দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা ২৫ লাখ মেট্রিক টন, যার মধ্যে সরিষা আড়াই লাখ মেট্রিক টন এবং আড়াই লাখ মেট্রিক টন রাইসব্রান উৎপাদিত হয় দেশেই। চাহিদার বাদবাকি তেল এরই মধ্যে আমাদনি হয়েছে, মজুদও রয়েছে পর্যাপ্ত। তবুও বাজারে হঠাৎ করেই সয়াবিন তেলের ‘সংকট’ দেখা দিয়েছে। দাম বাড়ানোর পাশাপাশি অনেকটা অদৃশ্য নিত্যদিনের এ পণ্য। বাজারে সচরাচর সয়াবিন তেল মিলছে না। কয়েক দিনের ব্যবধানে রাজধানীর খুচরা বাজারে বোতলজাত ও খোলা—উভয় প্রকার সয়াবিন তেলের সরবরাহে ‘সংকট’ দেখা দিয়েছে। ভোক্তাদের অভিযোগ, ব্যবসায়ীরা সুযোগ বুঝে সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। অন্যদিকে আমদানিকারকরা দুষছেন বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও পরিবহন জটিলতাকে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মালিবাগ ও সেগুনবাগিচা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ৫ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল প্রায় দুষ্পাপ্য হয়ে পড়েছে। অনেক দোকানে ২ লিটারের বোতল মিললেও ১ লিটারের বোতলের জন্য ক্রেতাদের হন্যে হয়ে ঘুরতে হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ডিলাররা চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করছেন না।
বর্তমানে ৫ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের নির্ধারিত মূল্য ৯৫৫ টাকা হলেও অনেক জায়গায় তা ৯৭০ থেকে ৯৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেলের দামও লিটারপ্রতি ২ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, ডিলাররা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম রাখায় তারা বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এক বছর আগেও অর্থাৎ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে দেশের বাজারে এক লিটার সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১৬৮ থেকে ১৭৫ টাকা। বর্তমানে সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৮৯ টাকা হলেও খুচরা বাজারে তা ১৯২ থেকে ১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদিও তা অনেকটা দুষ্প্রাপ্য।
সরকার গত বছর ভোজ্যতেলের ওপর যে ভ্যাট ও শুল্ক ছাড় দিয়েছিল, তার মেয়াদ চলতি মাসে শেষ হওয়ার পথে। আমদানিকারক ও রিফাইনারি অ্যাসোসিয়েশন এই কর সুবিধা পুনরায় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে। শুল্ক ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার খবরে অনেক ব্যবসায়ী ভবিষ্যৎ লাভের আশায় মজুদ বাড়াতে শুরু করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে বর্তমানে ইসরায়েল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার ফলে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জাহাজ ভাড়া বা ফ্রেইট কস্টের ওপর। পণ্যবাহী জাহাজগুলো বিকল্প পথে চলাচলের কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সয়াবিন তেল আমদানিতে খরচ বাড়ছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
আবার দাম বেড়ে যাবে—এমন আশঙ্কায় সাধারণ ক্রেতারা প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত তেল কেনা শুরু করেছেন। ফলে বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহে টান পড়েছে। অনেক ক্রেতা একবারে ২০-৩০ লিটার তেল মজুদ করছেন, যা বাজারের কৃত্রিম সংকটকে আরও উসকে দিচ্ছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা বাজারে নিয়মিত তদারকি করছেন। মিল গেট থেকে ডিলার পর্যায় পর্যন্ত তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। কোনো অসাধু চক্র মজুদের মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সয়াবিন তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে শুধু বাজার তদারকি করলেই হবে না, বরং আমদানির
বিকল্প উৎস খোঁজা এবং সরকারি সংস্থা টিসিবির মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) উপপরিচালক শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, প্রতিদিন ৪৫০টি ট্রাকের মাধ্যমে সারা দেশে তারা ছাড়কৃতমূল্যে পণ্য সরবারাহ করছেন, যেখানে জনপ্রতি ২ লিটার সয়াবিন তেল বরাদ্দ রয়েছে।
অবশ্য ভোজ্যতেলের দাম বাড়বে না, সংকটও নেই এবং বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে বলে দাবি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের। তিনি বলেন, ‘আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনাকাটা করলে সাময়িকভাবে কিছু জায়গায় সরবরাহের চাপ তৈরি হতে পারে, যা পরিস্থিতিকে অযথা জটিল করে তুলতে পারে।’ গতকাল সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আমদানিকারক ও রিফাইনারি মালিকদের সঙ্গে ভোজ্যতেলের সার্বিক সরবরাহ পার্যালোচনাবিষয়ক সভা শেষে সাংবাদিকদের মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক দিনে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কোথাও কোথাও ভোজ্যতেলের সংকট বা লিটারে দুই টাকা বেশি দামে বিক্রির খবর প্রকাশ হওয়ায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে এ বৈঠক করা হয়।
বৈঠকে আমদানিকারক ও রিফাইনারি মালিকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য বসেছিলাম। বৈঠকে আমরা জানতে পেরেছি বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে। কোথাও কোথাও ভোক্তাদের আতঙ্কিত হয়ে বেশি বেশি কেনার প্রবণতার কারণে সাময়িকভাবে কিছু দোকানে মজুদ শেষ হয়ে যেতে পারে।’
এ সময় বাণিজ্যমন্ত্রী নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরে বলেন, ‘রাজধানীর একটি বাজারে গিয়ে দেখেছি রাস্তার পাশে বড় দোকানগুলোতে ভোজ্যতেল পর্যাপ্ত রয়েছে এবং বোতলের গায়ে নির্ধারিত দামই লেখা আছে। তবে বাজারের ভেতরের একটি দোকানে সীমিত তেল মজুদ রেখে প্রতি লিটারে দুই থেকে তিন টাকা বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছিল।’
ভোক্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আতঙ্কিত হয়ে বেশি বেশি কেনার কোনো প্রয়োজন নেই। বাজারে যেহেতু পণ্য আছে, তাই অযথা প্রতিযোগিতা করলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিতে পারে।’
এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘জ্বালানি তেলের মতো ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও কোনো সংকট নেই। জ্বালানি তেল, গ্যাস বা ভোজ্যতেল—কোনোটিতেই সংকট নেই। তাই এসব পণ্যের সঙ্গে সংকট শব্দটি যুক্ত করে অযথা বিভ্রান্তি তৈরি না করার আহ্বান জানাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে তদারকি কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে গুজব ও আতঙ্ক ছড়ানো থেকে বিরত থাকার জন্যও সবার প্রতি আহ্বান জানান।
বাজারে অনিয়ম হলে সরকার ব্যবস্থা নেবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজার তদারকি করছে এবং জেলা প্রশাসনও নিয়মিত অভিযান চালাবে।’