কোরবানি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। এটা আদম (আ.)-এর যুগ থেকে বিদ্যমান ছিল। সুরা মায়েদায় (আয়াত ২৭-৩১) আদম (আ.)-এর দু’সন্তানের কোরবানির কথা এসেছে। তবে প্রত্যেক নবীর শরিয়তে কোরবানির পন্থা এক ছিল না।
ইসলামি শরিয়তে কোরবানির যে পদ্ধতি নির্দেশিত হয়েছে, তার মূল সূত্র ‘মিল্লাতে ইবরাহিমি’তে বিদ্যমান ছিল। কোরআন মাজিদ ও সহিহ হাদিস থেকে তা স্পষ্ট জানা যায়। এজন্য কোরবানিকে ‘সুন্নতে ইবরাহিমি’ নামে অভিহিত করা হয়। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এই ইবাদত পালন করে না, তার ব্যাপারে হাদিস শরিফে কঠোর বার্তা এসেছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যার কোরবানির সামর্থ্য আছে তবুও সে কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ (মুসনাদে আহমদ: ২/৩২১, মুস্তাদরাকে হাকেম: ৭৬৩৯, আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব: ২/১৫৫)
কী ধরনের পশু দিয়ে কোরবানি করতে হবে?অহিংস্র গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু দিয়ে কোরবানি করতে হবে। শরিয়তে কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি পছন্দের পশু। মহানবী (সা.) উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা ছাড়া অন্য কোনো পশু কোরবানির অনুমোদন দেননি। তাই এসব পশু দিয়েই কোরবানি করতে হবে।
পশুর ক্ষেত্রে উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি ১ বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে, দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয় তাহলে তা দ্বারাও কোরবানি করা জায়েজ। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের হতে হবে। তবে, ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কোরবানি জায়েজ হবে না। (ফাতাওয়া কাজীখান: ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০৫-২০৬)
কোন ধরনের পশু দিয়ে কোরবানি হবে না?
রাজধানীর জামিয়া ইসলামিয়া বায়তুস সালামের (মিরপুর-১২) সিনিয়র মুফতি আবদুর রহমান হোসাইনী কালবেলাকে বলেন, নির্দিষ্ট পশুর বাইরে যেমন অন্য কোনো পশু দিয়ে কোরবানি করা যায় না, তেমনি কোরবানির পশু দোষত্রুটিমুক্ত হওয়াও শর্ত। পশুর মধ্যে বিশেষ কিছু ত্রুটি থাকলে সেটা দিয়ে কোরবানি দেওয়া যাবে না। যেসব ত্রুটিযুক্ত পশু দিয়ে কোরবানি হয় না, এখানে সেগুলো উল্লেখ করা হলো—
১. যে পশু কেবল তিন পায়ে চলে, এক পা মাটিতে রাখতেই পারে না— সে পশু দিয়ে কোরবানি করা যাবে না।
২. যে পশুর সব দাঁত পড়ে গেছে কিংবা এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে, দাঁত পড়ে যাওয়ার কারণে ঘাস বা খাদ্য চিবিয়ে খেতে পারে না— এমন পশু দিয়ে কোরবানি করলে সহিহ হবে না। তবে যদি ঘাস বা খাদ্য চিবিয়ে খেতে পারে, তাহলে কোরবানি করা বৈধ হবে।
৩. যে পশুর শিং গোড়া থেকে ভেঙ্গে গেছে। যে কারণে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে পশু দিয়ে কোরবানি করা যাবে না। তবে যদি শুধু শিংয়ের উপরিভাগ ভেঙ্গে যায় অথবা জন্মগতভাবেই শিং না ওঠে, তাহলে কোরবানি করা বৈধ।
৪. যে পশু এত বেশি দুর্বল যে, জবাই করার স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না— সে পশু দিয়ে কোরবানি করা নাজায়েজ।
৫. যদি কোনো পশুর কানের অর্ধেক বা তারও বেশি কাটা হয়, তাহলে সে পশু দিয়ে কোরবানি করা নাজায়েজ। কিন্তু যদি কানের অর্ধেকের কম কাটা হয়, তাহলে সে পশু দিয়ে কোরবানি করা বৈধ।
৬. যদি কোনো পশু অন্ধ হয়, তথা দুটি চোখ পরিপূর্ণ নষ্ট, তাহলে সে পশু দিয়ে কোরবানি করা যাবে না। তেমনিভাবে যদি একটি চোখ পরিপূর্ণ নষ্ট, তাহলে সে পশু দিয়েও কোরবানি করা যাবে না।
৭. যদি কোনো পশুর লেজের অর্ধেক বা তারও বেশি কাটা হয়, তাহলে সে পশু দিয়ে কোরবানি করা যাবে না। কিন্তু যদি লেজের অর্ধেকের কম কাটা হয়, তাহলে সে পশু দিয়ে কোরবানি করা বৈধ।
৯. যে ভেড়া-ছাগলের মাত্র একটি স্তন আছে, সে ভেড়া/ছাগল দিয়ে কোরবানি সহিহ হবে না।
১০. গরু বা মহিষের কেবল দুটি স্তন থাকলে কোরবানি সহিহ হবে না। তবে তিনটি করে থাকলে কোরবানি সহিহ হবে।
১১. ভেড়া-ছাগলের একটি স্তন শুকিয়ে গেলে (তথা মাত্র এক স্তন দিয়ে দুধ আসে, আর অন্য স্তন দিয়ে দুধ আসে না) কোরবানি সহিহ হবে না।
১২. গরু-মহিষের দুটি স্তন শুকিয়ে গেলে (তথা মাত্র দুই স্তন দিয়ে দুধ আসে, আর অন্য দুটি স্তন দিয়ে দুধ আসে না) কোরবানি সহিহ হবে না।
১৩. পাগল পশু দিয়ে কোরবানি করা বৈধ। তবে যদি এমন পাগল হয় যে, ঘাস-পানি দিলে খায় না এবং মাঠেও চরে না, তাহলে তা দিয়ে কোরবানি সহিহ হবে না।
উল্লেখ্য, বন্ধ্যা পশু দিয়ে কোরবানি করা বৈধ। অনুরূপভাবে খাসিকৃত পশুর কোরবানি বৈধ এবং হিজড়া পশুর কোরবানিও বৈধ। এছাড়া পশু কোরবানি করার সময় দস্তাদস্তি করার কারণে কোনো দোষ ত্রুটি সৃষ্টি হলে, সে পশু দিয়ে কোরবানি করা বৈধ। (রাদ্দুল মুহতার: ৯/৪৭০)