ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলো নির্বাচনের সময় রাজপথে কার্যত অনুপস্থিত ছিল। কখনও তারা নির্বাচন বয়কট করেছে, কখনও আবার শীর্ষ নেতাদের গণগ্রেপ্তারের মাধ্যমে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে পরিস্থিতি পুরোপুরি উল্টো।আওয়ামী লীগ এখন বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার উৎখাতে ভূমিকা রাখা বহু তরুণরা বলছেন, এবারের ভোটই হতে যাচ্ছে ২০০৯ সালের পর বাংলাদেশের প্রথম সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় নির্বাচন। ওই বছরই শেখ হাসিনা তার টানা ১৫ বছরের স্বৈরশাসন শুরু করেছিলেন।এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়ী হবে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি জোট শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে। পাশাপাশি, ৩০ বছরের কম বয়সী জেন-জি কর্মীদের নিয়ে গঠিত একটি নতুন রাজনৈতিক দল—যারা শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল—নিজেদের আলাদা ভোটব্যাংক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধেছে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকা তারেক রহমান রয়টার্সকে বলেছেন, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তার দল সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসন পাবে বলে আত্মবিশ্বাসী।
বিশ্লেষকদের মতে, বিভক্ত ফলাফলের পরিবর্তে যদি ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের নির্বাচনে একটি সুস্পষ্ট রায় আসে, তাহলে ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশে স্থিতিশীলতা ফেরানো সহজ হবে। শেখ হাসিনার পতনের পর কয়েক মাস ধরে চলা অস্থিরতা এবং তৈরি পোশাক শিল্পসহ বড় বড় খাতে যে ধাক্কা লেগেছে, তা কাটিয়ে উঠতে এই স্থিতিশীলতা জরুরি। এই নির্বাচনের ফলাফল দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে আঞ্চলিক দুই শক্তি—চীন ও ভারতের ভবিষ্যৎ প্রভাবের দিকও নির্ধারণ করবে।
ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, ‘জনমত জরিপে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও আমাদের মনে রাখতে হবে, এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার সিদ্ধান্তহীন। ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখবে জেন-জি ভোটাররা, যারা মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।’
সারা দেশে এখন চোখে পড়ছে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ এবং জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের কালো-সাদা পোস্টার ও ব্যানার। গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি ও দেয়ালে সাঁটানো এসব পোস্টারের পাশাপাশি রয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রচারণা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দলীয় অস্থায়ী কার্যালয় থেকে ভেসে আসছে প্রচারণার গান। অতীতের নির্বাচনগুলো থেকে এটি একেবারেই একটি বিপরীত চিত্র, যখন আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীক পুরো নির্বাচনী পরিবেশ দখল করে থাকত।
জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামি এবার তাদের ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফল করতে পারে, যদি সরকার গঠন নাও করতে পারে। দলটি বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের রায় আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশে চীন ও ভারতের ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ করবে। শেখ হাসিনা ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ভারতে আশ্রয় নেন, যেখানে তিনি এখনও অবস্থান করছেন। এর ফলে ঢাকায় ভারতের প্রভাব কিছুটা কমেছে, আর চীনের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে।
বিএনপিকে তুলনামূলকভাবে সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্কে আগ্রহী হলেও, জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। এছাড়া জামায়াতের জেন-জি মিত্র দলটি বলেছে, ‘বাংলাদেশে দিল্লির আধিপত্য’ তাদের অন্যতম উদ্বেগের বিষয়, এবং তাদের নেতারা সম্প্রতি চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন।
তবে জামায়াত দাবি করেছে, তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নয় এবং ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ গঠনের পক্ষে তারা অবস্থান নিলেও পররাষ্ট্রনীতিতে নিরপেক্ষ থাকবে। অন্যদিকে, বিএনপির তারেক রহমান বলেছেন, সরকার গঠন করতে পারলে তারা সেই সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখবে, যারা বাংলাদেশের জনগণ ও দেশের জন্য উপযোগী প্রস্তাব দেবে।
বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার মুখে পড়েছে। ফলে ২০২২ সাল থেকে দেশটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা নিতে বাধ্য হয়েছে।
ঢাকার থিঙ্কট্যাংক কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের কাছে দুর্নীতি সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, এরপরেই রয়েছে মূল্যস্ফীতি।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের প্রতি মানুষের আগ্রহের পেছনে তাদের ‘পরিষ্কার ভাবমূর্তি’ বড় কারণ, ধর্মীয় অবস্থান নয়।
জরিপে বলা হয়েছে, ভোটাররা ব্যাপকভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী এবং তারা ধর্মীয় বা প্রতীকী বিষয়ের চেয়ে দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সংকটকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছেন, যারা যত্নশীল, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক।
তবে সব মিলিয়ে বিএনপির তারেক রহমান—সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে—পরবর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে এগিয়ে রয়েছেন। যদিও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট জয়ী হলে, দলটির চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে থাকতে পারেন।
২১ বছর বয়সী প্রথমবারের ভোটার মোহাম্মদ রাকিব বলেন, তিনি চান নতুন সরকার জনগণকে মত প্রকাশ ও স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেবে। তিনি বলেন, ‘সবাই আওয়ামী লীগে ক্লান্ত ছিল। মানুষ জাতীয় নির্বাচনে ভোটই দিতে পারেনি। কারও কোনো কণ্ঠস্বর ছিল না। আমি আশা করি, যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তারা এই মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।’