বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক’ নিয়ে এক নজিরবিহীন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৬ সালের জন্য নৃত্যকলা শাখায় ঘোষিত পদক প্রদানের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ ও অস্বচ্ছ আখ্যা দিয়ে রাজপথে নেমেছেন দেশের প্রথিতযশা নৃত্যশিল্পীরা। ঘোষিত নাম বাতিল করে যোগ্য ও আজীবন সাধনায় মগ্ন কোনো শিল্পীকে এই সম্মান প্রদানের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন বিভিন্ন প্রজন্মের শতাধিক নৃত্যব্যক্তিত্ব।
সোমবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে শিল্পীরা তাঁদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও দাবি তুলে ধরেন
সংবাদ সম্মেলনে শিল্পীদের অভিযোগ, এবারের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যোগ্যতাকে পাশ কাটিয়ে ব্যক্তিগত প্রভাব ও স্বজনপ্রীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যা এই সম্মানজনক পদকের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করেছে। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী ও পরিচালক ফারহানা চৌধুরী বেবি। তিনি বলেন, ২০২৬ সালে নৃত্যকলা শাখায় একুশে পদক প্রদানের সরকারি সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক হলেও যাঁকে মনোনীত করা হয়েছে, তাঁর অভিজ্ঞতা ও অবদান নিয়ে পুরো নৃত্যাঙ্গন হতবাক। এবারের তালিকায় নৃত্যে বিশেষ অবদানের জন্য অর্থি আহমেদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
শিল্পীদের দাবি, সাংস্কৃতিক উপদেষ্টার ভেরিফায়েড পেজে অর্থি আহমেদের যে কর্মকাণ্ডকে তুলে ধরা হয়েছে, তা মূলত সমাজসেবামূলক কাজ। বক্তারা স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন, সমাজসেবা নিঃসন্দেহে মহৎ কাজ, কিন্তু সেটি কোনোভাবেই নৃত্যকলায় দীর্ঘ সাধনা বা গবেষণার বিকল্প হতে পারে না।
নৃত্যকলার মতো ব্যাকরণসম্মত ও কঠোর সাধনার শিল্পে পদক দিতে হলে প্রার্থীর শৈল্পিক অবদান, মঞ্চায়ন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার দীর্ঘ ইতিহাস থাকতে হয়। তাঁদের মতে, ঘোষিত প্রার্থীর ক্ষেত্রে এই যোগ্যতাগুলো অনুপস্থিত।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত দেশের প্রবীণ নৃত্যশিল্পীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশে এমন অনেক নৃত্যব্যক্তিত্ব রয়েছেন যাঁরা গত ৪-৫ দশক ধরে নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন। দীর্ঘ সাধনার পর যখন দেখা যায় কোনো নবীন বা সাম্প্রতিক পরিচিতি পাওয়া ব্যক্তিকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হচ্ছে, তখন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীরা অপমানিত বোধ করেন।
অনুষ্ঠানে একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী আমানুল হক, শারমিন হোসেন, মাহফুজুর রহমান, সেলিনা হক ও মেহবুবা মাহনুর চাঁদনীসহ আরও অনেকে সংহতি প্রকাশ করেন। শিল্পীদের দাবি, বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মতামত ছাড়াই একপাক্ষিকভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নৃত্যশিল্পীরা সরকারের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেছেন। প্রথমত, ২০২৬ সালে নৃত্যকলায় ঘোষিত একুশে পদকের সিদ্ধান্তটি দ্রুত স্থগিত করে পুরো প্রক্রিয়াটি পুনরায় যাচাই-বাছাই করা।
দ্বিতীয়ত, পদক মনোনয়নের ক্ষেত্রে নৃত্যাঙ্গনের স্বীকৃত প্রবীণ ব্যক্তিত্ব ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের গঠনমূলক মতামত গ্রহণ করা। তৃতীয়ত, ভবিষ্যতেও যেন এ ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি না হয়, সেজন্য একটি স্থায়ী, নিরপেক্ষ এবং প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন নীতিমালা প্রণয়ন করা।
উল্লেখ্য, গত ৫ ফেব্রুয়ারি ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ২০২৬ সালের একুশে পদক বিজয়ীদের তালিকা প্রকাশ করেন। এবারের তালিকায় মোট ৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেখানেই নৃত্যে বিশেষ অবদানের জন্য অর্থি আহমেদের নাম ঘোষণা করার পর থেকেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিক্ষোভ শুরু হয়।
নৃত্যশিল্পীদের মতে, একুশে পদক কোনো লবিং বা সাম্প্রতিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের ত্যাগের স্বীকৃতি। তাঁরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যোগ্য শিল্পীকে মূল্যায়ন না করে যদি এই প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়, তবে তাঁরা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবেন।