বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বগুড়াকে ঢেলে সাজানোর নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। আওয়ামী লীগের সময়ে অবহেলিত বগুড়াকে ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশন ঘোষণা করা হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। তারই অংশ হিসেবে বগুড়া বিমানবন্দরকে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনার উপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে বিমানবন্দরটির সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, পেভমেন্ট ডিজাইন এবং নতুন টার্মিনাল ভবনের নকশাসহ সামগ্রিক কারিগরি সহায়তা দিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) পরামর্শক হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বগুড়া শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সদর উপজেলার এরুলিয়া (একলিয়া) এলাকায় অবস্থিত এই বিমানবন্দরটি মূলত একটি কার্গো বিমানবন্দর হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ১৯৯১-১৯৯৬ মেয়াদে বগুড়াকে মডেল জেলায় পরিণত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। সেই অনুযায়ী এরুলিয়া মৌজায় ১০৯ দশমিক ৮১ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়।
প্রকল্পের আওতায় ৪ হাজার ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০০ ফুট প্রস্থের রানওয়ে, অফিস ভবন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ভবন, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় রাস্তাঘাট নির্মাণ করা হলেও ২০০০ সালে এটি চালু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০০৬ সালের ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি পিটি-৬ প্রশিক্ষণ বিমান এখানে কার্যক্রম শুরু করে। এরপর থেকে বিমানবন্দরটি মূলত সামরিক প্রশিক্ষণ কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বর্তমানে বিমানবন্দরে ৪৫০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০০ ফুট প্রস্থের রানওয়ে, রানওয়ের শোল্ডার ১৫ ফুট এবং ট্যাক্সিওয়ের প্রস্থ ১৫ ফুট রয়েছে। অবকাঠামোর মধ্যে একটি চারতলা টার্মিনাল ভবন, একটি দোতলা ফায়ার স্টেশন, একটি পাওয়ার হাউস, একটি এইচ-টাইপ ভবন এবং প্রায় ১৪ হাজার ফুট সীমানা ফেন্সিং রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ বিমান বাহিনী দুটি নতুন ভবন নির্মাণ করছে এবং গত প্রায় ১৫ বছর ধরে এসব স্থাপনা সামরিক কাজে ব্যবহার করে আসছে।
বর্তমানে এখানে শুধু প্রশিক্ষণ বিমানের উড্ডয়ন ও অবতরণ হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে বিমান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় উপযুক্ত রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, এপ্রোন ও আধুনিক টার্মিনাল সুবিধা নেই। এমন অবস্থায় বিমানবন্দরটিকে মাঝারি আকারের বিমান যেমন বি-৭৬৭, বি-৭৩৭, এ-৩১০, এ-৩২১, এমডি-৮২ পরিচালনার উপযোগী করে গড়ে তুলতে ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রানওয়ে ১০ হাজার ফুট পর্যন্ত সম্প্রসারণ, নতুন এপ্রোন ও ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণ, আধুনিক যাত্রী টার্মিনাল ভবন নির্মাণ, সাইট উন্নয়ন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আইএলএস, ডিভিওআর/ডিএমই, ক্যাট-৩ এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং ও প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইটিং সিস্টেম স্থাপনসহ আনুষঙ্গিক কাজ।
প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবিত পরামর্শক সেবার কার্যপরিধিতে বগুড়া বিমানবন্দর উন্নয়নের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, পেভমেন্ট নকশা এবং নতুন যাত্রী টার্মিনাল ভবনের বিস্তারিত নকশা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার অংশ হিসেবে ভূসংস্থানিক জরিপ, মৃত্তিকা অনুসন্ধান, বিদ্যমান অবকাঠামোর লেআউট প্রস্তুত, পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং নিট বর্তমান মূল্য, ব্যয়-লাভ অনুপাত, অভ্যন্তরীণ মুনাফার হারসহ আর্থিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ করা হবে। পাশাপাশি বহুমুখী বেসামরিক ও সামরিক বিমান চলাচলের জন্য সমন্বিত মহাপরিকল্পনা এবং ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনাও প্রণয়ন করা হবে।
পেভমেন্ট নকশার আওতায় বিদ্যমান রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ে শক্তিশালীকরণ, রানওয়ে সম্প্রসারণ ও প্রশস্তকরণ, নতুন এপ্রোন ও ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণ, এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং স্থাপন এবং ডিভিওআর/আইএলএস স্থাপনের জন্য কার্যকর নকশা প্রস্তুত করা হবে। এ ছাড়া সংযোগ সড়ক, পার্কিং এলাকা এবং অন্যান্য অবকাঠামোর নকশা, দরপত্র নথি, পরিমাণ তালিকা এবং উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করা হবে।
টার্মিনাল ভবন নকশার অংশ হিসেবে নতুন যাত্রী টার্মিনাল ভবনের স্থাপত্য, কাঠামোগত ও অভ্যন্তরীণ নকশা, পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন, স্যানিটারি ও প্লাম্বিং ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, লিফট, চলন্ত সিঁড়ি এবং ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম (কনভেয়ার বেল্ট, চেক-ইন কাউন্টার, ক্যারোসেল) স্থাপনের বিস্তারিত পরিকল্পনা করা হবে।
একই সঙ্গে এয়ারসাইড ও ল্যান্ডসাইড উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ সড়ক, গাড়ি পার্কিং, ড্রেনেজ ও কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনাও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই পরামর্শক সেবার মাধ্যমে সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন, পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন, ভূ-প্রযুক্তিগত প্রতিবেদন, মহাপরিকল্পনা, ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, পেভমেন্ট ও টার্মিনাল নকশা, দরপত্র নথি এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন সময়সূচিসহ পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র প্রস্তুত হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডোর আবু সাঈদ মেহবুব খান আমাদের সময়কে বলেন, বগুড়া বিমানবন্দরকে বাণিজ্যিক রূপ দিতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব তা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বগুড়া বিমানবন্দর উন্নয়নে সম্ভাব্য ব্যয় হতে পারে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। এ বিমানবন্দর বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের কেন্দ্র হিসেবে বগুড়া এবং আশপাশের জেলাÑ জয়পুরহাট, নওগাঁ, গাইবান্ধা, জামালপুর ও সিরাজগঞ্জ সরাসরি উপকৃত হবে। কৃষিপণ্য, বিশেষ করে সবজি ও কৃষিযন্ত্রপাতি দ্রুত পরিবহন ও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটবে, বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রতিনিধিদের আগমন বাড়বে এবং ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় শিল্প প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে, বেকারত্ব হ্রাস পাবে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।