হাদিস বা নবীজি (সা.)-এর কথামালা শুধু কথাই নয় বরং তা শরিয়তও। আমরা বিভিন্ন হাদিস থেকে জানতে পারি রসুল (সা.) বলেছেন, আমি নিয়মিত নামাজের আগে মিসওয়াক ছেড়ে দিয়েছি এ ভয়ে না জানি তা আল্লাহ উম্মতের ওপর ফরজ করে দেন আর আমার উম্মতের কষ্ট হয়ে যাবে। সালাতুত তারাবি সম্পর্কেও এ রকম বর্ণনা আছে।
হুজুর (সা.) বলেছেন, আমি নিয়মিত তারাবি পড়া ছেড়েছি এই ভয়ে যে তা উম্মতের ওপর ফরজ করে দেওয়া হবে। হজ সম্পর্কেও এ রকম একটি হাদিসের কথা মনে পড়ছে। একজন সাহাবি হজ নিয়ে খুঁটিনাটি প্রশ্ন করছিলেন। প্রশ্ন করতে করতে সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, হজ কি প্রতিবছরই ফরজ? এ প্রশ্ন শুনে নবীজি (সা.) অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ফেললেন। তিনি রাগ হয়ে বললেন, যদি আমি হ্যাঁ বলতাম তাহলে প্রতি বছরই হজ ফরজ হয়ে যেত। সুবহানাল্লাহ।
এমন অসংখ্য হাদিস প্রমাণ করে কোরআনের আয়াতের বাইরেও রসুল (সা.) এর কথা মুসলমানদের দলিলের উৎস। কিন্তু আজকাল একদল মানুষের আবির্ভাব হয়েছে যারা বলে, হাদিস মানা যাবে না। মানতে হবে কোরআন। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন কোরআনের আয়াত এবং হাদিস আওড়ে সেসব বন্ধু বলে কোরআনের বাইরে আর কারও কথা মানার সুযোগ নেই। উদাহরণস্বরূপ সুরা বাকারার ৭৯ নম্বর আয়াতটি দেখুন।
আল্লাহ বলছেন, ‘দুর্ভোগ তাদের জন্যে, যারা নিজেরা কিছু রচনা করে এবং ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির জন্য বলে, ‘এই বিধিবিধান আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে।’ তাদের হাত যা রচনা করেছে তা হবে তাদের সর্বনাশের কারণ, আর এর বিনিময়ে তারা যা অর্জন করেছে তা হবে তাদের ধ্বংসের
উপকরণ।’
সুরা আল্ ইমরানের ৭৮ নম্বর আয়াতেও প্রায় একই ধরনের কথা বলা হয়েছে-‘ওদের মধ্যে কিছু লোক কিতাব পাঠের সময় জিহ্বাকে এমনভাবে ওলটপালট করে, যাতে তোমরা মনে করো তারা কিতাবের মূল অংশ পড়ছে, আসলে তা কিতাবের অংশ নয়। ওরা বলে, ‘এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত।’ কিন্তু আসলে তা আল্লাহর কথা নয়। ওরা জেনেশুনে আল্লাহর নামে মিথ্যা বলে।’
এসব আয়াত সামনে এনে হাদিস মানতে না চাওয়া বন্ধুরা বলতে চায়, উলামায়ে কেরামরা যে হাদিসকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত আয়াতের মতোই গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রচার করছে তা পুরোপুরি ভুল। সঠিক কথা হলো হাদিস আল্লাহর কিতাব নয় বা কিতাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। কথা তো সত্য। হাদিস আল্লাহর কিতাব নয়। যদি আল্লাহর কিতাব হতো তাহলে তো কোরআনেরই অংশ হয়ে যেত। তা আমরা নামাজে তেলাওয়াত করতাম।
কোরআন ও হাদিস দুটোই ওহি। পার্থক্য হলো, কোরআন নামাজে তিলাওয়াত করা হয়, আর হাদিস তিলাওয়াত করা হয় না। তবে বিধানের
ক্ষেত্রে দুটোই সমান। কোরআনের আয়াত দিয়ে যেমন ফরজ সাব্যস্ত করা যায় তেমনি মুতাওয়াতির হাদিস দিয়েও ফরজ বা ওয়াজিব সাব্যস্ত করা যায়। হাদিস অস্বীকারকারীরা শেষের কথাটি মানতে চান না। তারা বলেন, হাদিস দিয়ে কোনো বিধান দেওয়ার সুযোগ নেই। বিধান দিতে হবে একমাত্র আল্লাহর কোরআন দিয়ে।
আফসোস! হাদিস অস্বীকারকারী বন্ধুরা জানেন না, রসুলের সুন্নাহকে অস্বীকার করে তারা আসলে কোরআনকেই অস্বীকার করছেন। সুরা আল্ ইমরানের ৩১ ও ৩২ নম্বর আয়াত দুটো দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করছি। যদিও এ প্রসেঙ্গ শত শত আয়াত রয়েছে। স্থানস্বল্পতার জন্য এ দুটি আয়াত বাছাই করা হয়েছে।
তাফসিরে মুনিরের তৃতীয় খণ্ডের ২০৬ পৃষ্ঠায় এসেছে, ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, ইহুদিরা হুজুর (সা.)-এর কাছে এসে দাবি করে বসল আমরা আল্লাহর প্রিয়জন। আমরা আল্লাহকে ভালোবাসি। এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ নাজিল করলেন-‘হে নবী! ওদের বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমাকে মেনে চলো। আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরমদয়ালু (সুরা আল্ ইমরান, আয়াত ৩১)।’আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এ আয়াত নাজিল হওয়ার পর ইহুদি-খ্রিস্টানদের থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া আসার আগেই মুসলমানবেশী মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তার দলের মুখোশধারী মুসলমানদের নিয়ে বলাবলি শুরু করল-‘এখন দেখছি মুহাম্মদ আল্লাহর বিধান মেনে চলার মতো নিজেকেও মেনে চলার দাবি করে বসেছে। খ্রিষ্টানরা যেভাবে ঈসা (আ.)কে ভালোবাসে সেরকম আমাদেরও মুহাম্মদকে ভালোবাসতে বাধ্য করছে।’ সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ সুরা আল্ ইমরানের ৩২ নম্বর আয়াত নাজিল করলেন, ‘হে নবী! ওদের আরও বলে দিন, ‘আল্লাহকে মেনে চলো এবং রসুলকে মেনে চলো।’ এরপরও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে জেনে রাখো, আল্লাহ সত্য অস্বীকারকারী কাফেরদের অপছন্দ করেন (তাফসিরে রুহুল মাআনি, ২য় খণ্ড, ৪৯২ পৃষ্ঠা)।’