1. shahajahanbabu@gmail.com : admin :
নারীর প্রতি কেন বিদ্বেষপূর্ণ ভাষা - Pundro TV
বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ অপরাহ্ন



নারীর প্রতি কেন বিদ্বেষপূর্ণ ভাষা

অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬

যুগে যুগে এ দেশে দেশজুড়ে ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হওয়া আমাদের ধর্মীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ওয়াজে শোনা যায়, নারীদের নিয়ে অবমাননাকর, সীমাবদ্ধ ও নেতিবাচক বক্তব্য বারবার আলোচনায় আসছে। এ ওয়াজগুলোতে ধর্মের নামে নারীকে ছোট করে দেখা, তাদের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা- এসব বক্তব্য নারীদের মধ্যে তৈরি করছে ক্ষোভ, হতাশা ও প্রতিবাদের ভাষা। এ প্রসঙ্গে সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারীরা এসব বক্তব্য নিয়ে কী ভাবছেন- তা নিয়েই এ প্রতিবেদন।

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেহরিম তাসমিম মনে করেন, ‘ধর্ম কখনই নারীকে ছোট করে না, বরং কিছু বক্তা নিজেদের ব্যাখ্যাকে ধর্মের নামে চালিয়ে দেন। আমরা যখন শুনি ‘নারীই সব ফিতনার মূল’, তখন মনে হয়- আমাদের পরিচয় কি শুধুই সমস্যা তৈরি করা?’ তার মতে, ধর্মীয় আলোচনায় নারীর সম্মান ও মর্যাদা তুলে ধরা উচিত, ভয় বা নিয়ন্ত্রণ নয়।

গৃহিণী সালমা আক্তার কলি বলেন, ‘ওয়াজে বলা হয়, নারী ঘরের বাইরে গেলে সমাজ নষ্ট হয়। কিন্তু বাস্তবে তো নারীই পরিবার চালায়, সন্তান বড় করে, অনেক সময় অর্থনৈতিক দিকেও সাহায্য করে। তাহলে আমাদের অবদানকে কেন অস্বীকার করা হয়?’ তিনি মনে করেন, এমন বক্তব্য নারীদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং পরিবারেও তাদের অবস্থান দুর্বল করে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রুকাইয়া হোসাইনের প্রশ্ন, ‘যখন কোনো সামাজিক সমস্যা হয়, তখন কেন শুধু নারীদের পোশাক বা আচরণকে দায়ী করা হয়? পুরুষদের দায়িত্ব কোথায়?’

তিনি বলেন, ‘ধর্ম যদি নৈতিকতা শেখায়, তাহলে সেই শিক্ষা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই হওয়া উচিত। একপাক্ষিকভাবে নারীদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা আসলে অন্যায়।’ ধর্মে যেমন নারীর জন্য পর্দার করার কথা বলা আছে, তেমনি কিন্তু পুরুষের চোখের পর্দার বিধানও রয়েছে কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি ফতোয়ায় শুধু নারীর কথা উঠে আসে, পুরুষেরটা থাকে

আড়ালেই।

স্কুলশিক্ষিকা ফারহানা মোবিন জানান, ‘ছোট মেয়েরা যখন এসব বক্তব্য শোনে, তখন তারা নিজেদের নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগে। তারা ভাবতে শুরু করে, তারা যেন সব সমস্যার কারণ।’

তিনি বলেন, ‘এটা শুধু ধর্মীয় বিষয় নয়, এটা মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও জড়িত। একজন শিশুর আত্মসম্মান গড়ে ওঠার সময় যদি তাকে বারবার দোষী করা হয়, তাহলে তার ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

উদ্যোক্তা নুসরাত জাহান মনি মনে করেন, ‘ওয়াজ মাহফিল একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। এখানে যদি নারীর সম্মান, শিক্ষা, অধিকার নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়, তাহলে সমাজ অনেক দ্রুত বদলাতে পারে।’ তার মতে, ‘ধর্মের আলোচনায় ভয় দেখানো বা দমন নয়, বরং সহমর্মিতা ও ভারসাম্য থাকা জরুরি।’

বর্তমানে অনেক নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বক্তব্যের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন। কলেজছাত্রী ইশরাত জাহান বলেন, ‘আগে আমরা চুপ থাকতাম। এখন অন্তত নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারি। এটা একটা পরিবর্তন।’ তবে তিনি এটাও বলেন, ‘প্রতিবাদ করলেই অনেক সময় ‘ধর্মবিরোধী’ তকমা দেওয়া হয়, যা খুবই আপত্তিকর।’ ফ্রিল্যান্সার রাফা রহমান যোগ করেন, ‘আমি দেখি অনেক নারী অনলাইনে প্রতিবাদ করছে, কিন্তু বাস্তবে তাদের অনেকেই ভয় পাচ্ছেন।

আমাদের সুরক্ষা ও সমর্থন চাই- তাহলেই আমরা মন খুলে বলতে পারব।’ এ ছাড়া সরকারি কর্মচারী নীলা আক্তার বলেন, ‘ওয়াজে যদি নারীর সম্মান বজায় রাখা হয়, তা শুধু নারীর জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য শিক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।’

সবাই একমত- ধর্মীয় আলোচনায় নারীদের নিয়ে নেতিবাচক, বিদ্বেষমূলক ভাষা পরিহার করা উচিত। নারীরা চান, তাদের সমস্যা নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হোক। মেহরিমের কথায়, ‘আমরা ধর্মকে ভালোবাসি, সম্মান করি। কিন্তু সেই ধর্মের নামে যদি আমাদের অপমান করা হয়, তাহলে সেটা মেনে নেওয়া কঠিন।’

পরিশেষে এইটাই বলা যায়, ওয়াজ মাহফিল সমাজে প্রভাব বিস্তারের একটি বড় মাধ্যম। এই মঞ্চ থেকে যদি নারীর প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা ও ন্যায্যতা শেখানো হয়, তাহলে তা সমাজকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। কিন্তু এর পরিবর্তে যদি সেখানে নারী বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আসলে তা কেবল বিভাজনই তৈরি করবে। আজকের নারীরা আর নীরব দর্শক নন- তারা প্রশ্ন করছেন, মত দিচ্ছেন এবং সম্মানজনক জায়গা দাবি করছেন। সমাজ ও ধর্মীয় আলোচনাও সময়ের সঙ্গে বদলাবে- এটাই তাদের প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২
Developed By ATOZ IT HOST