1. shahajahanbabu@gmail.com : admin :
কোরআনের আলোকে শাসকের গুণাবলি - Pundro TV
বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৩:৩৯ অপরাহ্ন



কোরআনের আলোকে শাসকের গুণাবলি

অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

পবিত্র কোরআন কারিমে সৎ ও আদর্শ শাসকের সফলতা ও সুখবরের কথা যেমন এসেছে, এসেছে জালিম শাসকদের প্রতি অভিশাপ ও করুণ পরিণতির কথাও। তাই সংক্ষিপ্ত পরিসরে এখানে নেককার ও আদর্শ শাসকের কিছু গুণাবলি জানা জরুরি।

১. আল্লাহ ও পরকালমুখিতা : দাউদ (আ.)-এর পুত্র সুলাইমান (আ.)। বাবা ও ছেলে দুজনই একাধারে নবী ও বাদশাহ ছিলেন।সুলাইমান (আ.)-কে আল্লাহ তাআলা নবুয়তের পাশাপাশি সুবিশাল রাজত্বও দান করেছিলেন। তাঁর প্রজাদের মধ্যে মানুষের পাশাপাশি জিন জাতি ও পাখিকুলও শামিল ছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সুলাইমানের জন্য তার বাহিনীগুলো সমবেত করা হলো, যাতে ছিল জিন, মানুষ ও পাখিকুল। তাদের বিভিন্ন দলে বিন্যস্ত করা হতো।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ১৭)

সুলাইমান (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে কী পরিমাণ নিয়ামত ও রাজত্ব লাভ করলেন, সেটি তাঁর ভাষায় কোরআনে বর্ণিত হয়েছে যে ‘আমাকে পাখির ভাষা শেখানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সব জিনিস দান করা হয়েছে।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ১৬)

এরপর তিনি এসব নিয়ামতকে আল্লাহর করুণা ও অনুগ্রহ হিসেবে স্বীকার করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই এটি (আল্লাহ তাআলার) সুস্পষ্ট অনুগ্রহ।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ১৬)

অর্থাৎ এত মহা রাজত্বপ্রাপ্তির পরও আল্লাহমুখিতা ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসাই ছিল তাঁদের প্রথম ও প্রধান পুঁজি। তখন আল্লাহ তাআলা তার প্রশংসা করে বলেন, ‘আমি দাউদকে দান করলাম সুলাইমান (এর মতো পুত্র)। সে ছিল উত্তম বান্দা। নিশ্চয়ই সে ছিল অতিশয় আল্লাহ অভিমুখী।’ (সুরা : সাদ, আয়াত : ৩০)

২. ইনসাফ কায়েম করা : সুলাইমান (আ.)-এর পিতা দাউদ (আ.)-কেও আল্লাহ তাআলা নবুয়তের সঙ্গে রাজত্বও দান করেছিলেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে দাউদ! আমি পৃথিবীতে তোমাকে খলিফা বানিয়েছি। সুতরাং তুমি মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার করো এবং খেয়ালখুশির অনুগামী হয়ো না; অন্যথায় তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয় তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি, যেহেতু তারা হিসাব দিবসকে বিস্মৃত হয়েছিল।’ (সুরা : সাদ, আয়াত : ২৬)

৩. সৎপথে অবিচল থাকা এবং অন্যায় পরিহার করা : মুসা (আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশে ৪০ রাতের জন্য তুর পাহাড়ে গেলেন, নিজের ভাই হারুন (আ.)-এর হাতে স্বজাতির শাসন ও দেখভালের দায়িত্ব অর্পণ করলেন; তখন তিনি হারুন (আ.)-কে বলেছিলেন, ‘আমার অনুপস্থিতিতে তুমি আমার সম্প্রদায়ের মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সবকিছু ঠিকঠাক রাখবে এবং অশান্তি সৃষ্টিকারীদের অনুসরণ করবে না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৪২

অতএব, একজন জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব, জনগণের দ্বিন-ঈমান ও জাগতিক সবকিছুর সঠিক তত্ত্বাবধান, দেখভাল ও ঠিকঠাক রাখা। কোনো ধরনের ফ্যাসাদ সৃষ্টি না করা এবং সৃষ্টি হতে না দেওয়া।

৪. শিষ্টের লালন ও দুষ্টের দমন : একজন আদর্শ শাসকের যেমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা, তেমনি শিষ্টের লালন ও দুষ্টের দমন করাও তার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ‘জুলকারনাইন’ উপাধিতে পরিচিত আল্লাহপ্রিয় একজন দ্বিনদার বাদশাহ ছিলেন। তিনি একবার সফরে বের হলেন। যেতে যেতে এমন স্থানে পৌঁছলেন, যেখানে সন্ধ্যাবেলায় দর্শকের কাছে মনে হতো, যেন সূর্য এক কর্দমাক্ত জলাশয়ে অস্ত যাচ্ছে। সেখানে তিনি একটি সম্প্রদায়ের সাক্ষাৎ পেলেন। সম্ভবত তারা আল্লাহর আনুগত্যকারী ছিল না। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, ‘হে জুলকারনাইন! (তোমার সামনে দুটি পথ আছে)। হয়তো তুমি তাদের শাস্তি দেবে, নতুবা তাদের ব্যাপারে উত্তম ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’ (সুরা : কাহফ, আয়াত : ৮৪-৮৬)

সুতরাং ন্যায়পরায়ণ শাসকের রীতিই হলো দুরাচারীদের শাস্তি প্রদান আর ভালো লোকদের সঙ্গে নম্র ও কোমল আচরণ করা।

৫. আল্লাহর প্রতি ভরসা ও অকাতরে জনগণের জন্য খরচ করা : ইয়াজুজ ও মাজুজ নামক একটি অসভ্য গোষ্ঠীর অনাচার থেকে যখন একটি সম্প্রদায় জুলকারনাইনের শরণাপন্ন হয়ে বলল, হে জুলকারনাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ এ দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়ায়। প্রয়োজনে আমরা

আপনাকে কিছু কর্জ দেব, যার বিনিময়ে আপনি আমাদের ও তাদের মাঝখানে একটি প্রাচীর বানিয়ে দেবেন! তখন জুলকারনাইন তাদের থেকে অর্থ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে বললেন, ‘আল্লাহ আমাকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন সেটাই (আমার জন্য) শ্রেয়। সুতরাং তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সহযোগিতা করো। আমি তোমাদের ও তাদের মধ্যে একটি মজবুত প্রাচীর নির্মাণ করে দেব।’ (সুরা : কাহফ, আয়াত : ৯৫)

৬. জনসাধারণের খিদমতকে সৌভাগ্য মনে করা এবং শোকর আদায় করা : শাসকদের আল্লাহ তাআলা ক্ষমতা ও সামর্থ্য দান করেন। চাইলে তাঁরা এমন অনেক ভালো কাজ করতে পারেন, যা সাধারণত অন্যদের জন্য কঠিন। আল্লাহ প্রদত্ত সেই ক্ষমতা ও সামর্থ্য ব্যবহার করে কাজটি সম্পন্ন করার পর নিজের বাহাদুরি না ফলিয়ে আল্লাহর শোকর আদায় করাই বুদ্ধিমানের কাজ। ইয়াজুজ ও মাজুজের অনাচার থেকে নিরাপত্তা-প্রাচীর নির্মাণের পর জুলকারনাইন নিজের কোনো বাহাদুরি ফলাননি এবং গর্ব করেননি; বরং তিনি বলেছিলেন, ‘এটা আমার রবের রহমত (তিনি এ রকম একটা প্রাচীর বানানোর তাওফিক দিয়েছেন)। অতঃপর আমার রবের প্রতিশ্রুত সময় যখন আসবে, তখন তিনি এ প্রাচীর ধ্বংস করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবেন। আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত সত্য।’ (সুরা : কাহফ, আয়াত : ৯৮)

৭. রক্ষণাবেক্ষণে পূর্ণ যোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পূর্ণ ধারণা থাকা : ইউসুফ (আ.) দেশের পরিস্থিতি দেখে এবং আসন্ন ভয়াবহ

দুর্ভিক্ষের কথা চিন্তা করে দেশের অর্থ বিভাগের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন। নিজের গুণকীর্তন বা ক্ষমতার লোভে নয়; বরং দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যেই নিজের মধ্যে নিহিত দুটি গুণের কথা বাদশাহকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আপনি আমাকে দেশের অর্থ-সম্পদের (ব্যবস্থাপনা) কার্যে নিযুক্ত করুন। নিশ্চিত থাকুন, আমি রক্ষণাবেক্ষণে পারদর্শী ও সুবিজ্ঞ।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫৫)

৮. ঘুষ-উৎকোচ ও অন্যায় সুবিধা গ্রহণ এড়িয়ে চলা : সুলাইমান (আ.) যখন সূর্য পূজারি এক রানির কাছে ইসলাম গ্রহণের চিঠি পাঠিয়েছিলেন, যেখানে ছিল এক আল্লাহর আনুগত্যের দাওয়াত। রানি তাঁর সভাসদদের সঙ্গে পরামর্শ করে নিজেই সিদ্ধান্ত নিলেন—আগে কিছু উপঢৌকন পাঠিয়ে পরীক্ষা করা হোক, বাদশাহর আগ্রহ কোন জিনিসে—ধন-সম্পদে, না দুর্লভ বস্তুসামগ্রীতে! তাই সব ধরনের উপহারসামগ্রী পাঠালেন। উপহার গ্রহণ করলে বোঝা যাবে, তিনি শুধুই একজন রাজা এবং গতানুগতিক রাজাদের মতোই অর্থ ও ক্ষমতার মোহে আক্রান্ত। তখন রানি বলেছিলেন, ‘বরং আমি তাদের কাছে উপঢৌকন পাঠাব। তারপর দেখব, দূতরা কী জবাব নিয়ে ফেরে।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ৩৫)

কিন্তু সুলাইমান (আ.) যেহেতু পার্থিব মোহে আক্রান্ত সাধারণ কোনো শাসক ছিলেন না, তাই তিনি এসব হাদিয়া-উপঢৌকন প্রত্যাখ্যান করে বললেন, ‘তোমরা কি ধন-সম্পদ দিয়ে আমাকে সাহায্য করতে চাও? তবে (শোনো) আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমাদের যা দিয়েছেন তার চেয়ে উত্তম। বরং তোমরা নিজেদের উপহারসামগ্রী নিয়ে খুশি থাক।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ৩৬)

৯. স্বচ্ছতা, আমানতদারি ও ন্যায়বিচার : এ প্রসঙ্গে মুমিনের প্রতি কোরআনের নির্দেশনা হলো, ‘(হে মুসলিমরা!) নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ করছেন যে তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারকে আদায় করে দেবে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ইনসাফের সঙ্গে বিচার করবে। আল্লাহ তোমাদের যে বিষয়ে উপদেশ দেন, তা কতই না উত্কৃষ্ট। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)

১০. আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করা : একজন শাসকের সবচেয়ে বড় গুণ আসমানি কিতাব এবং শরিয়ত অনুযায়ী ফয়সালা ও বিচার করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘(হে রাসুল!), আমি আপনার প্রতি সত্য সংবলিত কিতাব নাজিল করেছি, তার আগের কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী ও সেগুলোর (বিষয়বস্তুর) সংরক্ষকরূপে। সুতরাং আপনি তাদের মধ্যে সেই বিধান অনুসারেই বিচার করুন, যা আল্লাহ নাজিল

করেছেন। আর আপনার কাছে যে সত্য এসেছে তা এড়িয়ে ওদের খেয়ালখুশির অনুসরণ করবেন না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৪৮)

অতএব, একজন শাসকের জন্য কোরআন ও ইসলামী শরিয়া মোতাবেক বিচার করা বা রায় দেওয়া কত যে গুরুত্বপূর্ণ এবং এর বিরুদ্ধাচরণ করা কত ভয়াবহ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আল্লাহ বলেন, ‘তবে কি তারা জাহেলিয়াতের বিধান চায়? যারা নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে, তাদের জন্য আল্লাহর চেয়ে উত্তম বিধানদাতা কে আছে?’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৪৯-৫০)

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২
Developed By ATOZ IT HOST