অকাল বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে সিলেটের হাওর অধ্যুষিত অঞ্চলে ব্যাপক ফসলহানির ঘটনা ঘটেছে। উঁচু অ-হাওর অঞ্চল হওয়ায় সুনামগঞ্জ বা হবিগঞ্জের হাওরবেষ্টিত অঞ্চলের মতো এমন বিপত্তিতে পড়তে হয়নি মাধবপুরের বোরো কৃষকদের। তারা সমস্যায় পড়েছেন শ্রমিক সংকটের কারণে।
বোরো ভান্ডারখ্যাত সুনামগঞ্জে যখন জমিতে কাটার মতো ধান নেই; মাধবপুরে তখন ধান কাটার মানুষ নেই। উপজেলাজুড়ে বোরো ধানের পর্যাপ্ত উৎপাদন হলেও সেই ধান কেটে ঘরে তোলার মতো লোক পাচ্ছেন না কৃষক। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জমির ধান কেটে শেষ করতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে ধান কাটার মৌসুমে সহজেই শ্রমিক পাওয়া যেত। বর্তমানে সে সুযোগ কম। গত ৮-১০ বছরে মাধবপুরে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। এখানকার তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ এসব কারখানায় কাজ করছে। কৃষিকাজ অত্যন্ত পরিশ্রমের হওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেকেই এ পেশায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এতে সময়মতো ধান কাটতে না পেরে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষক।
এ ছাড়া শ্রমিক পর্যায়ের সবচেয়ে বড় অংশটি চুনারুঘাট ও মাধবপুরের বিভিন্ন চা বাগানে কাজ করছে। ফলে কৃষি শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ধান কাটার সময় শ্রমিক না পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষক। তারা বলছেন, এবারের মতো এমন কষ্ট তাদের আগে কখনও হয়নি।
উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে জানা যায়, ফসল তলিয়ে না গেলেও এখানকার জমিতে পানি জমে আছে। এতে হারভেস্টার মেশিন নামানো সম্ভব হচ্ছে না। যার কারণে সনাতনি পদ্ধতিতে ধান কাটার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রমিক সংকট।
শুধু শ্রমিক সংকট নয়। অতিরিক্ত মজুরি এবং টানা বৃষ্টির কারণে সময়মতো ধান কাটতে না পারায় চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে পাকা ধান মাঠেই ফেলে রাখছেন। এতে ঝড়-বৃষ্টি কিংবা কালবৈশাখীর আশঙ্কায় লোকসানের ভয় আরও বেড়ে গেছে।
উপজেলার শাহজাহানপুর, বাঘাসুরা, জগদীশপুর, আদাঐর, নোয়াপাড়া ও ধর্মঘর ইউনিয়নের বিভিন্ন হাওর ও নিচু এলাকার মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, ধান পুরোপুরি পেকে গেলেও শ্রমিকের অভাবে কাটতে পারছেন না কৃষক। অনেক এলাকায় বাইরের শ্রমিক না আসায় সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। কৃষকরা জানান, আগে স্থানীয় শ্রমিক দিয়েই সহজে ধান কাটা সম্ভব হতো।
কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ শ্রমিক ইটভাটা, শিল্পকারখানা কিংবা শহরমুখী হওয়ায় কৃষিকাজে শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যারা কাজ করছেন তারাও দৈনিক ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি দাবি করছেন। এতে ধানের সার্বিক উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষক।
উপজেলার বাঘাসুরা গ্রামের কৃষক আব্দুল হাই জানান, তাঁর মতো অনেক কৃষকের জমির ধান পেকে গেছে। শ্রমিক না পাওয়ায় কাটতে পারছেন না। ঝড়-বৃষ্টি হলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। নিচু জমিতে হারভেস্টার মেশিনও যেতে পারে না। গত ১০ দিনের বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে আছে। এখন এক বিঘা জমির ধান কাটতে ৩-৪ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। একই অভিযোগ করেন জগদীশপুর অঞ্চলের কৃষক ছাদেক মিয়া। তিনি বলেন, শ্রমিক পেলেও অতিরিক্ত মজুরি দিতে হচ্ছে। ধানের বাজারদর অনুযায়ী এত খরচ বহন করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।
চৌমুহনী অঞ্চলের কৃষক সমুজ আলী বলেন, ধান নিয়ে কৃষক এখন বড় বিপদে। এক বিঘা জমিতে ধান উৎপাদন করতে কমপক্ষে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। অথচ বাজারে প্রতিমণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। এভাবে চলতে থাকলে কৃষকরা ধান চাষাবাদ থেকে ধীরে ধীরে সরে যেতে বাধ্য হবে।
কৃষকদের এমন দুর্ভোগের বিষয়টি স্বীকার করে মাধবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সজীব সরকার জানান, এ বছর উপজেলায় বোরো ধানের ভালো ফলন হয়েছে। তবে শ্রমিক সংকটের কারণে কিছু এলাকায় ধান কাটায় বিলম্ব হচ্ছে।
কৃষকদের দ্রুত ধান কাটতে কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে উপজেলায় কয়েকটি কম্বাইন হারভেস্টার কাজ করছে। কৃষকদের যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান কাটার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এতে সময় ও খরচ দুটোই কমবে। পাশাপাশি কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।