ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে ভয়ানক সংকটের কবলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার। নতুন করে শ্রমিক পাঠানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে নজর দিচ্ছে সরকার। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, জাপান, সিঙ্গাপুরসহ আশপাশের দেশে নতুন শ্রমবাজার কীভাবে উন্মুক্ত করা যায়, চলছে সেই চেষ্টা।
বাংলাদেশ থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমিক গ্রহণকারী দেশ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে বন্ধ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েও খুলতে পারেনি দেশটির শ্রমবাজার। বর্তমান সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষ করে সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচির মধ্যেও রয়েছে বিষয়টি।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ২০২২-২৪ মেয়াদে ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭২ জন শ্রমিক পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের ১ জুন মালয়েশিয়া সরকার সব সোর্স কান্ট্রি থেকে কর্মী নিয়োগ বন্ধ রাখে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ছাড়া ফের সব সোর্স কান্ট্রি থেকে কর্মী নিয়োগ শুরু করেছে দেশটি।
কিন্তু বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের বিবদমান দুই পক্ষের বিরোধের কারণে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলা সম্ভব হয়নি।সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলেন, জনশক্তি রপ্তানি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের একটি অংশকে রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে দূরে রাখার চেষ্টা চলছে, যা দেশ ও দেশের জনশক্তি রপ্তানির জন্য বড় ক্ষতির কারণ। যারা উদ্যোক্তা বা যারা কাজ আনতে পারেন, তাদের জনশক্তি রপ্তানির লক্ষ্যে দ্রুত কাজে লাগানো জরুরি। তারা আরও জানান, যে কোনো দেশে জনশক্তি রপ্তানির জন্য একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে লোক পাঠাতে হবে।
বিগত ধাপে মালয়েশিয়া সরকার কলিং ভিসা দিয়েছে, শ্রমিক নেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে, বাংলাদেশের মন্ত্রণালয় নিয়োগানুমতি ও বিএমইটি ছাড়পত্র দিয়েছে। সরকার প্রয়োজনীয় ট্যাক্স নিয়েছে। দুই দেশের সব ধরনের অনুমোদনের ভিত্তিতে শ্রমিকরা মালয়েশিয়ায় গিয়েছেন। এই প্রক্রিয়া মেনে শ্রমিক পাঠানোর কারণে কারও সাজা হলে, এটা প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, ‘আগের প্রক্রিয়াটা ভুল ছিল।’ আগের প্রক্রিয়া যদি ‘ভুল’ প্রমাণিত হয়, তাহলে সরকার যে অনুমতি দিয়েছে তাদের কাজও ভুল প্রমাণিত হবে।
দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে বিষয়টি আসবে যে, ‘বাংলাদেশ সরকার শ্রমিক প্রেরণে অবৈধ কাজ করেছে; এখানে অর্থ ও মানব পাচার হয়েছে।’ তাহলে অপরাধী কারা? অবশ্যই দুই দেশের সরকার। এতে শুধু মালয়েশিয়ায় নয়; অন্যান্য দেশেও বাংলাদেশের শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ যারা আমাদের শ্রমিক নেয়, তারা শ্রমিক নিতে রাজি হবে না।
এ ছাড়া টিআইপি র্যাংকিংয়ে আমরা আরও পিছিয়ে যাব। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর কারণে কোনো লাইসেন্স মালিকের বিরুদ্ধে সাজা হলে অন্য কোনো লাইসেন্সকেও ক্লিয়ারেন্স দিতে পারবে না। এসব কারণে আগামী দিনগুলোতে মালয়েশিয়ার শ্রমিক পাঠানো বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ একটি মামলায় সাজা হলেই মানব পাচার ও অর্থ পাচারের বিষয়টি প্রমাণিত হয়ে যাবে।
যদি এটা প্রমাণিত হয়, তাহলে মালয়েশিয়ার টিআইপিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। তখন মালয়েশিয়া চাইলেও বাংলাদেশের শ্রমিকদের ভিসা দিতে পারবে না। কে আওয়ামী লীগ, কে বিএনপি, কে কোন দলেরসমর্থক—সেটা মালয়েশিয়া সরকার দেখবে না; তারা দেখবে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়ে তাদের টিআইপি র্যাংকিং নিচে নেমে গেছে।