1. shahajahanbabu@gmail.com : admin :
অনলাইনে মন বসে না, শ্রেণিকক্ষেই স্বস্তি - Pundro TV
বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ১২:০৮ অপরাহ্ন



অনলাইনে মন বসে না, শ্রেণিকক্ষেই স্বস্তি

অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬

দুপুরের তপ্ত রোদেও রাজধানীর বনশ্রী ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণিকক্ষটি প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। হোয়াইট বোর্ডে মার্কারপেন দিয়ে জ্যামিতির বৃত্ত আঁকছেন গণিতের শিক্ষক। প্রথম বেঞ্চে বসা রাফসান একাগ্রচিত্তে তাকিয়ে আছে সেদিকে। স্যারের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, কণ্ঠের ওঠানামা আর চোখের ইশারা যেন গভীর মনোযোগে গ্রহণ করছে।

ক্লাস শেষে কথা বলতে চাইলে একগাল হেসে রাফসান বলে, অনলাইন ক্লাসে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাথা ধরে যেত। স্যার কী বলছেন, অর্ধেকই বুঝতাম না। এখন সরাসরি ক্লাসে স্যারকে সামনে পেলে শেখার আগ্রহই অন্যরকম লাগে। কিছু না বুঝলেই সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করতে পারি, যেটা জুমে কখনও সম্ভব হতো না।

করোনা মহামারী বিশ্বজুড়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঠেলে দিয়েছিল এক নতুন বাস্তবতায়Ñ ‘অনলাইন ক্লাসে’। সেই সময় প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থাকে ভবিষ্যতের শিক্ষা বলেও আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মহামারী-পরবর্তী সময় এসে চারকোনা কাচের পর্দার সেই মোহ দ্রুত ভাঙছে। প্রযুক্তির ঝলমলে আয়োজনের আড়ালে যে মানসিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত সংকট জমে উঠেছিল, তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের অভিজ্ঞতায়।

শিক্ষার্থীরা আর ডিভাইসের সীমাবদ্ধ ভার্চুয়াল জগতে আটকে থাকতে চায় না; তারা ফিরতে চায় শ্রেণিকক্ষের পরিচিত পরিবেশে, হোয়াইট বোর্ডের গন্ধে, বন্ধুদের হাসি-আড্ডায় আর শিক্ষকের সরাসরি উপস্থিতির প্রাণবন্ত আবহে।

অনলাইন ক্লাসকে অনেক শিক্ষার্থীই দেখছে একপাক্ষিক বক্তৃতা হিসেবে। স্ক্রিনে উপস্থিতির ‘আইকন’ জ্বললেও মন পড়ে থাকে অন্যত্র। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আনিকা রহমান নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, অনলাইন ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখা সবচেয়ে কঠিন কাজ। সরাসরি ক্লাসে শিক্ষকের কড়া নজরদারি আর সহপাঠীদের প্রতিযোগিতা আমাদের পড়ালেখায় মনোযোগী রাখে। বাসায় বসে সেই পরিবেশ পাওয়া যায় না।

শুধু মনোযোগের সংকটই নয়, দীর্ঘসময় স্ক্রিনের সামনে বসে থাকার শারীরিক ও মানসিক প্রভাব নিয়েও উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। ঢাকার রামপুরার বাসিন্দা অভিভাবক ফারজানা নিধি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, অনলাইন ক্লাসের জন্য ছেলের হাতে ফোন তুলে দিতে হয়েছিল। এখন সে ফোনের নেশায় বুঁদ। চোখের সমস্যা, পিঠে ব্যথা তো আছেই, পাশাপাশি মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে। আগের মতো বন্ধুদের সঙ্গে মিশতেও চায় না।

শিক্ষাবিদদের মতে, অনলাইন শিক্ষা দেশের সব শ্রেণির শিক্ষার্থীর জন্য সমানভাবে কার্যকর নয়। উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা যেখানে তুলনামূলক সুবিধা পেয়েছে, সেখানে গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়েছে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায়। রাজধানীর উপশহর কেরানীগঞ্জের একটি স্কুলের শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার অনেক শিক্ষার্থীর পরিবারে একটি সাধারণ বাটন ফোনই বিলাসিতা। সেখানে অ্যান্ড্রয়েড ফোন বা ল্যাপটপের কথা চিন্তাও করা যায় না। ইন্টারনেটের গতি এত কম থাকে যে, ‘হ্যালো’ শুনতেই ক্লাস শেষ হয়ে যায়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় শতভাগ অনলাইন শিক্ষা এখনও কার্যকর নয়।

ঢাকার একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষক প্রফেসর ড. হারুন-অর-রশিদের মতে, অনলাইন ক্লাস পরীক্ষাভিত্তিক পড়া ও শর্টকাটনির্ভর শিক্ষাকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও মেধার বিকাশে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব তাদের মনস্তত্ত্বে পড়ছে। তাই কারিকুলাম এমনভাবে সাজাতে হবে, যেখানে কোন পাঠ অনলাইনে হবে আর কোনটি অফলাইনে হবেÑ তা পাঠ্যবইয়েই স্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মোজাম্মেল হক চৌধুরী মনে করেন, শ্রেণিকক্ষ শুধু পাঠ মুখস্থ করার জায়গা নয়; এটি একজন মানুষকে সামাজিকভাবে গড়ে তোলার প্রথম পাঠশালা। তিনি বলেন, শিক্ষা একটি দ্বিমুখী মানবিক প্রক্রিয়া। শিক্ষকের স্নেহমাখা দৃষ্টি, সহপাঠীর সঙ্গে টিফিন ভাগ করে খাওয়া, একসঙ্গে হাসাহাসিÑ এসবও শিক্ষার অংশ। প্রযুক্তির সম্ভাবনা অবশ্যই আছে, তবে তা কখনও শিক্ষকের বিকল্প বা শ্রেণিকক্ষের জীবন্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারে না। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বড়জোর সহায়ক হতে পারে, মূলধারা নয়।

রাজধানীর রামপুরা আইডিয়াল স্কুলের সহকারী শিক্ষক তসলিম উদ্দিন বলেন, অনলাইন ক্লাস শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের ছদ্ম-উপস্থিতি তৈরি করে। বাইরে থেকে মনে হয় সবাই ক্লাসে আছে, কিন্তু বাস্তবে অনেকেই মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরীক্ষা সামনে রেখে আমরা এখন সরাসরি ক্লাসের ওপরই জোর দিচ্ছি।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) শিক্ষা প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও নীতিমালার নানা উদ্যোগ থাকলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সরাসরি শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষাই এখনও সবচেয়ে কার্যকর। সে কারণেই অনলাইন ক্লাস সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়নি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২
Developed By ATOZ IT HOST