হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে টিকা না নেওয়া প্রাপ্তবয়স্করাও এতে আক্রান্ত হতে পারেন। উন্নত দেশগুলোতে টিকাদানের মাধ্যমে এই রোগ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এলেও বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে এখনও এটি একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু এলাকায় হামের পুনরুত্থান লক্ষ্য করা গেছে, যা উদ্বেগজনক।
এই বছরও অনেকগুলি জেলায় এটি ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রাজশাহী ও ময়মনশিংহে এটি খুব বেশী ছড়িয়েছে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে হাম জটিলতায় ৪০ এর অধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
হামের প্রাদুর্ভাব: বাংলাদেশে ইপিআই টিকা দান চালু হওয়ার পর হামের প্রকোপ অনেক কমে যায়। তবেÑ
টিকাদানে ঘাটতি
দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা সীমাবদ্ধতা
জনসচেতনতার অভাব
শহরের বস্তি এলাকায় অতিরিক্ত জনসংখ্যা। এসব কারণে এখনও বিক্ষিপ্ত প্রদুর্ভাব দেখা যায়। বিশেষ করে: দূরবর্তী গ্রামাঞ্চলে, নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীতে ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে (কক্সবাজার) হামের ছোট-বড় প্রাদুর্ভাব নিয়মিত রিপোর্ট হয়।
হামের কারণ : হাম রোগের কারণ হলো মিজেলস্ ভাইরাস যা প্যারামিক্সোভাইরিডাই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।
সংক্রমণের উপায়:
আক্রান্ত বাচ্চার বা ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়
বাতাসে ভাসমান ড্রপলেট দ্বারা সংক্রমণ হয়
সরাসরি সংস্পর্শেও হতে পারে
এই ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামকÑএকজন আক্রান্ত ব্যক্তি প্রায় ৯০% সাসিপটিবল্ মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
রোগের বিস্তার ও সংক্রমণকাল:
ইনকিউবিশন পিরিয়ড: ১০-১৪ দিন
সংক্রমণ ছড়ায়: র্যাশ ওঠার ৪ দিন আগে থেকে ৪ দিন পরে পর্যন্ত
এ কারণে রোগ ছড়ানো খুব দ্রুত হয়।
হামের লক্ষণ-
প্রাথমিক লক্ষণ:
জ্বর (১০১-১০৪º)
কাশি
নাক দিয়ে পানি পড়া
চোখ লাল হওয়া বা কনজাংটিভাইটিস
বিশেষ লক্ষণ:
কপলিক স্পট বা মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ।
৩-৫ দিন পর সারা শরীরে লাল র্যাশ। র্যাশ সাধারণত মুখ থেকে শুরু হয়ে নিচের দিকে ছড়ায় আর তা ৫-৬ দিনে মিলিয়ে যায়।
হামের জটিলতা : হাম সাধারণত অন্য ভাইরাস জ্বরের মত নিজেই ভাল হলেও অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে।
সাধারণ জটিলতা:
নিউমোনিয়া – সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর কারণ এই ফুসফুস সংক্রমণ।
ডায়রিয়া
মধ্যকর্ণের সংক্রমণ
গুরুতর জটিলতা:
এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ)
এসএসপিই- বিরল কিন্তু মারাত্মক
অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে অন্ধত্ব, যা ভিটামিন এ কমে যাওয়ার কারনে হয়
ঝুঁকিপূর্ণ গ্রুপ:
৫ বছরের নিচের শিশু
অপুষ্ট শিশু
ইমিউনো-কমপ্রোমাইজড রোগী যেমন- ক্যান্সার, কেমো বা রেডিও থেরাপী দেয়া রুগী
গর্ভবতী নারী
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জটিলতার গুরুত্ব: বাংলাদেশে অপুষ্টি একটি বড় সমস্যা। ফলে হামের রোগীদের মধ্যে জটিলতা বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে-
ভিটামিন -এ এর অভাব
দেরিতে হাসপাতালে আসা
গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসা সুবিধার অভাব, সঠিক সময়ে ভেন্টিলেটর সুবিধার অভাব, এসব কারণে মৃত্যুহার বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করেছে।রোগ নির্ণয়:
রোগের ইতিহাস ও লক্ষণ দেখে অর্থাৎ ক্লিনিক্যাল ভিত্তিতে:
জ্বর + র্যাশ + কাশি/কনজাংটিভাইটিস
ল্যাব টেস্ট: তেমন একটা দরকার হয় না। বাংলাদেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোসিস করা হয়। তবে জটিলতা নির্ণয়ের জন্য কয়েকটি পরীক্ষার দরকার হয়।
মিজেলস আইজি এম এন্টিবডি, পিসিআর। সিবিসি, সিআরপি, বুকের এক্সরে, অক্সিজেন স্যাচুরেশন। চিকিৎসা : হামের নির্দিষ্ট কোনো এন্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। মূলত সাপোর্টিভ কেয়ার দেওয়া হয়।
১. সাধারণ চিকিৎসা: পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল খাবার, জ্বর কমানোর ওষুধ প্যারাসিটামল।
২. ভিটামিন এ- ৬-১১ মাস: ১,০০,০০০ আইইউ, ≥১২ মাস: ২,০০,০০০ আইইউ (২ দিন) এটি জটিলতা ও মৃত্যুহার কমায়।
৩. জটিলতা অনুযায়ী চিকিৎসা: নিউমোনিয়া হলে এন্টিবায়োটিক, ডায়রিয়া ওআরএস ও জিংক, এনসেফালাইটিস হলে বিশেয়ায়িত চিকিৎসা দরকার হয়।
৪. আইসোলেশন: রোগীকে আলাদা রাখা জরুরি।
প্রতিকার :
১. টিকাদান (সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি) বাংলাদেশের ইপিআই কর্মসূচিতে: ৯ মাসে এমআর টিকার ১ম ডোজ ও ১৫ মাসে ২য় ডোজ।
২. রোগী শনাক্তকরণ:দ্রুত রিপোর্ট করা, এখনকার মত প্রাদুর্ভাব হলে মাস ভ্যাক্সিনেশন।
৩. স্বাস্থ্যবিধি: কাশি-শিষ্টাচার, হাত ধোয়া।
৪. পুষ্টি: শিশুর পুষ্টি উন্নয়ন, ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টেশন ও হামের টিকা।
টিকার ধরন: এটি একটি লাইভ এটেনিউটেড টিকা।
কার্যকারিতা:
১ ডোজে-৮৫-৯৫% সুরক্ষা, ২ ডোজে >৯৭% সুরক্ষা
নিরাপত্তা: অত্যন্ত নিরাপদ, সামান্য জ্বর বা র্যাশ হতে পারে, বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি ইপিআই এর মাধ্যমে দেয়া হয়। এটি বিনামূল্যে দেয়া হয়। এখন সারা দেশে মাস ক্যাম্পেইন করা প্রয়োজন।
চ্যালেঞ্জ:
টিকা দিবে কিনা সন্দিহান বা কনফিউজড
গুজব
দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো
ভ্যাকসিন না নিলে ঝুঁকি
মারাত্মক জটিলতা:
মৃত্যু
দ্রুত ছড়িয়ে পড়া
একজন টিকা না নেয়া ব্যক্তি ছড়িয়ে পরার কেন্দ্র হতে পারে।
হামের বিরুদ্ধে জাতীয় ও বৈশ্বিক উদ্যোগ:
বাংলাদেশ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সহযোগিতায় হাম নির্মূল।
সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জ:
কোভিড ১৯ এর কারণে টিকাদান বিঘিœত
জনসচেতনতার অভাব
বস্থি এলাকায় বেশি সংক্রমণ
করণীয়-ব্যক্তিগত পর্যায়ে:
সময়মতো টিকা নেওয়া
অসুস্থ হলে আলাদা থাকা
পারিবারিক পর্যায়ে: শিশুর টিকাদান নিশ্চিত করা
সামাজিক পর্যায়ে:
সচেতনতা বৃদ্ধি
গুজব প্রতিরোধ
সবশেষে বলা যায়, হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে এখনও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সঠিক টিকাদান, পুষ্টি, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করলে এই রোগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সরকারের পাশাপাশি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। “একটি টিকাÑএকটি জীবন রক্ষা” এই ধারণাকে বাস্তবায়ন করলেই হামের মতো প্রাণঘাতী রোগ থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা সম্ভব।