1. shahajahanbabu@gmail.com : admin :
উচ্চারণের বিপরীতে এমপিদের দায় ও কথামালার রাজনীতি - Pundro TV
বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪৪ পূর্বাহ্ন



উচ্চারণের বিপরীতে এমপিদের দায় ও কথামালার রাজনীতি

অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬

মাহবুব আজীজ

 প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫৩ | আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:১০

সরকারের পর সরকার বদল ঘটেছে, অথচ কেন্দ্রীয় প্রশাসনের খবরদারি ও হস্তক্ষেপের কারণে দেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় প্রতীকের প্রচলন করে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সরকারের ভেদরেখা প্রায় মুছে গিয়েছিল।

উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন– কোথাও শাসনতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ কার্যকর হতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকার নিজের গঠিত স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সুপারিশও আমলে নেয়নি, বরং সিটি করপোরেশনে আমলা-নাগরিক প্রশাসক বসিয়ে কাজ চালিয়ে নিয়েছে। বর্তমান নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে আমলাদের জায়গায় দলীয় প্রশাসক বসিয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণের বিরূপ বাস্তবতায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে গত সপ্তাহে। সংসদে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার ও বিরোধী দলের একযোগে টেবিল চাপড়ানোর মধ্য দিয়ে উপজেলা পরিষদে কক্ষ বরাদ্দ পাচ্ছেন সংসদ সদস্য বা এমপিরা।

প্রতিটি উপজেলায় সংযুক্ত বাথরুম, আসবাবসহ এই ‘পরিদর্শন কক্ষ’ প্রস্তুত হবে। সংসদে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘কোনো সংসদীয় আসনে যদি চারটি উপজেলা থাকে, তাহলে প্রতিটি উপজেলা পরিষদে এমপিদের জন্য পরিদর্শন কক্ষথাকবে’ (সমকাল, ২২ এপ্রিল ২৬)।

স্থানীয় সরকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে এবং ‘কেন্দ্রীয় আইনপ্রণেতা’ এমপিরা স্থানীয় প্রশাসনের অংশ হবেন না– এটাই সংবিধানসম্মত ও সংগত; গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাও নিশ্চিতভাবে তা-ই। অথচ উপজেলা পরিষদে এমপিদের কক্ষ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত বিপরীত বার্তাই দেয়। এমপি স্বয়ং উপজেলা পরিষদে আবির্ভূত হলে তাঁর পারিষদবর্গ ও ক্ষমতার তাপে উপজেলা পরিষদের নিজস্বতা বলে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

সেখানে এমপিদের আদেশ-নির্দেশই শেষ কথা হয়ে উঠবে। অন্যথায় দ্বন্দ্ব অনিবার্য হবে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, এমপিরা কেন্দ্র বা ঢাকা থেকে ডিসি, ইউএনও বা এসপি-ওসিদের নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। বর্তমানে কক্ষ বরাদ্দের পর সেই কক্ষে স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের ডেকে নির্দেশনা দিতে থাকবেন এমপিরা। এতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও মাঠ প্রশাসনে এমপির কর্তৃত্ব আরও বাড়বে।

প্রত্যেক এমপি নিজস্ব সংসদীয় এলাকায় অফিস পরিচালনার জন্য মাসিক ১৫ হাজার টাকা ভাতা পেয়ে থাকেন। এই টাকায় যে কোনো উপজেলায় মানসম্পন্ন বাসা ভাড়ায় মেলে। তারপরও উপজেলা পরিষদে এমপিদের জন্য আলাদা কক্ষ বরাদ্দের উদ্দেশ্য কী? এনসিপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মুজাহিদ কক্ষ বরাদ্দের দাবি তুলে বলেছিলেন, এলাকায় তাদের বসবার জায়গা নেই!

তাই কক্ষ প্রয়োজন। এই দাবি পূরণের পর এনসিপির আরেক এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ দাবি তোলেন, জনগণের কাছে যাওয়ার জন্য এমপিদের গাড়ি দরকার। এমপিদের মাসিক বেতনের সঙ্গে গাড়ি সংরক্ষণ খরচ বাবদ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ আছে। কিন্তু এমপিদের গাড়ি নেই; কাজেই গাড়ি দরকার।

শুল্কমুক্ত গাড়ি বা প্লট না নেওয়ার ব্যাপারে এমপিরা একমত হয়েছেন– এটি যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি প্রতিটি উপজেলায় এমপিদের জন্য কক্ষ ও গাড়ি বরাদ্দের দাবি অবশ্যই সমালোচনাযোগ্য। যেসব এমপি বলছেন, জনগণের কাছে যাওয়ার জন্য তাদের কক্ষ ও গাড়ি দিতে হবে; তাহলে ভোটের আগে সেই তারাই একই জনগণের কাছে কোন উপায়ে পৌঁছেছিলেন?

২.
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বৃহস্পতিবার বলেছে– অর্থনীতি, সুশাসন ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের শুরুর সময়টিকে কাজে লাগানো উচিত বিএনপির। তারা পরামর্শ দিয়েছে, বিএনপির উচিত হবে প্রস্তাবিত সংস্কার নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে চলা।

চলমান সংসদ অধিবেশনের সিংহভাগ সময়ই দেখা যাচ্ছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোট নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বাদানুবাদ ও বিতর্ক। রোববার জানা গেল, গণভোটে ‘হ্যাঁ ক্যাম্পেইন’ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে এক কোটি টাকা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সভাপতি রিফাত রশিদ (সমকাল, ২৬ এপ্রিল, ২৬)। কেবল বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কোটি টাকা নয়,

গণভোটের আগে সরকার যেভাবে হ্যাঁ-এর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিল, তার ব্যয় সংস্থান ও নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সরকার ও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলই যখন ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে, তখন আর ভোট আয়োজনের প্রয়োজনই-বা ছিল কী?

এই প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত হলেও সংস্কার প্রশ্নে সরকারের অবস্থান অমীমাংসিত থাকলে জটিলতা বাড়তেই থাকবে। আইজিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপি সরকারের উচিত আওয়ামী লীগের সদস্য ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া। শেখ হাসিনার পতনের পর অনেককে ভিত্তিহীন অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। বিচার অপেক্ষমাণ থাকা অবস্থায় মাসের পর মাস– কোনো ক্ষেত্রে ১৮ মাসের বেশি তাদের আটক রাখা হয়েছে।

পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করে, যাদের অপরাধের পূর্ব রেকর্ড নেই কিংবা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি নন যারা, তাদের অবিলম্বে জামিন দেওয়া উচিত। বিচার ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক সুবিধার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে বর্তমানে নির্বাচিত সরকার বের হয়ে এলে দেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ
সুগম হবে।

৩.
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা বা দায়িত্ব কাঠামোয় অদল-বদল স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় একবার আসীন হলে ছলে-বলে-কৌশলে যতদিন সম্ভব টিকে থাকবার চেষ্টা চলে। এ দেশের মানুষ কয়েকবারই তা প্রত্যক্ষ করেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ, যে কোনো উপায়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখবার প্রাণান্ত ও সর্বগ্রাসী চেষ্টা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কাছে জাতির প্রত্যাশা স্বাভাবিকের চেয়ে তাই বেশি।

সংসদ সদস্যরা প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক ও প্রাসঙ্গিক তথ্য সংসদে উপস্থাপন করলে তা সংসদকে কার্যকর করতে ভূমিকা রাখবে। নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রোববার সংসদে বলেছেন, ‘বিরোধী দলের নেতা এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, এক হাজার ৪০০ শহীদের মধ্যে এক হাজার ২০০ জনের বাসায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে তাঁর। যেখানে সরকারি গেজেটে ৮৪৪ জন শহীদের কথা বলা হচ্ছে, তিনি সেখানে এক হাজার ২০০ শহীদের বাসায় কীভাবে গেলেন’ (সমকাল, ২৭ এপ্রিল, ২৬)? শফিকুর রহমান উত্তরে বলেছেন, ‘জাতিসংঘের ফ্যাক্ট কমিটি বলেছে, সংখ্যাটি এক হাজার ৪০০ জনেরও বেশি।’

১২শ শহীদের বাসায় যেতে কদিন সময় নিয়েছেন বিরোধী দলের নেতা? ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে ২৭ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত মোট অতিক্রান্ত দিনের সংখ্যা ৬৩১। এই সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সংস্কার সংলাপ, নির্বাচনী প্রস্তুতি, জাতীয় নির্বাচন ইত্যাদিসহ বিরোধীদলীয় নেতা ব্যক্তিগত-পারিবারিক জীবন সম্পন্ন করে ১২শ শহীদের বাসায় সশরীরে পৌঁছে গেলেন! এ তো মহাবিরল সাফল্য।

১২শ শহীদের বাসায় বিরোধীদলীয় নেতার আলোকচিত্র-শহীদের নাম ও সংখ্যার একটি নিখুঁত প্রামাণ্য উপস্থাপন হিসেবে নিশ্চিতভাবে বিবেচনা করা যাবে।
হয়তো অপ্রয়োজনীয় বলে খারিজ হবে এই আহ্বান; তবে এই অভাগা দেশের নির্বাচিত এমপিরা অহেতুক বাগাড়ম্বর ছেড়ে দায় ও দায়িত্বের মধ্যে নিজেদের রাখবেন– গণঅভ্যুত্থান-উত্তর সংসদের কাছে জাতির বিনীত আকাঙ্ক্ষা। মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
mahbubaziz01@gmail.com

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২
Developed By ATOZ IT HOST