ঢাকাকে বাসযোগ্য ও নিরাপদ শহর হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিএনপি আয়োজিত পথসভায় বক্তব্য প্রদানকালে তিনি আরও বলেন, ভাগ্য পরিবর্তনে এবারের নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা ১৭, ১৬, ১৫, ১৪, ১২ ও ১১ আসনের পথসভায় বক্তব্য দেন তারেক রহমান। আজ সোমবার ঢাকায় দ্বিতীয় দিনের মতো আটটি পথসভায় অংশ নেবেন তিনি। এ ছাড়া আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে আজ জাতির উদ্দেশেও ভাষণ দেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান, যা বিটিভিতে সম্প্রচার করা হবে।
গতকাল তার পথসভায় ঢল নামে লাখো কর্মী-সমর্থক ও জনতার। নিজ আসন ঢাকা-১৭ নির্বাচনী এলাকার ইসিবি চত্বরে পথসভায় বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এদিন নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। গুলশানের বাসভবন থেকে বের হওয়ার পর পথে পথে তিনি সিক্ত হন অসংখ্য কর্মী-সমর্থকের ভালোবাসায়। ফলে ইসিবি চত্বর পর্যন্ত পৌঁছতেই দুই ঘণ্টা লেগে যায় তার। বিকাল পৌনে ৪টার দিকে তারেক রহমান ইসিবি চত্বরে পৌঁছান। সেখানে আয়োজিত পথসভায় বক্তব্য প্রদানকালে নিজেকে এলাকার সন্তান দাবি করেন তিনি; ভোট চান তার নিজের জন্য ও ধানের শীষের প্রার্থীদের জন্য।
বিএনপি চেয়ারম্যান নিজ পরিচয় তুলে ধরে বলেন, আমি এ আসন (ঢাকা-১৭) থেকে প্রার্থী হয়েছি। আমি আপনাদের প্রার্থী, ধানের শীষের প্রার্থী। আমি এই এলাকারই সন্তান; শৈশব থেকে আমি এ এলাকাতেই বড় হয়েছি। আমার সন্তানও এ এলাকায় জন্মগ্রহণ করেছে এবং আমার ভাইয়ের, আমাদের বিয়ে-শাদি এ এলাকাতেই হয়েছে। কাজেই আমি এই এলাকারই সন্তান। এলাকার সন্তান হিসেবে এলাকার মুরব্বি, মায়েদের কাছে, ভাই-বোনদের কাছে ধানের শীষের জন্য ভোট চাইছি। আমি ধানের শীষকে জয়যুক্ত করার জন্য আমার এলাকাবাসী ভাই-বোন, মুরব্বিদের বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছিÑ আপনারা এই এলাকায় ধানের শীষকে নির্বাচিত করুন।
এ সময় ঢাকা নগরীতে ৪০টি খেলার মাঠ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারেক রহমান বলেন, আমার দল আপনাদের ভোটে নির্বাচিত হলে পুরো দেশের সব শহর এবং এই ঢাকা শহরকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য শহরে রূপান্তরিত করতে চাই। যে শহরে মা-বোনরা নিরাপদে-নিশ্চিন্তে যে কোনো সময় হাঁটতে পারবেন; যে শহরের মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন; ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি করতে পারবেন। আমরা ঢাকাকে একটি সুন্দর নগরী হিসেবে গড়তে তুলতে চাই, যে নগরীর মানুষ বুক ভরে শ্বাস নিতে পারবেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে শুধু এই এলাকাতে নয়, ঢাকা শহরে অন্তত ৪০টি খেলার মাঠ তৈরি করব; যাতে করে আমাদের সন্তানরা খোলা মাঠে খেলাধুলা করতে পারে, যাতে করে আমাদের মুরব্বিরা, মা-বোনেরা বিকাল বেলায় বা তাদের প্রয়োজনে মাঠে হাঁটা-চলা করতে পারেন। একই সঙ্গে এলাকার ইসিবি চত্বর থেকে জসিম উদ্দিন সড়ক পর্যন্ত নাগরিকবান্ধব করারও প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান।
এরপর ঢাকা-১৬ আসনভুক্ত পল্লবীর ২ নম্বর ওয়ার্ডের লাল মাঠের পথসভায় যোগ দেন তারেক রহমান। এ সময় তিনি এ আসনে বিএনপির প্রার্থী আমিনুল হকের সঙ্গে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেন এবং ভাগ্য পরিবর্তনে ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান। বিএনপি চেয়ারম্যান আরও বলেন, ভোট দিয়ে শুধু প্রতিনিধি নির্বাচন করলেই চলবে না। এ নির্বাচন হতে হবে দেশ পুনর্গঠনের নির্বাচন; এ নির্বাচন হতে হবে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের নির্বাচন। তিনি আরও বলেন, আপনাদের প্রতিবেশী হিসেবে ঢাকা-১৬ আসন দেখার দায়িত্বও আমার মধ্যে পড়ে। আপনাদের সন্তান হিসেবে, প্রতিবেশী হিসেবে আপনাদের সঙ্গে আমি আগে যেমন ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব। আপনারা ১২ তারিখ পর্যন্ত আমিনুল হককে দেখে রাখবেন। সে জিতলে ১৩ তারিখ থেকে এলাকার মানুষের দেখভাল করছে কিনা, এ এলাকার উন্নয়নে কাজ করছে কিনাÑ সেটি দেখার দায়িত্ব আমার।
এরপর মিরপুর-১০ নম্বর সেনপাড়া আদর্শ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ঢাকা-১৫ আসনের পথসভায় অংশ নেন তারেক রহমান। শফিকুল ইসলাম মিল্টনকে ধানের শীষ হাতে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। কিন্তু ঢাকা-১৫ অধিবাসীদের কাছে জানতে চাইÑ আপনাদের কী পরিকল্পনা ১২ তারিখে, বলুন। সভায় উপস্থিত হাজারো কণ্ঠে তখন সমস্বরে উচ্চারিত হয়Ñ ‘ধানের শীষ, ধানের শীষ।’
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ১২ তারিখে বিজয়ী হলে বিএনপি পর্যায়ক্রমিকভাবে যেসব পরিকল্পনা দেশের মানুষের জন্য গ্রহণ করেছে এবং এ এলাকার মানুষের জন্য যেসব প্রতিশ্রুতি আমরা তুলে ধরেছি, পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়ন করব। বিএনপি সবসময় বিশ্বাস করে, জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। আমরা এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে চাই না, যা মানুষের সাধ্য ও সক্ষমতার বাইরে বা যা ইহজগতে সম্ভব নয়। যা মানুষের পক্ষে বাস্তবায়ন সম্ভব, এমন প্রতিশ্রুতিই দিচ্ছি।
এরপর ঢাকা-১৪ আসনের ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে পথসভায় অংশ নেন তারেক রহমান। সেখানে তিনি বিএনপির প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলিকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশের মানুষের ভোটাধিকার, বাক-স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। আগামী ১২ তারিখ সেই কেড়ে নেওয়া অধিকার ফিরে পাওয়ার দিন।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, স্বৈরাচারী শাসনামলে গুম, খুন ও নির্যাতনের যে ভয়ংকর বাস্তব চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা হয়েছে, এর অন্যতম সাক্ষী তুলি নিজেই। ধানের শীষের প্রার্থী তুলি গুমের রাজনীতির প্রত্যক্ষ শিকার। এ নির্মমতার মূল্য দিয়েছে তার পরিবার। একই সঙ্গে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার আজ এ জনসভায় উপস্থিত থেকে সেই ত্যাগের সাক্ষ্য দিচ্ছেন। আমরা কি তাদের এই মহান ত্যাগ বৃথা যেতে দিতে পারি? না, পারি না। এ ত্যাগ বৃথা যেতে না দিতে হলে প্রথম ও প্রধান কাজ হলোÑ ভোটের অধিকারকে সত্যিকার অর্থে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা। এ ছাড়া গত ১৬ বছরে বহু মানুষ অকাতরে জীবন দিয়েছেন। অসংখ্য মানুষ গুম, নির্যাতন ও কারাবরণের শিকার হয়েছেন। এ জনসভায় যারা বসে আছেন, তাদের অনেকের স্বজন জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন।
এরপর শ্যামলী ক্লাব মাঠের পথসভায় ঢাকা-১৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী ববি হাজ্জাজকে পরিচয় করিয়ে দেন তারেক রহমান। বলেন, এ নির্বাচন হচ্ছে আপনার রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করার নির্বাচন। গত ১৬ বছর দেশে তথাকথিত নির্বাচন হয়েছে; আপনারা কেউ ভোট দিতে পারেননি। এবারের এই ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে গিয়ে বহু মানুষ গুম-খুন-হত্যার শিকার হয়েছেন, আহত হয়েছেন। পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার ক্ষমতা ধরে রাখতে ১৪শ’র বেশি মানুষকে হত্যা করেছে, ২০ হাজারের অধিক মানুষ নানাভাবে আহত হয়েছেন। মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে মেগা দুর্নীতি হয়েছে। মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়নি, এলাকার উন্নয়ন হয়নি।
সেখান থেকে তারেক রহমান যান ঢাকা-১২ আসনের ঢাকা পলিটেকনিক ইনসস্টিটিউট মাঠের পথসভায়। এ আসনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাইফুল হককে পরিচয় করিয়ে দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। সবশেষে সাঁতারকুল স্যানভ্যালি মাঠের পথসভায় ঢাকা-১১ আসনে বিএনপির প্রার্থী এমএ কাইয়ুমকে পরিচয় করিয়ে দেন এবং ধানের শীষের জন্য ভোট চান তারেক রহমান।