1. shahajahanbabu@gmail.com : admin :
গণমানুষের মহানায়ক’ মান্না - Pundro TV
বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০২:২৩ অপরাহ্ন



গণমানুষের মহানায়ক’ মান্না

অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বাংলা চলচ্চিত্রের পর্দায় তিনি যখন তর্জনী উঁচিয়ে হুঙ্কার দিতেন, মনে হতো এ যেন হাজারো শোষিত মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তিনি প্রেমের ছবিতে যেমন ছিলেন কোমল প্রেমিক, তেমনি অ্যাকশন দৃশ্যে ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে একাই একশ। তিনি ঢাকাই সিনেমার ‘মহানায়ক’ মান্না। আসল নাম এস এম আসলাম তালুকদার, কিন্তু কোটি ভক্তের হৃদয়ে তিনি শুধুই ‘মান্না ভাই’।

মৃত্যুর দেড় যুগ পেরিয়ে গেলেও তার শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি। আজ আমরা ফিরে দেখব টাঙ্গাইলের সেই চঞ্চল তরুণ আসলাম থেকে কীভাবে তিনি হয়ে উঠলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক ধ্রুবতারা।

১৯৬৪ সালের ১৪ এপ্রিল। টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেন এস এম আসলাম তালুকদার। বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম তালুকদার ও মা হাসিনা ইসলাম তালুকদারের আদরের এই সন্তানের শৈশব কেটেছে গ্রামীণ আবহে। কিন্তু তার চোখের স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া।

মাধ্যমিক পাস করে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় আসেন, ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজে। কিন্তু রাজনীতির মিছিল বা আড্ডার চেয়ে তাকে বেশি টানতো এফডিসির রূপালি জগত। রাজ্জাকের অন্ধ ভক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৮৪ সালটি ছিল তার জীবনের মোড় ঘোরানো বছর। এফডিসির ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ কার্যক্রমে হাজারো প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে তিনি নির্বাচিত হন। শুরু হয় আসলাম তালুকদার থেকে ‘নায়ক মান্না’ হয়ে ওঠার সংগ্রাম।

শুরুটা মসৃণ ছিল না। প্রথম দিকে ‘পাগলী’, ‘নিষ্পাপ’-এর মতো ছবিতে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করে নিজের জাত চেনান। কিন্তু মান্না জানতেন, তাকে রেসের ঘোড়া হতে হবে। সেই সুযোগ আসে ১৯৯১ সালে ‘কাসেম মালার প্রেম’ ছবির মাধ্যমে। একক নায়ক হিসেবে প্রথম ছবিতেই বাজিমাত!

এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে যখন সালমান শাহর অকাল মৃত্যুতে ইন্ডাস্ট্রি অভিভাবকহীন, তখন নিজের কাঁধে তুলে নেন পুরো চলচ্চিত্রের ভার। কাজী হায়াতের ‘দাঙ্গা’, ‘ত্রাস’, ‘তেজী’ ছবিগুলো তাকে প্রতিষ্ঠিত করে ‘অ্যাকশন হিরো’ হিসেবে। তার সেই বিশেষ বাচনভঙ্গি, ঘাড় দুলিয়ে হাঁটা আর সংলাপে আগুনের ফুলকি—এসবই হয়ে ওঠে তার ট্রেডমার্ক। রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সবার কাছেই তিনি হয়ে ওঠেন ‘নিজেদের লোক’।১৯৯৯ সাল। মুক্তি পায় মালেক আফসারী পরিচালিত ‘আম্মাজান’। এই ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক মাইলফলক। মাতৃভক্ত এক সন্তানের চরিত্রে মান্নার অভিনয় দর্শকদের চোখের জল মুছতে বাধ্য করেছিল। “আম্মাজান, আম্মাজান, চোখের মনি আম্মাজান”—গানটি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এই ছবির ব্যবসায়িক সাফল্য মান্নাকে নিয়ে যায় এক অন্য উচ্চতায়, যেখানে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

মান্না কেবল নিজের ক্যারিয়ার গড়েননি, তিনি ভেবেছেন পুরো ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে। ১৯৯৭ সালে গড়ে তোলেন নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘কৃতাঞ্জলি চলচ্চিত্র’। এখান থেকেই তিনি উপহার দেন ‘লুটতরাজ’, ‘স্বামী স্ত্রীর যুদ্ধ’, ‘আব্বাজান’-এর মতো মেগাহিট সব সিনেমা।

তবে তার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল অশ্লীলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ২০০০-এর পরবর্তী সময়ে ঢাকাই চলচ্চিত্রে যখন অশ্লীলতার কালো ছায়া নেমে আসে, তখন শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মান্না একাই রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এফডিসি থেকে অশ্লীলতা তাড়াতে তিনি যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, তা আজও ইন্ডাস্ট্রির মানুষের কাছে এক দৃষ্টান্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন, “পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখা না গেলে এই শিল্প বাঁচবে না।”

২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। দিনটি বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য এক অভিশপ্ত দিন। মাত্র ৪৪ বছর বয়সে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে চলে যান এই কিংবদন্তি। বুকের ব্যথা নিয়ে তিনি হেঁটে হাসপাতালে ঢুকেছিলেন, কিন্তু আর ফিরে আসেননি।

মান্নার স্ত্রী শেলী মান্না ও পরিবারের অভিযোগ, ইউনাইটেড হাসপাতালের চিকিৎসকদের অবহেলায় তার মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ২০০৮ সালেই মামলা হয়, যা আজ প্রায় ১৮ বছর ধরে আইনি জটিলতায় ঝুলে আছে। কোটি ভক্তের প্রিয় নায়কের মৃত্যুর সঠিক বিচার আজও মেলেনি—এটি আমাদের বিচারব্যবস্থার এক দীর্ঘশ্বাস হয়েই রয়ে গেছে।

মান্না চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন তার অমর সব সৃষ্টি। মৃত্যুর পরও তার বেশ কিছু ছবি মুক্তি পায়, যার মধ্যে ‘পিতা মাতার আমানত’ ও ‘জীবন নিয়ে যুদ্ধ’ উল্লেখযোগ্য। আর মুক্তির অপেক্ষায় আছে তার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ছবি ‘জীবন যন্ত্রণা’ (লীলা মন্থন), গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল ২০২৬ সালে মুক্তির কথা রয়েছে।

টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় তার কবরের পাশে দাঁড়ালে আজও শোনা যায় ভক্তদের দীর্ঘশ্বাস। মান্না প্রমাণ করে গেছেন, নায়কের চেহারা সুন্দর হতে হয় না, অভিনয়ের জোর আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকলেই ‘মহানায়ক’ হওয়া যায়। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন—গণমানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়, এক অবিনাশী নক্ষত্র হয়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২
Developed By ATOZ IT HOST