেয়াল তৈরি করেছে, যা রাজনৈতিক সীমান্তের চেয়েও অনেক শক্ত। এই মানসিক দেয়াল ভাঙলে যে কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে।
সমকাল: ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাও কি দুই দেশের সম্পর্ক কিংবা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাধা নয়?
শিহাব উদ্দিন: হ্যাঁ, মিয়ানমারের ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর কিছুটা হলেও বাংলাদেশ-মিয়ানমার বাণিজ্য প্রভাবিত হয়েছে, তবে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত। মূলত বাণিজ্যের বড় ধাক্কাটি এসেছে রাখাইন অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে। এ অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার ফলে সীমান্তভিত্তিক বাণিজ্য কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং আমাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দরও দীর্ঘ সময় বন্ধ রয়েছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক পর্যায়েও কিছু সিদ্ধান্ত বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে, শেখ হাসিনা সরকারের শেষ দিকে মিয়ানমারে বাংলাদেশের দূতাবাসের কমার্শিয়াল উইং বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত–যা পরে বাস্তবায়িত হয়েছে– দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য যোগাযোগ ও সমন্বয়কে দুর্বল করেছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, সীমান্ত পরিস্থিতির অবনতি এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত–এ তিনটি কারণ মিলেই বাংলাদেশ-মিয়ানমার বাণিজ্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত করেছে।
সমকাল: মিয়ানমারের ওপর তো নিষেধাজ্ঞা আছে। সেটি পারস্পরিক ব্যবসার ক্ষেত্রে কতটা প্রতিবন্ধক?
শিহাব উদ্দিন: কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা হলে ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করা যায় না। ব্যাংকে এলসি খোলা যায় না। কিন্তু পৃথিবীব্যাপীই এমন দেশের সঙ্গে ব্যবসা হয়। যেমন বাংলাদেশ ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করছে অনেক বছর ধরে। বিকল্প লেনদেনের অনেক উপায় আছে। সদিচ্ছা থাকলে এটি কোনো সমস্যা না। মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের সংকটটা সেখানেই। বাংলাদেশ বাণিজ্য করতে চায়নি, মিয়ানমারও ব্যবসার চিন্তাই করেনি। এখন তো সীমান্ত অস্থিতিশীল হয়ে গেছে।
সমকাল: আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণের কথা বলছেন?
শিহাব উদ্দিন: আমি মূলত রাখাইন অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতিকে বোঝাচ্ছি। সেখানে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সক্রিয়তার কারণে মিয়ানমার সরকার বা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ খুবই সীমিত। এই পরিস্থিতির কারণে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের অনুকূল স্থিতিশীলতা ও সমন্বয় বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব আমাদের সীমান্তভিত্তিক বাণিজ্যের ওপর পড়ছে, বিশেষ করে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে। তবে এটাও উল্লেখযোগ্য যে, এ ধরনের পরিস্থিতির মধ্যেও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় না; বরং বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে নিয়ে অনেক সময় তা সীমিত আকারে হলেও চালু থাকে।
সমকাল: কীভাবে তারা বাণিজ্য করছে?
শিহাব উদ্দিন: একটি বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে আলাদা করে বোঝা দরকার, মিয়ানমারের সঙ্গে সামগ্রিক বাণিজ্য এবং রাখাইন রাজ্যের সীমান্তভিত্তিক বাণিজ্য এক জিনিস নয়। মিয়ানমারের সীমান্ত বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় অংশ হয় চীনের সঙ্গে শান স্টেট দিয়ে এবং থাইল্যান্ডের সঙ্গে মিয়াওয়াডি সীমান্ত দিয়ে। এ রুটগুলো মিয়ানমারের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব সীমান্ত রুটে প্রায়ই সামরিক বাহিনী ও বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। তা সত্ত্বেও ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বাস্তবতার আলোকে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে কোনো না কোনোভাবে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, সীমান্তভিত্তিক বাণিজ্য মূলত রাখাইন রাজ্যের সীমান্ত দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে, যা ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে কাছের এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রুট। কিন্তু বর্তমান সংঘাতমূলক পরিস্থিতি এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণের কারণে এই অংশ এখন প্রায় স্থবির হয়ে গেছে। তবে এটিই পুরো চিত্র নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়নি–ইয়াঙ্গুন সমুদ্রবন্দরসহ অন্যান্য বিকল্প চ্যানেলের মাধ্যমে এখনও সীমিত আকারে বাণিজ্য চলছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, রাখাইন সীমান্তের বাণিজ্য বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি; বরং তা রুট পরিবর্তন করে আংশিকভাবে অব্যাহত রয়েছে।
সমকাল: তার মানে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা চাইলে বাণিজ্য চলতে পারে। আপনি বাংলাদেশ-মিয়ানমার চেম্বার অব কমার্স-বিএমসিসির ভাইস প্রেসিডেন্ট, আপনাদের সংগঠনের পক্ষ থেকেও কি এই ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখা যায়?
শিহাব উদ্দিন: অতি সম্প্রতি গঠিত বিএমসিসি মূলত দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংযোগ, তথ্য বিনিময় এবং সহযোগিতা বাড়ানোর একটি প্ল্যাটফর্ম। এখানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয় দেশের ব্যবসায়ীরা যুক্ত আছেন এবং আমরা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছি। আমরা রাখাইনের বাইরে বিকল্প রুট ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে পারি;
যেমন–ইয়াঙ্গুন পোর্ট থেকে চট্টগ্রাম পোর্ট, দাওয়েই পোর্ট থেকে চট্টগ্রাম পোর্ট, সিত্তে পোর্ট থেকে চট্টগ্রাম পোর্ট। এভাবে মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চল ও সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালনা করা সম্ভব। বিএমসিসি এ ক্ষেত্রে একটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংযোগ তৈরি, সম্ভাব্য বাণিজ্য রুট ও সুযোগ সম্পর্কে তথ্য প্রদান এবং একই সঙ্গে দুই দেশের সরকারসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে এ রুটগুলোকে আরও কার্যকর ও সহজতর করার জন্য কাজ
করতে পারে।
সমকাল: মিয়ানমারে বাংলাদেশের কোন কোন পণ্য যেতে পারে?
শিহাব উদ্দিন: বাংলাদেশ দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব ধরনের পণ্য উৎপাদন করে–সিমেন্ট, সিরামিক, মেলামাইন, প্লাস্টিক পণ্য, ব্যাটারি, টেক্সটাইল, নির্মাণসামগ্রীসহ অনেক কিছু। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এসব পণ্যের কিছু অংশ মিয়ানমারে রপ্তানিও করছে। মিয়ানমার এ ধরনের পণ্যের বড় অংশ চীন থেকে আমদানি করে। কিন্তু চীন থেকে রাখাইন পর্যন্ত পণ্য পরিবহনের খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি। এই বাস্তবতা বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেবে। আরও অনেক বিষয় আছে।
সমকাল: যেমন?
শিহাব উদ্দিন: আমরা প্রত্যাশা করি, মিয়ানমার বর্তমান সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি একসময় কাটিয়ে উঠবে এবং তখন সেখানে বড় আকারের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হবে। এই পুনর্গঠনের জন্য অবকাঠামো, নির্মাণসামগ্রী, গৃহস্থালি পণ্য, বিদ্যুৎ সরঞ্জামসহ দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন উপকরণের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হবে। এই চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এটি শুধু স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যের সুযোগ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিও তৈরি করতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা খাতেও বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা মিয়ানমারের তুলনায় তুলনামূলকভাবে উন্নত, বিশেষ করে ওষুধ উৎপাদন,
চিকিৎসাসেবা এবং দক্ষ মানবসম্পদের ক্ষেত্রে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প মিয়ানমারের বাজারে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ওষুধ রপ্তানি করছে।
এই সম্ভাবনাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ আছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রও গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে একদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণ হবে, অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী রাখাইন অঞ্চলের মানুষের জন্যও সহজলভ্য ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবার সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশ চাইলে নিজেকে একটি আঞ্চলিক স্বাস্থ্যসেবা হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, যা ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও মানবিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করবে।
সমকাল: আমাদের ব্যবসায়ীরা কি সেখানে বিনিয়োগ করতে পারেন?
শিহাব উদ্দিন: বিনিয়োগের চেয়েও বাণিজ্যিক আমদানি-রপ্তানি বেশি কার্যকর হতে পারে। তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশের গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরা চাইলে সেখানে পোশাক কারখানা করতে পারেন। কারণ মিয়ানমার এখনও ইউরোপের জিএসপি সুবিধা পাচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ সুবিধা হারাবে। মিয়ানমারে বর্তমানে যে পোশাক কারখানা আছে, সেগুলোর অধিকাংশেরই মালিক চীনা ব্যবসায়ীরা।
সমকাল: বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়েই বিমসটেকের সদস্য। এ ক্ষেত্রে বিমসটেক বাণিজ্য সম্প্রসারণে কাজ করতে পারে কিনা?
শিহাব উদ্দিন: বিমসটেক হলো বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন বা বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বহু খাতভিত্তিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতামূলক উদ্যোগ। কিন্তু বিমসটেক অতটা কার্যকর প্রতিষ্ঠান নয় যে এটি বাণিজ্যিক সম্পর্কে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বব্যাপী আমরা দেখছি বহুপক্ষীয় থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বেশি কার্যকর। সে জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমাদেরই উদ্যোগী হতে হবে।
সমকাল: মিয়ানমারে চীন ও ভারতের শক্তিশালী বাণিজ্যিক উপস্থিতি আছে। বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণে তা কতটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে?
শিহাব উদ্দিন: মিয়ানমারে চীন ও ভারতের বিনিয়োগ আছে, বড় আকারের বাণিজ্য আছে। তারপরও আমি মনে করি না, এটি বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাধা হবে। বাংলাদেশকে কেবল কথা ও কাজে মিল রাখতে হবে। পণ্য নির্বাচনে কৌশলী হতে হবে। তাহলে প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ ভালো করবে। আরেকটা বিষয় শুরুতেই বলেছি, আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে চাল-ডাল ইত্যাদির যে প্রয়োজন, সেগুলো সহজে আমদানি করতে মিয়ানমার ভরসার জায়গা হতে পারে।
সমকাল: বাংলাদেশ-মিয়ানমার বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে সরকারের প্রতি কোনো পরামর্শ আছে?
শিহাব উদ্দিন: প্রথম কথা হলো, এই বাণিজ্যিক সম্পর্কে বাংলাদেশ বেশি লাভবান হবে। মিয়ানমার সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। মিয়ানমারে তেল-গ্যাসসহ প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব নেই। আমাদের উচিত হবে, সেখানকার ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে দুই দেশের বাণিজ্য সম্ভাবনা তাদের বোঝানো। বিএমসিসির তরফ থেকে আমরাও এ বিষয়ে উদ্যোগ নিচ্ছি।
সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
শিহাব উদ্দিন: আপনাকেও ধন্যবাদ। সমকালের জন্য শুভকামনা।