হাফিজুর রহমান
গাজীপুর–এ উন্নয়নের আলো জ্বলার আগেই নেমে এলো হতাশার ছায়া। উদ্বোধনের ফিতা কাটার আগেই নতুন নির্মিত সড়ক ধসে পড়ে যেন পুরো প্রকল্পের বাস্তব চিত্র সামনে এনে দিল। কয়েক দিনের ব্যবধানে সড়কের একাধিক স্থানে ফাটল, কোথাও আবার কয়েক ফুট দেবে যাওয়ার ঘটনা স্থানীয়দের বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। যে সড়ক দিয়ে মানুষের স্বপ্নের যাতায়াত সহজ হওয়ার কথা ছিল, সেটিই এখন পরিণত হয়েছে অনিয়ম ও দায়সারা কাজের প্রতীকে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন–এর কাশিমপুর ধনঞ্জয়খালী এলাকায় নির্মাণাধীন সড়ক উদ্বোধনের আগেই করুণ পরিণতির মুখে পড়েছে। কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের এই সড়ক নির্মাণ শেষ হতে না হতেই কয়েক দিনের মাথায় ভেঙে কয়েক ফুট পর্যন্ত দেবে গেছে। এতে করে পুরো এলাকায় চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তড়িঘড়ি করে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও অনিয়মের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করায় এমন বিপর্যয় ঘটেছে। নির্বাচনের আগে দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখাতে গিয়ে দায়সারা কাজের ফল এখন ভোগ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, কাশিমপুর এলাকায় তুরাগ নদ–এর পশ্চিম তীরে বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ের আওতায় দুটি প্যাকেজে উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করা হয়। প্যাকেজ নং ১২–এর অধীনে ১ হাজার ১৫০ মিটার সড়ক নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। তবে কার্যাদেশ দেওয়া হয় ১১ কোটি ৬৪ লাখ ৪১ হাজার ৫৭১ টাকায়। একইভাবে প্যাকেজ নং ৫–এর আওতায় ১২ হাজার ৪৬ মিটার সড়ক নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ১৩ কোটি ১৯ লাখ ২১ হাজার টাকা হলেও কার্যাদেশ দেওয়া হয় ১৪ কোটি ২৮ লাখ ১১ হাজার ৪৫৯ টাকায়। কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় ইউসিসিএল নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের আওতায় ডব্লিউবিএম, ৬০ মিলিমিটার কার্পেটিং, ফুটপাত, রেলিং ও গার্ড ওয়াল নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে কাজের মান নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।সরেজমিনে দেখা গেছে, মহানগরীর কাশিমপুর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ধনঞ্জয়খালী এলাকায় সড়কের একাধিক স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও পুরো অংশ ভেঙে কয়েক ফুট দেবে গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ঢালাই শেষ হওয়ার তিন দিনের মাথায় সড়কে ফাটল ধরে এবং দ্রুতই তা ধসে পড়ে। তাদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় পরিমাণ ঢালাই দেওয়া হয়নি, ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী। তারা এই প্রকল্পে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে কাশিমপুর জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী শামসুর রহমান বলেন, নদীর পাড়ে সড়ক হওয়ায় এটি ‘ন্যাচারাল ডিজাস্টার’ হতে পারে, পরিকল্পনার ত্রুটিও থাকতে পারে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর বিস্তারিত জানানো হবে। অন্যদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক একেএম হারুনুর রশীদ জানিয়েছেন, বিষয়টি সরেজমিনে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উদ্বোধনের আগেই সড়কের এই বেহাল দশা নগরবাসীর মনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন টেকসই অবকাঠামো নিশ্চিত করা যাচ্ছে না? তদন্তে প্রকৃত কারণ উদঘাটন ও দায়ীদের জবাবদিহিতার মধ্য দিয়েই মিলতে পারে এর উত্তর।