আসন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে এক মাস আগ থেকে প্রস্তুতি শুরু করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। দলটি ইতোমধ্যেই রাজধানী ঢাকাসহ ১০টি সিটি করপোরেশনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। আগামী ১০ মে আরো কিছু পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবে।
জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আসন নিশ্চিত হওয়ার পর স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। দু’-চারটি সিটিতে দলটি মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করলেও সারাদেশের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচনী তৎপরতা শুরু করেছেন। জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীরা ভোটারদের ঘরে ঘরে যাচ্ছেন এবং উঠান বৈঠক করছেন। ব্যতিক্রম শুধু ক্ষমতাসীন বিএনপি। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় এবং সরকার গঠনের পর দলটি যেন ‘মাঠে’ নাই হয়ে গেছে।
সরকার আর বিএনপি একাকার হয়ে যাওয়ায় জামায়াত-এনসিপি স্থানীয় নির্বাচন ইস্যুতে মাঠে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের কারণে মাঠ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।
দলীয় প্রধান হিসেবে তিনি বিএনপির সর্বস্তরের নেতানেত্রীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেই সরকার পরিচালনা করতে চান। দল যাতে সরকারের ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করে। নেতারা যাতে তার চিন্তা-চেতনা ধারণ করে সাংগঠনিক কর্মকা- পরিচালনা করে সে নির্দেশনা দিতে চান।
এ অবস্থায় বিএনপির চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের সক্রিয় করে তুলতে যৌথ মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছেন।
এই মতবিনিময়ে বিএনপির ৮২টি সাংগঠনিক জেলার সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবদের অংশ নেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল ও ছাত্রদলের নেতারাও থাকবেন। আজ শনিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিতব্য এ সভা নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সারা দেশ থেকে নেতারা ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন।
দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে থেকে দেশে ফেরার পর এটিই হচ্ছে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সারা দেশের জেলা ও মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক ইউনিট এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাদের প্রথম মতবিনিময় সভা।
জানা যায়, দল ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির অভ্যন্তরে বিভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ ১৯ বছর জুলুম-নির্যাতন সয়ে দলকে সক্রিয় করে রাখা নেতাদের অনেকেই মন্ত্রী-এমপি পদে বসতে পারেননি।
আবার মন্ত্রী এমপি হয়েছেন এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেছেন এমন অনেক নেতার সঙ্গে দলের মূল্য ¯্রােতের নেতাকর্মীদের পরিচয় নেই, সম্পর্ক নেই। যারা কারণে কেউ হতাশ, আবার কেউ সাংগঠনিক কার্যক্রমের চেয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। অন্যদিকে আগামী স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামী কচ্ছপের মতোই নিরবচ্ছিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া এমন চিত্র পেয়েই দলের চেয়ারম্যান মতবিনিময় সভার আয়োজন করছেন।
তিনি নিজেকে সরকারের পাশাপাশি সারাদেশের নেতাকর্মীদের আরো কাছাকাছি যেতে চান। তাদের কথা শুনতে চান। স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে তাদের মতামত চান। বিএনপির কয়েকজন নেতা জানান, স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে যেমন আলোচনা হবে; তেমনি দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলের সাংগঠনিক সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে মতবিনিময় সভায় আলোচনা হবে।
বিশেষ করে দল পুনর্গঠন ও দলের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে বেশ কিছুু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে সভা থেকে। একদিকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সঙ্গে দলের এমপি ও নেতাদের দূরত্ব কমানো; আন্যদিকে সরকারের ভ্যানগার্ড যে রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক শক্তি সে বার্তা দেয়া হবে। এছাড়া সেখানে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কার্যক্রমের মূল্যায়নসহ গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরা হতে পারে। যেন সর্বস্তরের নেতাকর্মীর কাছে সরকারের সঠিক বার্তা পৌঁছে দিতে পারেন সভায় উপস্থিত নেতারা।
অপ্রিয় হলেও সত্য, বছরের পর বছর জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে রাজপথে থাকা বিএনপি নেতাকর্মীরা এখন মাঠে নেই। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদে যাদের বসানো হয়েছে তাদের বেশির ভাগেই মাঠের নেতাকর্মীদের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে নেতাকর্মীরা যে যার মতো করে চলছেন। এমন পরিস্থিতিতে পুরান ঢাকার ইসহাক সরকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতা দল ত্যাগ করে এনসিপিতে যোগদান করেছেন। সরকারি দল থেকে অন্য দলে যোগদানের বার্তা ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য মঙ্গলজনক নয়।
তাছাড়া আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষ জামায়াত-এনসিপি সক্রিয় এবং প্রার্থী চূড়ান্তকরণ করলেও বিএনপি একেবারেই পিছিয়ে রয়েছে। দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। তাই স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রতিযোগিতায় সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া সরকার গঠনের পর এমপি এবং পরাজিত প্রার্থীরা থেকে শুরু করে জেলা উপজেলার নেতারা সার্বক্ষণিকভাবে সচিবালয়কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছেন। আবার প্রতিমন্ত্রী-এমপিদের মধ্যে কয়েকজন নেতা রয়েছেন, যারা বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতাও।
তারা সরকারি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় যার যার সংগঠনে সময় দিতে পারছেন না। ফলে এসব অঙ্গ-সংগঠনসহ খোদ বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে নেমে এসেছে স্থবিরতা। এর মধ্যেই দলের ভেতর থেকে তাগিদ উঠেÑ সরকারের পাশাপাশি দলকে সক্রিয় করার। এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে দল ও বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর কথাও বলেন কেউ কেউ। সার্বিক বিষয়গুলো নিয়ে মতবিনিময়ের লক্ষ্যেই তারেক রহমান ঢাকায় মতবিনিময় সভার আয়োজন করেন।
বিএনপির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকারি কাজে ব্যস্ততায় রাজনৈতিক কর্মসূচি, দলের আদর্শিক চর্চা এবং সংগঠন শক্তিশালী করার কাজ ঝিমিয়ে পড়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তৃণমূল পর্যায়ে। কর্মীদের মধ্যে আগের মতো উদ্দীপনা ও সক্রিয় কর্মকা- নেই। অনেকেই দলীয় কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। তাছাড়াও বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সহযোগী ও অঙ্গ-সংগঠনের কিছু নেতার অগ্রহণযোগ্য কর্মকা- মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জনগণের চোখে সরকার ও দলকে আলাদা করা যায় না। দলীয় কর্মীরা খারাপ আচরণ মানুষ সরকারকে দায়ী করছে। এটি সরকার ও দল উভয়ের জন্যই সতর্কবার্তা।
স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি ও দল এবং সরকারের ভাবমর্যাদা রক্ষায় সাংগঠনিক শৃঙ্খলা জোরদার এবং চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের উদ্যোগ নিতেই এই মতবিনিময়। মূলত স্থানীয় নির্বাচনের দিকনির্দেশনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সমন্বয়হীনতা এবং কিছু নেতাকর্মীর উচ্ছৃঙ্খল আচরণে সরকার ও দলের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ হওয়ার আশঙ্কা থেকে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব এখন সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনে জোর দিচ্ছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্থানীয় নির্বাচনসহ আদর্শিক অবস্থান ধরে রেখে দল পরিচালনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেবেন। সরকারের বিরুদ্ধে জামায়াতের অপপ্রচার এবং ১১ দলীয় জোটের আন্দোলনের হুমকি-ধমকি বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়া হতে পারে। তাছাড়া জুলাই সনদ নিয়ে জামায়াত-এনসিপি জনগণের মধ্যে যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সঠিক তথ্য উপস্থাপনের জন্য দিকনির্দেশনা দেয়া হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতি সরকার বাস্তবায়ন শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু হয়েছে।