ঈদে সাজগোজ, নতুন পোশাক, ঘোরাঘুরি এবং প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানো হয়েছে। মেকআপ করে দীর্ঘসময় থাকা হয়েছে। ঈদ শেষ হলেও ঈদের আমেজ শেষ হয়নি। এখনও আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়ানো, ঘোরাঘুরি চলমান। একদিকে গরম, অন্যদিকে উৎসবের আবহ–তাই ত্বক ও চুলের যত্নটা বুঝেশুনে নিতে হবে। ধুলাবালু ও রোদে ঘোরাঘুরি, অনিয়মিত ঘুম এবং তেল-মসলাযুক্ত খাবারের কারণে ত্বক ক্লান্ত, শুষ্ক বা নিস্তেজ হয়ে যায়। কখনও কখনও ব্রণ, র্যাশ বা ত্বকের রং নিস্তেজ হয়ে যাওয়ার সমস্যাও দেখা দেয়। তাই ঈদের পর ত্বককে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রয়োজন কিছু সচেতনতা ও নিয়মিত যত্ন।
শোভন’স মেকওভারের রূপবিশেষজ্ঞ শোভন সাহা বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে মানুষ ঘোরাঘুরি ও বেড়াতে পছন্দ করেন। এখন যেহেতু গরম পড়তে শুরু করেছে, তাই দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে সানবার্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সানবার্ন হলে তা কমানোর জন্য ডি-ট্যান ট্রিটমেন্ট নেওয়া যেতে পারে। কেউ যদি ঘরোয়া উপায়ে সানবার্ন দূর করতে চান, তাহলে মুলতানি মাটি, টকদই, মধু, বেসন ও হলুদ দিয়ে তৈরি ফেসপ্যাক ব্যবহার করতে পারেন। এসব উপাদান ত্বকের ঔজ্জ্বল্য ফিরিয়ে আনতে এবং ত্বককে শান্ত রাখতে সাহায্য করে।’
তিনি যোগ করেন, ত্বকের ময়লা ও মৃত কোষ দূর করতে স্ক্রাবিং একটি ভালো উপায় হতে পারে। ঈদের সময় অতিরিক্ত মেকআপ, রোদে ঘোরাঘুরি এবং ধুলাবালুর কারণে ত্বক অনেক সময় ক্লান্ত ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তাই এই সময় ত্বককে একটু আরাম দেওয়া জরুরি। এ জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে শিট মাস্ক অথবা ত্বকের ধরন অনুযায়ী উপযোগী ফেসপ্যাক।
যাদের ত্বক সেনসিটিভ, তাদের ক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের ট্রিটমেন্ট বা ফেসপ্যাক ব্যবহারের আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন শোভন সাহা।
উৎসবের পরে ত্বকের যত্নে কী করবেন
ত্বক ভালোভাবে পরিষ্কার রাখুন
ঈদের সময় ভারী মেকআপ, ধুলাবালু এবং দূষণের কারণে ত্বকের রন্ধ্রে ময়লা জমে যায়। তাই ত্বক পরিষ্কার রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ত্বককে গভীরভাবে পরিষ্কার করতে ডাবল ক্লিনজিং পদ্ধতি বেশ কার্যকর। প্রথমে অয়েলবেজড ক্লিনজার দিয়ে মেকআপ পরিষ্কার করে, এরপর মাইল্ড ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে নিলে ত্বক সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার হয় এবং রন্ধ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।
মৃদু এক্সফোলিয়েশন
ঈদের সময় ধুলাবালু ও মেকআপের কারণে ত্বকের ওপর মৃত কোষ জমে যায়, যা ত্বককে নিস্তেজ করে তোলে। সপ্তাহে এক বা দুইবার মৃদু স্ক্রাব বা এক্সফোলিয়েটর ব্যবহার করলে মৃত কোষ দূর হয় এবং ত্বকের স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য ফিরে আসে। অতিরিক্ত স্ক্রাব করা উচিত নয়, এতে ত্বক সংবেদনশীল হয়ে যেতে পারে।
ত্বককে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা দেওয়া
উৎসবের সময় অনেকে পর্যাপ্ত পানি পান করতে পারেন না, ফলে ত্বক শুষ্ক হয়ে পড়ে। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। পাশাপাশি ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে ত্বকের আর্দ্রতা বজায় থাকে। হাইড্রেটিং সিরাম বা অ্যালোভেরা জেলও ত্বকের জন্য উপকারী।
প্রাকৃতিক উপায়ে ত্বকের যত্ন
ঈদের পর ত্বকের ক্লান্তি দূর করতে ফেসপ্যাক খুব কার্যকর। মধু, দই, বেসন, অ্যালোভেরা বা শসা দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক ফেসপ্যাক ত্বককে সতেজ করে এবং ঔজ্জ্বল্য বাড়াতে সাহায্য করে। সপ্তাহে এক বা দুইবার এসব ফেসপ্যাক ব্যবহার করলে ত্বকের ক্লান্ত ভাব দূর হয়।
রোদ থেকে সুরক্ষা
এ সময় অনেকেই বাইরে বেশি সময় কাটান, ফলে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মির প্রভাব ত্বকে পড়ে। তাই বাইরে বের হওয়ার আগে অবশ্যই সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত। অন্তত এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি সানস্ক্রিন ব্যবহার করলে ত্বক সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে সুরক্ষিত থাকে।
ত্বককে বিশ্রাম দেওয়া
উৎসবের পর কয়েকদিন ভারী মেকআপ ব্যবহার না করাই ভালো। এতে ত্বক বিশ্রাম পায় এবং নিজে থেকেই পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ পায়। প্রয়োজন হলে শুধু সানস্ক্রিন, ময়েশ্চারাইজার ও হালকা লিপবাম ব্যবহার করলেই যথেষ্ট।
মুখে স্টিম নেওয়া
মাঝেমধ্যে মুখে হালকা স্টিম নেওয়া ত্বকের জন্য উপকারী। এতে ত্বকের রন্ধ্র খুলে যায় এবং ভেতরে জমে থাকা ময়লা সহজে পরিষ্কার হয়। স্টিম নেওয়ার পর হালকা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে ত্বক আরও সতেজ থাকে।
ঠোঁটের যত্ন
উৎসবের সময় দীর্ঘ সময় লিপস্টিক ব্যবহার করার ফলে ঠোঁট শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। তাই উৎসবের পর নিয়মিত লিপবাম ব্যবহার করা উচিত। সপ্তাহে একবার মৃদু লিপ স্ক্রাব ব্যবহার করলে ঠোঁটের মৃত কোষ দূর হয় এবং ঠোঁট নরম ও উজ্জ্বল থাকে।
হাত-পায়ের যত্ন
অনেক সময় মুখের যত্ন নেওয়া হলেও হাত ও পায়ের দিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ উৎসবের সময় বারবার ধোয়া বা বাইরে ঘোরাঘুরির কারণে হাত-পা শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। তাই নিয়মিত হ্যান্ড ক্রিম ও ফুট ক্রিম ব্যবহার করলে ত্বক কোমল থাকে।
পর্যাপ্ত ঘুম
ত্বকের সুস্থতার জন্য ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ত্বক নিস্তেজ হয়ে যায় এবং চোখের নিচে কালচে দাগ পড়ে। তাই প্রতিদিন অন্তত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করা উচিত। এতে ত্বক স্বাভাবিকভাবেই সতেজ ও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ
ত্বকের স্বাস্থ্য অনেকটাই নির্ভর করে খাদ্যাভ্যাসের ওপর। উৎসবের সময় অতিরিক্ত মিষ্টি ও তেলযুক্ত খাবার খাওয়ার কারণে ত্বকে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ কারণে খাদ্যতালিকায় বেশি করে ফল, শাকসবজি, বাদাম এবং ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা উচিত। ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়াতে সাহায্য করে।
পর্যাপ্ত পানি পান
ত্বকের ঔজ্জ্বল্য ধরে রাখতে পানি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন অন্তত আট থেকে দশ গ্লাস পানি পান করলে শরীরের বিষাক্ত উপাদান বের হয়ে যায় এবং ত্বক স্বাভাবিকভাবেই সতেজ দেখায়।
নিয়মিত স্কিনকেয়ার অভ্যাস
নিয়মিত স্কিনকেয়ার খুবই জরুরি। প্রতিদিন ত্বক পরিষ্কার করা, টোনার, সিরাম ও ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা–এই সাধারণ অভ্যাসগুলো ত্বককে দীর্ঘদিন সুস্থ
চুলের যত্ন
গরম, ধুলাবালি, ঘাম–বিশেষ করে আমাদের দেশের আবহাওয়ায় চুলের যত্ন একটু আলাদা করে নিতে হয়। ঠিকভাবে না নিলে চুল পড়া, খুশকি, রুক্ষতা–সবই বাড়ে।
নিয়মিত পরিষ্কার রাখা
গরমে মাথার ত্বকে ঘাম ও তেল বেশি জমে, তাই সপ্তাহে ২-৩ দিন মাইল্ড শ্যাম্পু ব্যবহার করুন। বাইরে গেলে ফিরে এসে চুল ধুয়ে নেওয়া ভালো। খুব বেশি কেমিক্যালযুক্ত শ্যাম্পু এড়িয়ে চলুন।
কন্ডিশনিং ও ময়েশ্চারাইজিং
প্রতিবার শ্যাম্পুর পর কন্ডিশনার ব্যবহার করুন। সপ্তাহে অন্তত এক দিন হেয়ার মাস্ক বা প্রাকৃতিক প্যাক (ডিম, দই, অ্যালোভেরা) ব্যবহার করতে পারেন।
তেল ব্যবহার
সপ্তাহে দু-এক দিন হালকা গরম নারকেল তেল/ আমন্ড অয়েল ম্যাসাজ করুন। খুব বেশি তেল দিয়ে সারাদিন রেখে দিলে ধুলা বেশি আটকে যায়। তাই কয়েক ঘণ্টা পর ধুয়ে ফেলুন।
রোদ ও ধুলা থেকে সুরক্ষা
বাইরে গেলে ওড়না/স্কার্ফ দিয়ে চুল ঢেকে রাখুন। সরাসরি রোদে বেশি সময় থাকলে চুল শুষ্ক হয়ে যায়। তবে চুলের গোড়ায় ঘাম জমতে দেবেন না। জিম/বাইরে কাজের পর মাথা শুকনো রাখুন। আবার ভেজা চুল বেঁধে রাখবেন না–এতে ফাঙ্গাল সমস্যা হতে পারে।
অতিরিক্ত হিট এড়িয়ে চলুন
চুল ভালো রাখতে হেয়ার ড্রায়ার, স্ট্রেইটনার কম ব্যবহার করুন। ব্যবহার করলে হিট প্রটেক্টর ব্যবহার করা ভালো।