1. shahajahanbabu@gmail.com : admin :
শিক্ষামন্ত্রী কি মনোযোগ দেবেন? - Pundro TV
বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:২৫ অপরাহ্ন



শিক্ষামন্ত্রী কি মনোযোগ দেবেন?

অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬

মামুনুর রশীদ

 প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১২ | আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৩

শিক্ষার ক্রমাবনতি ও বিপর্যয় নিয়ে পত্রপত্রিকায়, সেমিনারে উদ্বেগ প্রকাশ করে ক্লান্ত হয়ে একপর্যায়ে টেলিভিশনের জন্য মোটামুটি একটি দীর্ঘ ধারাবাহিক নাটক নির্মাণ করলাম। সেটি প্রচারিতও হলো। এমন সময়ে প্রচার হলো যখন দেশে শিক্ষা, শিল্প-বিজ্ঞান কোনো কিছুই আর আলোচনার বিষয় নয়, বিষয় একটাই–রাজনীতি। মানুষ একটা শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক পরিবেশে বসবাস করছিল।

টেলিভিশনের কোনো অনুষ্ঠান দর্শকদের আকর্ষণ করতে পারছিল না, একমাত্র সংবাদ ছাড়া। আকর্ষণের বিষয় হচ্ছে ফেসবুক ও ইউটিউবের যথেচ্ছাচার। এর মধ্যে কিছু ইউটিউব এবং ফেসবুকে ভিউ-বাণিজ্য। এই ভিউ-বাণিজ্যের অধিকাংশ হয়ে থাকে অশ্লীলতার কারণে। এর মধ্যেও দর্শকদের শিক্ষার মান খুব সহজেই প্রতিফলিত হয়।

ধারাবাহিকটিতে চেষ্টা করেছিলাম প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক, ম্যানেজিং কমিটি, আমলাতন্ত্র এবং এলাকার সৎ ও দুর্নীতিবাজ মানুষ, সেই সঙ্গে কৃষক এবং রাজনীতিবিদের চরিত্র তুলে আনার জন্য। দেশে যখন একটি টিভি চ্যানেল ছিল, তখনও প্রযুক্তির এত উন্নতি হয়নি, দর্শক নাটক দেখে মগ্ন হয়ে থাকত নাটকের বিষয়বস্তু নিয়ে।

সরাসরি আমাদের তাদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো, প্রশ্নগুলো সাধারণত নাটকের অন্তর্নিহিত বক্তব্য নিয়ে। কিন্তু এখন ওসবের বালাই নেই, নাটক মানেই বিনোদন, শুধুই বিনোদন। অর্থহীন বিনোদন। অবশ্য দু-চারটে ভালো নাটক যে হয় না তা নয়। সেগুলো কখনোই ভিউ-বাণিজ্যের প্রয়োজন মেটায় না। শিক্ষার দায়টা শুধু কি সরকারের, নাকি শিক্ষা বিভাগের, শিক্ষক-অভিভাবকদের এবং এলাকার মানুষদের? আমি গ্রামের একটি স্কুলে পড়েছি, যেখানে নিরক্ষর মানুষের সংখ্যাই বেশি ছিল। ওই নিরক্ষর অভিভাবকরা তাদের ছেলেমেয়েদের মানুষ করার জন্য এই স্কুলের প্রতি খুবই মনোযোগী ছিলেন।

একবার স্কুলের হেডমাস্টারের সঙ্গে ম্যানেজিং কমিটির সেক্রেটারির দ্বন্দ্ব হয়। হেডমাস্টার পদত্যাগ করে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সময়টা ছিল বর্ষাকাল। ছাত্ররা ঘাটে এসে অশ্রুজলে শিক্ষককে বিদায় জানায়। ছাত্ররা এতই ব্যথাতুর হয় যে প্রথম পিরিয়ডে কেউ ক্লাসে যায় না, নদীর তীরেই দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎ দেখা গেল শতেকখানি নৌকা তীব্র বেগে গিয়ে হেডমাস্টারের নৌকাটাকে ঘিরে ফেলে, সবাই সমস্বরে তাঁর কাছে ক্ষমা চায় এবং স্কুলে ফিরে আসতে বলে।

হেডমাস্টার সাহেব ফিরে আসেন। সেখানে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সেক্রেটারিও দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনিও ক্ষমা চান। হেডস্যার স্কুলে গিয়ে বসেন। তাঁর অবসরে যাওয়ার দিন পর্যন্ত ওই স্কুলেরই তিনি হেডমাস্টার ছিলেন এবং স্কুলের জন্য অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এবং তাঁর পেছনে ছিলেন এলাকার অভিভাবক, শিক্ষকেরা।

তখনকার দিনে বিজ্ঞানের শিক্ষক বা ‘বিএসসি শিক্ষক’ পাওয়া খুব কঠিন ছিল। এলাকাবাসী নিজেরাই বের হতো বিএসসি স্যার খুঁজতে। শিক্ষকরা পরীক্ষার আগে রাতে হারিকেন বা টর্চ লাইট নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন, ছাত্রদের পড়ালেখার কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা দেখতেন এবং এক ধরনের ভ্রাম্যমাণ প্রাইভেট টিউটর হিসেবে কাজ করতেন। মেট্রিক পরীক্ষার আগে তিন মাস বিনামূল্যে প্রাইভেট পড়াতেন, স্কুলেই প্রাইভেট পড়ানোর বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। শিক্ষা যেন একটা উৎসবের মতো ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত। ফাইনাল পরীক্ষার পর ফলাফল ঘোষিত হতো এবং স্কুলের প্রথম দিন সেটিও একটা উৎসব।

কোনো শিক্ষক যে দুর্নীতি করতে পারেন বা কোনো অসদাচরণের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন, এটা আমাদের কল্পনার মধ্যেই আসত না। কিন্তু আজকাল দেখা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে মাদ্রাসা, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকরা নানাভাবে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। শিক্ষকদের নিয়োগ বাণিজ্য একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। সরকারি প্রাথমিক স্কুলের চাকরির জন্য প্রার্থীরা লাখ লাখ টাকা খরচ করে থাকেন। এমনকি এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজে শিক্ষকরা একটি চাকরির জন্য লক্ষাধিক টাকা ঘুষ দিতে প্রস্তুত থাকেন। রাজনৈতিকভাবে নিয়োজিত ম্যানেজিং কমিটি এই অসাধু চক্রের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত হয়ে যায়।

এর মধ্যে আছে কিছু কোচিং ব্যবসায়ী। একেবারে স্বল্প আয়ের মানুষগুলো তাদের সন্তানদের স্কুলে পড়াতেই পারেন না। কারণ কোচিংয়ের টাকা দেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। কোচিং সেন্টারগুলো স্কুলের সমান্তরালে চলে। এর মধ্যে ব্যতিক্রমী শিক্ষক যে একেবারে নেই তা নয়। কিন্তু তারা নানাভাবে কোণঠাসা। স্কুলের ওপর সরকারি প্রশাসন মানে থানা শিক্ষা কর্মকর্তা, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং তাদের অফিসের কর্মচারীরাও স্কুলের উন্নয়ন কার্যক্রম, শিক্ষকদের বদলি এবং যেখানেই অর্থকড়ির বিষয় আছে, তারা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। এই দুর্নীতি আবার সীমাহীন। এর সীমানা একেবারেই কেন্দ্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সচিবালয় পর্যন্ত বিস্তৃত।

আমি যে স্কুলে পড়ালেখা করেছি, সেটি ছিল লম্বা টিনশেড ভবন। বহু বছর পরে স্কুলের শতবর্ষ পূর্তিতে গিয়ে দেখলাম স্কুলটি দালান হয়েছে। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই দালানটির বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। একদা স্কুলের সামনে একটি খেলার মাঠ ছিল, মাঠের পরে একটি খাল এবং স্কুলের পেছনেই আরেকটি খাল ছিল এবং নানা ধরনের গাছপালায় পরিপূর্ণ ছিল। আমি দেখলাম সামনের ও পেছনের খাল দুটো ভরাট করে দেওয়া হয়েছে, গাছপালা নেই, শুধু দালানটি দাঁড়িয়ে আছে।

শিক্ষা প্রশাসনের জন্য যে কাঠামো আছে তা খুবই ত্রুটিপূর্ণ। এই প্রশাসনে অবশ্যই শিক্ষকদের থাকা দরকার। সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ কোথাও কাম্য নয়। পাশ্চাত্য দেশগুলোতে এলাকাভিত্তিক শিক্ষার প্রশাসনিক কাঠামো আছে, যারা সাধারণত শিক্ষক এবং বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। সরকারের সঙ্গে তাদের যোগসূত্র ন্যূনতম। সরকার অবকাঠামো এবং স্কুলের ছাত্র-শিক্ষকদের ভালো-মন্দের জন্য যা করা দরকার, শুধু তা করবে।

আমাদের দেশে অর্থের দারিদ্র্যের চাইতেও মানসিকতার দারিদ্র্য প্রবল। একটি উদার অসাম্প্রদায়িক এবং একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করলে একটা সুষম সমাজ গড়ে উঠতে পারে। সরকারি স্কুল, প্রাইভেট স্কুল, ইংরেজি স্কুল, মাদ্রাসা–এ সবকিছু এতগুলো ভিন্ন ব্যবস্থাপনায় গড়ে উঠেছে যে জাতীয় ঐকমত্যের প্রয়োজন হলে তা কখনোই সম্ভব হবে না। কাজটি নিঃসন্দেহে কঠিন। অন্তত এই একটি জায়গায় সকল রাজনৈতিক দল ও মতের মানুষকে এক করার কোনো চেষ্টা আজ পর্যন্ত হয়নি, হলে হয়তো এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া যেত।

যেসব শিক্ষক সৎ ও যোগ্য, তাদের নানাভাবে সম্মান দেওয়া উচিত এবং আমলাতান্ত্রিক কাঠামো একেবারেই অপসারণ করা উচিত। বর্তমান কাঠামোতে শিক্ষকরা এক ধরনের সুবিধাবাদীতে পরিণত হয়েছেন, যার ফলে তাঁর আত্মরক্ষাটাই প্রধান। এ অবস্থা থেকে শিক্ষকদেরও মুক্তি প্রয়োজন। শিক্ষকদের বেতন কাঠামো বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। যাতে শিক্ষকতা করে তারা একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারেন। তা না হলে কোচিংয়ের নামে শিক্ষা ব্যবসাটাই রমরমা হয়ে উঠবে।
বর্তমানে যিনি শিক্ষামন্ত্রী, তাঁকে এক সময়ে খুবই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে। তিনি কি এবারও আগের চাইতে আরও বেগবান হয়ে কিছু গুরুতর সমস্যার সমাধান করবেন, যাতে আমাদের শিশুরা শুধু সার্টিফিকেটধারী শিক্ষার্থী হবে না, খাঁটি মানুষ হয়ে বের হবে।

মামুনুর রশীদ: নাট্যব্যক্তিত্ব

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২
Developed By ATOZ IT HOST