ইউক্রেনজুড়ে এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন বিমান হামলা চালিয়েছে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী। প্রায় ১০০০ ড্রোন এবং ২৩টি ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করে চালানো এই নব্য অভিযানে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে সাতজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধের দিকে সরে যাওয়ার সুযোগে মস্কো ইউক্রেনে তাদের আক্রমণ বহুগুণ জোরালো করেছে। পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর চার বছর পর এটিকে অন্যতম বৃহত্তম এবং ধ্বংসাত্মক বিমান হামলা হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, রাশিয়ার এই আক্রমণ ছিল সুপরিকল্পিত ও দ্বিমুখী। সোমবার রাতভর মস্কো প্রায় ৪০০টি দূরপাল্লার ড্রোন এবং ২৩টি ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করে। এই রেশ কাটতে না কাটতেই মঙ্গলবার দিনের আলোতে অস্বাভাবিকভাবে আরও ৫৫৬টি ড্রোনের বিশাল বহর নিয়ে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয়। বিশেষ করে পশ্চিম ইউক্রেনের লভিভসহ বিভিন্ন বড় শহরগুলোকে লক্ষ্য করে এই কামিকাজে ড্রোনগুলো আছড়ে পড়ে, যার বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই হামলার সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছে লভিভ শহরে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যতালিকাভুক্ত মধ্যযুগীয় এই শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত ষোড়শ শতাব্দীর ঐতিহাসিক বের্নার্ডিন মঠে একটি রুশ ড্রোন সরাসরি আঘাত হেনেছে। ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইউক্রেনের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এছাড়া লভিভের একটি ব্যস্ত রাস্তায় দিনের বেলায় ড্রোনের আকস্মিক বিস্ফোরণে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদমির জেলেনস্কি এক জরুরি বার্তায় জানিয়েছেন যে, রাশিয়ার এই বিধ্বংসী হামলায় দেশের অন্তত ১১টি অঞ্চলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি
হয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক মিত্রদের কাছে দ্রুত আরও বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সক্ষম প্যাট্রিয়ট মিসাইল সরবরাহের জোরালো আবেদন জানিয়েছেন। জেলেনস্কি উদ্বেগের সাথে সতর্ক করেছেন যে, ওয়াশিংটনের বর্তমান মনোযোগ ইরান যুদ্ধের দিকে বেশি থাকায় ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, যা দেশটিকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
রাশিয়ার এই হামলার প্রভাব কেবল ইউক্রেনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, প্রতিবেশী দেশ মলদোভাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাতের হামলায় ইউরোপের সঙ্গে সংযুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মলদোভায় বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মলদোভা সরকার নাগরিকদের ব্যস্ত সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর নির্দেশ দিয়েছে।রণক্ষেত্রের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, বসন্তকালীন আবহাওয়া উন্নতির সাথে সাথে রুশ বাহিনী তাদের অভিযান আরও জোরালো করেছে। ইউক্রেনের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি সেনা নিয়ে মস্কো বর্তমানে পূর্ব ও দক্ষিণ সীমান্তে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। পূর্ব দোনেৎস্ক অঞ্চলে রুশ বাহিনী ধীরে ধীরে সামনে অগ্রসর হয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর স্লোভিয়ানস্কের মাত্র ২০ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে গেছে। একই সাথে জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলেও রুশ বাহিনীর অগ্রগতির খবর পাওয়া গেছে, যা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে রাশিয়ার এই ১০০০ ড্রোনের হামলা ইউক্রেন যুদ্ধের মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।