1. shahajahanbabu@gmail.com : admin :
সুুন্দরবনে দুই দিন - Pundro TV
শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫৩ অপরাহ্ন



সুুন্দরবনে দুই দিন

অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

এতদিন পরে সঠিক তারিখটা বলতে পারছি না কবে সুন্দরবন ভ্রমণে গিয়ে ছিলাম। সম্ভবত ১৯৬৮ সালের ঘটনা। কলেজ ছুটি তাই তিন আত্মীয়, দুইজন বড় ভাইয়ের শালা ও একজন ভায়রা ভাই মিলে ঠিক করলাম সুন্দরবন দেখতে যাব। ভায়রা ভাই মুজিবর রহমান হাওলাদারের বেশ বছর কেটেছে সুন্দর বন এলাকায়। খুব শৌখিন মানুষ ছিলেন তিনি, শখের বশে বন্দুক কিনে সুন্দর বনে ঘুরে বেড়াতেন তার বন্ধু রোহিনী দাস ও আয়নাল খাঁর সাথে। আয়নাল খাঁ ও রোহিনী দাসের বাড়ি ছিল সুন্দরবন সংলগ্ন বহর বুনিয়া গ্রামে। মুজিবর রহমান হাওলাদার প্রায়ই তার সুন্দরবনের অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে গল্পচ্ছলে বলতেন। তার গল্প শুনে শুনে তাই আমাদের মনে সুন্দরবন দেখার আগ্রহ বেড়ে উঠেছিল।

সুন্দরবন দেখার আগ্রহ আমার কৈশোরের হৃদয়পটে জেগে উঠেছিল নানা কারণে। কৈশোর কালে দেখেছি প্রতি বছর আমার প্রতিবেশী খালু ও অন্য কয়েক জনে জঙ্গল থেকে নৌকায় পাংগাশ মাছ সহ নানা জাতের মাছ লবণ দিয়ে নিয়ে আসতেন। তা থেকে আমাদের ঘরে পাঠাতেন দু একটি, মজা করে খেতাম। এত মাছ কোথায় থাকে, কেমন করে ধরে তার নানা গল্প শোনাত খালু। তার গল্প শোনতাম, আর ভাবতাম সুন্দরবন তা হলে দেখতে না জানি কত সুন্দর! প্রতিবছর দেখতাম গোল পাতা ভর্তি ছোট বড় অনেক নৌকা খালে ভিড় জমাতো। ভাটির এলাকার অধিকাংশ বাড়ির ঘর ছাওয়া হতো গোল পাতা দিয়ে। আমাদের ঘরখানাও ছিল গোল পাতার ছাউনি। ছনও আসতো নৌকা বোঝাই হয়ে। অনেক শৌখিন লোকেরা ছন দিয়ে ঘর ছাইতো। বাওয়ালীদের কাছে শুনতাম গোল পাতার আড়ালে কেমন করে বাঘ লুকিয়ে থাকে। আমার পাশের বাড়ির কাশেম আলী ফরাজী ছিলেন বড় জ্ঞানী (ওঝা)। সে নাকি মন্ত্র দিয়ে বাঘ তাড়াতে পারতো। তাকে নিয়ে যেত বাওয়ালীরা বাঘের হাত থেকে রক্ষা পেতে। তার কাছে শুনেছি কিভাবে সে বাঘের গালে চড় মেরে বাঘ দূরে হাকিয়ে দিত। এ সব গল্প শুনে শুনে ভাবতাম কবে দেখতে পাব সুন্দরবন। অবশেষে কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের এক সুপ্রভাতে সুযোগ এল সুন্দর বন দেখতে যাওয়ার।

দুই বেয়াই বাদশা খাঁ, আলীম খাঁ, ভাইসাব মুজিবর রহমান হাওলাদার ও আমি মিলে চারজন বেড়াতে যাব সুন্দরবনে। সুন্দরবন আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় দশ মাইল পশ্চিমে জিউধারা গ্রামের পাশে। কিন্তু কিভাবে যাব তা নিয়ে অনেক কথাবার্তা হল। পথ যাত্রার বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে মত স্থির করতে পারছিলাম না। কথায় আছে- “প্রত্যেক বিষয়ে মত স্থির করবার আগে যদি তন্ন তন্ন বিচার করতে হয় তবে জীবনযাত্রা দুর্বহ হয়ে পড়ে। সর্বক্ষণ সতর্ক ও যুক্তিপরায়ণ হয়ে থাকা সহজ নয়।”

সেকালে পায়ে হেঁটে সুন্দরবনে যাওয়া ছিল বেশ কঠিন, কারণ সে সময় ভাল রাস্তা ঘাট ছিল না। বাস, মটর সাইকেল বা টেম্পু চড়ে সেখানে পৌঁছার কোন সুযোগ ছিল না। এক মাত্র ভরসা ছিল নৌকা। অবশেষে সিদ্বান্ত হল নৌকায় চড়েই যাওয়া হবে। সন্ধ্যার পরে নৌকা ছেড়ে দিল। মনে ব্যাকুল আগ্রহ, এবার বাস্তবে স্বপ্নের সুন্দরবন দেখতে পাব। অনেক রাতে নৌকা ভিড়ল বাদশা খাঁর বন্ধু জিউধারা নিবাসী আশরাফ আলী হাওলাদারের ঘাটে। আশরাফ লোকটা খুবই আমুদে ও অর্থশালী। তিনি খুব যতœ করে মেহমানদারী করলেন আমাদের। যা আজও স্মরণে এলে পেছনে ফিরে যেতে মন চায়। একটি তীব্র উত্তেজনার ভিতর দিয়ে রাত কেটে গেল। সকাল হলে নাস্তা সেরে চার জনে হেটে রওয়ানা করলাম সুন্দরবনের উদ্দেশে। ঐ তো সুন্দরবন, খুব কাছে মনে হচ্ছিল। কিন্তু যতই হাঁটি পথ ফুরায় না; মনে হয় যেন বন তার অপরূপ রূপকে আমাদের থেকে আড়াল রাখার জন্য দূরে সরে যাচ্ছে। যাই হোক, এক সময় হাজির হলাম একবারে জঙ্গলের অপর পাড়ে আয়নাল খাঁর বাড়িতে। আয়নাল খাঁর বাড়ির সামনেই নদী, তার অপর তীরে সুন্দরবন তার সৌন্দর্যের ডালি দিগন্ত বিস্তার করে রয়েছে। আয়নাল খাঁর ঘাটে বাঁধা নৌকায় চড়ে আমরা চারজনে প্রবেশ করলাম বনের মধ্যে।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যান গ্রোভের অন্যতম এই সুন্দরবন। এই দৃষ্টিনন্দন বনে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, যাদের কলরবে মুখরিত হয়ে ওঠে বন, ভ্রমণকারীদের প্রাণ মুগ্ধ করে তোলে। শুধু কি পাখি, রয়েছে পৃথিবী বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, বানর, নানা ধরনের হরিণ ও শিয়ালসহ নানা রকমের চার পা বিশিষ্ট প্রাণী। এদের খাদ্যের অভাব হয় না। জগৎ¯্রষ্টা রব্বুল আলামীন যাবতীয় জন্তুকে তাদের জীবনযাত্রা নির্বাহোপযোগী সামর্থ দিয়েছেন। সকল বাঘই আপন আহার অন্বেষণ করে এবং প্রত্যেক বীবর, প্রত্যেক পাখিই নিজ নিজ বাসা তৈরি বিষয়ে সহায়তা করে।

বনে রয়েছে অসংখ্য বিষধর সাপ। সুন্দরবনে রয়েছে ছোট বড় প্রায় পাঁচ হাজার নদী। তাতে ভরপুর বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। জোয়ারে যখন নদী ভরে যায় তখন মাছ আসে কেওড়া ফল খাবার লোভে। চারদিকে গাছে গাছে নানা ফুল, ফল আর মৌচাকের সমারোহ। এ সব মৌচাক থেকে মৌয়ালরা প্রতি বছর টনে টনে মধু সংগ্রহ করে থাকে। নদীর পাশ ঘেঁষে গোল পাতা ও সনের বন। সারা জঙ্গল ভরা সুন্দরী, কেওড়া, গরান সহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছে। অফুরন্ত সম্পদে ভরা এমন মনো

হর দৃশ্য সত্যিই মেলা ভার, হয়তো তাই এ বনের নাম হয়েছে সুন্দরবন।

বনে পা রেখেই আমার হৃদয় আনন্দে ভরে উঠল। পৃথিবীতে এমন সুন্দর দৃশ্য আছে তা আগে বুঝিনি। যার চোখ এমন সুন্দরকে দেখতে পেলে না আজন্ম তার চোখের উপরে জ্ঞানাঞ্জন শলাকা ঘষে ঘষে ক্ষইয়ে ফেললেও ফল পাওয়া যাবে না। সুন্দরবনের এমন সৌন্দর্যকে যে দেখতে পেলো সে অতি সহজেই দেখে নিতে পারলো সুন্দরকে, কোনো গুরুর উপদেশ পরামর্শ এবং ডাক্তারি দরকার হল না তার বিনা অঞ্জনেই সে নয়নরঞ্জনকে চিনে গেলো।

খুলনা জেলার দক্ষিণে অবস্থিত সুন্দরবন। জেলার প্রায় অর্ধাংশের বেশি জুড়ে অবস্থিত রয়েছে বিশ্ববিশ্রুত সুন্দরবন। “কোন মৃত মানুষের কঙ্কালশেষ দেহ দর্শন করিয়া, কেহই তাহার মুখচ্ছবি ও রূপলাবণ্যের কল্পনা করিতে সমর্থ হয় না।” এ কথাটি যেমন সত্য, তেমনই সত্য সুন্দরবনের অভ্যন্তর ভাগে প্রবেশ না করে দূর থেকে দেখে তার সৌন্দর্য উপভোগ করা।

এত বিরাট এলাকা দেখা পর্যটকদের জন্য অসম্ভব। আমরা একবারে মানব বসতির কাছাকাছি একটি অঞ্চলে ঢুকে পড়লাম। আমরা যেখানে প্রবেশ করলাম সেখানে ছিল প্রধানত সুন্দরী কাঠের বন। আয়নাল খাঁ বন্দুক নিয়ে সামনে আর মুজিবর রহমান আর একটি বন্দুক নিয়ে পেছনে। আমরা তিনজন শুধু হাতে দা নিয়ে অতি কষ্টে পথ চলছি। বনের মধ্যে কোন পথ নেই, তাই গাছের ফাঁকে ফাঁকে কাঁটা-লতা পেরিয়ে পথ চলতে হয়। পায়ের নিচে সুন্দরী কাঠের উঁচু উঁচু শিকড় যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘হুলা’ বলে। সে গুলির আঘাতে পা প্রায় ক্ষত বিক্ষত। খুব সাবধানে সারি বেঁধে হেঁটে চলছি আর নজর রাখছি হঠাৎ করে লুকিয়ে থাকা ‘মামা’ (বাঘ) আমাদের উপরে ঝাঁপিয়ে না পড়ে। বেলা অনেক পশ্চিমে হেলে গেছে। ইতিমধ্যে মামা তো দূরের কথা কোন বানর হরিণ কারও সাথে সাক্ষাৎ মেলল না। দু’একটি বিরাট আকারের গুইশাপ আমাদেরকে দেখে পালাচ্ছিল, তার সাথে দেখা হল। অবশ্য দূরে বন মোরগের ডাক ও বানরের কিচির মিচির কানে এল। কিন্তু নজরে এল না। আয়নাল খাঁকে বললাম চলুন যাই; আগামী দিন আবার শিকারের চেষ্টা করা হবে।

সেদিনের মত কা¬ন্ত হয়ে ফিরে এলাম, আয়নাল খাঁর বাড়িতে। আয়নাল খাঁর বৌ আমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছে। হাত মুখ ধুইয়ে সবাই বসলাম খেতে। দুই এক লোকমা খাবার মুখে দিতেই চোখ পানিতে ঝাপসা হয়ে এল। তরকারীতে এত ঝাল দিয়েছে যে তা আর মুখে দেবার মত নয়। আমাদের চোখ রগড়ানো দেখে ব্যাপারটি আয়নাল খাঁর বুঝতে বাকি রইল না। বেচারা লজ্জায় মাথা নিচু করে রইল। আমার মা তরকারীতে বেশি ঝাল দিতেন। কিন্তু আয়নাল খাঁর বৌর ঝাল দেয়া সালুনের মত আর কোন দিন এত ঝালের সালুন মুখে দেইনি।

পরের দিন সকাল বেলা নদীর ঘাটে দেখলাম এক মনোহর দৃশ্য। নদীর মাঝখানে কুমির ভেসে রয়েছে। চুপচাপ, কোন নড়াচড়া নেই তাদের। মনে হচ্ছিল রোদ পোহচ্ছে। একটু দূরে দেখলাম কয়েকটি হরিণ নদীর তটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে হল সুন্দরবনের অর্ধেক দেখে ফেলেছি। ভোরের নাস্তা শেষ করে আবার আগের দিনের মত বেরিয়ে পড়লাম শিকারের খেঁ^াজে। আজও গত কালের মত একই অবস্থা। সারাদিন ঘুরে একটা হরিণ তো দূরের কথা, একটা বনমোরগের সাক্ষাৎও মিলল না। শিকারের স্বাদ মিটিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে এলাম আশরাফ হাওলাদারের বাড়িতে। রাতে খেয়েদেয়ে নৌকায় রওয়ানা দিলাম বাড়ির পথে। পেছনে পড়ে রইল বিরাট সুন্দরবন। মনে হচ্ছিল সে যেন বলছে, আবার এসো বন্ধু।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২
Developed By ATOZ IT HOST