ফয়সাল কবীর শুভ
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৮:২০ | আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ | ১০:৩৬
বাংলাদেশ যখন স্মার্ট অর্থনীতি ও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে– এই ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় ডিভাইসগুলো কি সবার নাগালে রয়েছে? দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন ল্যাপটপ, কম্পিউটার বা স্মার্ট ডিভাইস এখনও ব্যয়সাপেক্ষ। অথচ এই ব্যবধান কমানোর একটি বাস্তবসম্মত পথ রয়েছে– রিফারবিশড বা পুনঃসংস্কারকৃত ডিজিটাল পণ্য। দুর্ভাগ্যজনক, বর্তমান আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২৪ এই সম্ভাবনাকে কার্যত সীমাবদ্ধ করে রেখেছে।
নীতিমালায় পুরোনো ইলেকট্রনিক পণ্যের আমদানির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। এর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে ই-ওয়েস্টের ডাম্পিং গ্রাউন্ড হওয়া থেকে রক্ষা করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক বাস্তবতা বদলেছে। আজ ব্যবহৃত মানেই বর্জ্য নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি উচ্চমানের, অব্যবহৃত সম্পদ।
উন্নত দেশগুলোতে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তিন-চার বছর পরপর তাদের আইটি ডিভাইস পরিবর্তন করে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ কার্যক্ষম। এই ‘এক্স-করপোরেট’ ডিভাইস যেমন ব্র্যান্ডেড ল্যাপটপ বা এন্টারপ্রাইজ-গ্রেড কম্পিউটার বর্তমানে দুবাইয়ের মতো রিফারবিশমেন্ট হাবে গিয়ে নতুন জীবন পাচ্ছে।
‘জেবেল আলি ফ্রি জোন’ ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত ডিজিটাল পণ্যের একটি বড় প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের রিফারবিশড ল্যাপটপ বাজার ২০৩৩ সালের মধ্যে প্রায় ৮১৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।বাংলাদেশ এখানে কোথায় দাঁড়িয়ে? বাস্তবতা হলো, বর্তমান নীতির কারণে আমরা সরাসরি এসব ডিভাইস আমদানি করতে পারি না। ফলে এগুলো প্রথমে দুবাই বা অন্য হাবে গিয়ে রিফারবিশ হয়। পরে আমরা তৃতীয় দেশের মাধ্যমে বেশি দামে সেই পণ্য কিনি। অর্থাৎ আমরা একই পণ্যের জন্য বাড়তি মূল্য দিচ্ছি। কিন্তু এর ভ্যালু অ্যাডিশন, কর্মসংস্থান এবং শিল্পোন্নয়নের সুযোগ হারাচ্ছি।
এই প্রেক্ষাপটে সার্কুলার ইকোনমির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ৬২ মিলিয়ন টন ই-ওয়েস্ট উৎপন্ন হয়েছে, যার মাত্র ২২ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে রিসাইকেল হয়। অন্যদিকে একটি নতুন কম্পিউটার উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি, পানি ও কাঁচামাল প্রয়োজন। তাই একটি ডিভাইসের আয়ু বাড়ানো মানেই পরিবেশগত চাপ কমানো এবং সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। রিফারবিশমেন্ট এই সার্কুলার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু পরিবেশগত নয়; বড় অর্থনৈতিক সুযোগও। দেশে ইতোমধ্যে একটি শক্তিশালী অনানুষ্ঠানিক রিপেয়ার ইকোনমি রয়েছে। এলিফ্যান্ট রোড, বিসিএস কম্পিউটার সিটি বা বিভিন্ন জেলা শহরের মার্কেটে হাজার হাজার টেকনিশিয়ান কাজ করছেন। সঠিক নীতিগত সহায়তা পেলে এই দক্ষতা একটি পূর্ণাঙ্গ রিফারবিশমেন্ট শিল্পে রূপ নিতে পারে, যেখানে হাজার হাজার নতুন দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বিশেষ করে তরুণ প্রযুক্তিবিদ ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য।
কম্পিউটার ব্যবসায়ীদের জন্যও এটি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। রিফারবিশড পণ্যের একটি নিয়ন্ত্রিত বাজার চালু হলে তারা আমদানি, মেরামত, আপগ্রেড এবং বিক্রয়ের পুরো ভ্যালু চেইনে অংশ নিতে পারবে। এতে ব্যবসার পরিধি বাড়বে, মুনাফা বৃদ্ধি পাবে এবং গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প তৈরি হবে।
সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রয়েছে রপ্তানিতে। আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং অন্যান্য নিম্ন আয়ের দেশে সাশ্রয়ী প্রযুক্তির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বৈশ্বিক রিফারবিশড ইলেকট্রনিকস বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে ১৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ যদি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে রিফারবিশমেন্ট হাব গড়ে তুলতে পারে, তাহলে ‘রিফারবিশড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের মাধ্যমে এসব পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন একটি আধুনিক নীতি কাঠামো। সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত ও মানভিত্তিক আমদানি ব্যবস্থা, যেখানে শুধু সার্টিফায়েড ও কার্যক্ষম রিফারবিশড ডিভাইস আমদানির অনুমতি থাকবে। একই সঙ্গে একটি
বাধ্যতামূলক ‘ই ওয়েস্ট টেক ব্যাক’ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যাতে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট পরিমাণ ই-ওয়েস্ট পুনর্ব্যবহারের দায়িত্ব নেয়। এতে একটি পূর্ণাঙ্গ সার্কুলার ইকোনমি গড়ে উঠবে, যেখানে একটি পণ্যের জীবনচক্র হবে পরিকল্পিত, নিয়ন্ত্রিত ও টেকসই।
ড. ফয়সাল কবীর শুভ: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী পরিবেশ গবেষক, নগর পরিকল্পনাবিদ
shuvobuet81@gmail.com